
গাজীপুর মহানগরের গাছা থানার পশ্চিম ঝাঝড় (সাক্রাউরী) এলাকায় একটি মাদ্রাসায় দুই শিক্ষার্থীকে বেধড়ক মারধরের পর গরম লোহার খুন্তি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হলে মাদ্রাসার পরিচালকসহ তিন শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন ময়মনসিংহের ধোবাউড়া থানার চরমুহুরী গ্রামের মাওলানা রইছ উদ্দিন আহাম্মদের ছেলে ও ‘আল-মাদরাসাতু দারুত তাকওয়া গাজীপুর’র পরিচালক মাওলানা শোয়াইব হোসেন (২৬), শনিবার তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ত্রিশাল থানার বরমা গ্রামের মো. ওয়াদুদের ছেলে ও মাদ্রাসাশিক্ষক মো. হাবিবুর রহমান (২৬) এবং শেরপুরের শ্রীবরদী থানার ভাইডাঙ্গা গ্রামের মো. শাহিন (১৯)। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) তাদের আদালতে পাঠানো হবে।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, নির্যাতনের শিকার দুই শিক্ষার্থী হলো কিশোরগঞ্জের নিকলী থানার সিংপুর গ্রামের নাজমুল মিয়ার ছেলে মো. বায়েজীদ (১৩) এবং শেরপুরের ঝিনাইগাতী থানার বানিয়াপাড়া গ্রামের মো. লাল মিয়ার ছেলে বোরহান আলী (১৩)। তারা দুজনই ওই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করত।মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে মাদ্রাসার মাঠে কয়েকজন শিক্ষার্থী খেলাধুলা করছিল। একপর্যায়ে এক শিক্ষার্থীর পায়জামা অসাবধানতাবশত খুলে যায়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বায়েজীদ ও বোরহানকে শাস্তির নামে মারধর ও নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।
বায়েজীদের বাবা নাজমুল মিয়া অভিযোগ করেন, তার ছেলেকে মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা শোয়াইব হোসেন ধরে নিয়ে মারধর করেন। একপর্যায়ে তাকে উলঙ্গ করে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে পেটানো হয়। পরে একটি লোহার খুন্তি আগুনে গরম করে বায়েজীদের নিতম্বে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়।
নাজমুল মিয়া বলেন, ঘটনার পর বায়েজীদ বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে পরিবারের কাছে বিস্তারিত জানায়নি। ১০ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে মাদ্রাসা থেকে বাড়ি ফেরার পর তিনি লক্ষ্য করেন, তার ছেলে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে ও বসতে পারছে না।
কারণ জানতে চাইলে বায়েজীদ প্রথমে নিতম্বে ফোঁড়া হয়েছে বলে জানায়। পরদিন সেখানে ওষুধ লাগাতে গেলে সে বাধা দেয়। পরে পরিবারের সদস্যরা জোর করে ওষুধ লাগানোর চেষ্টা করলে নিতম্বে পোড়া জখমের দাগ দেখতে পান। এরপর জিজ্ঞাসাবাদে বায়েজীদ মাদ্রাসায় নির্যাতনের ঘটনা জানায় বলে দাবি করেন তার বাবা।
অন্যদিকে বোরহান আলীর বাবা মো. লাল মিয়া অভিযোগ করেন, একই দিন খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে তার ছেলেকেও মাদ্রাসার একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। সেখানে বোরহানের মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে হাত-পা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। পরে তার পোশাক খুলে উলঙ্গ অবস্থায় বাঁশের কঞ্চি দিয়ে মারধর করা হয়।
লাল মিয়ার অভিযোগ, একপর্যায়ে মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা শোয়াইব হোসেন আগুনে উত্তপ্ত করা লোহার খুন্তি দিয়ে বোরহানের তলপেটে ছ্যাঁকা দেন। একইভাবে শিক্ষক হাবিবুর রহমান ও শাহিনও গরম লোহার খুন্তি দিয়ে বোরহানের উরু, নিতম্বসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দিয়ে জখম করেন।
লাল মিয়া আরও অভিযোগ করেন, ১১ সেপ্টেম্বর রাতে ছেলেকে দেখতে তিনি মাদ্রাসায় যান। কিন্তু সেখানে থাকা সংশ্লিষ্টরা তাকে জানান, বোরহানকে অন্য একটি শাখায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হলে তিনি মাদ্রাসার অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে জানতে পারেন, তার ছেলে গুরুতর আহত অবস্থায় শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।
খবর পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে বোরহানকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেখতে পান তিনি। পরিবারের দাবি, বোরহানের শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখমের চিহ্ন রয়েছে।
ঘটনার পর দুই শিক্ষার্থীর পরিবারের পক্ষ থেকে গাছা থানায় পৃথক মামলা করা হয়। মামলার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং অভিযোগের ভিত্তিতে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রব্বানী জানান, বায়েজীদের পরিবারের করা মামলায় মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা শোয়াইব হোসেনকে শুক্রবার গ্রেপ্তার করা হয়। শনিবার তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
অন্য ভুক্তভোগী বোরহান আলীর বাবা মো. লাল মিয়ার করা মামলায় মাদ্রাসার শিক্ষক মো. হাবিবুর রহমান ও মো. শাহিনকে শনিবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের রোববার আদালতে পাঠানো হবে বলে জানান ওসি।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে গ্রেপ্তার তিনজনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তবে দুই শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।