
সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও অনুশীলনের জন্য দাওয়াহ তথা দাওয়াতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বিষয়ে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
জনসাধারণকে ইসলাম বোঝানো, ইসলাম শেখানো এবং সমাজের সর্বস্তরে ইসলাম অনুশীলনের প্রচেষ্টা চালানোই হলো দাওয়াহ বা দ্বীন প্রচারের মূল লক্ষ্য। ইসলামে এই দায়িত্বটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রত্যেক মুসলিমের সামর্থ্য অনুযায়ী এটি অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
সমাজ ও জনপদে সুন্দরভাবে দাওয়াহর কাজ পরিচালনার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
هُوَ الَّذى بَعَثَ فِى الأُمِّيّۦنَ رَسولًا مِنهُم يَتلوا عَلَيهِم ءايٰتِهِ وَيُزَكّيهِم وَيُعَلِّمُهُمُ الكِتٰبَ وَالحِكمَةَ وَإِن كانوا مِن قَبلُ لَفى ضَلٰلٍ مُبينٍ
প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশ: আল-কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী, মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকার প্রধান মাধ্যম হলো হিকমাহ (প্রজ্ঞা) এবং ‘মাউইজাতুল হাসানাহ’ (উত্তম উপদেশ)। কঠোরতা পরিহার করে নম্র ও যুক্তিপূর্ণ ভাষায় কথা বলা জরুরি।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
ادعُ إِلىٰ سَبيلِ رَبِّكَ بِالحِكمَةِ وَالمَوعِظَةِ الحَسَنَةِ ۖ وَجٰدِلهُم بِالَّتى هِىَ أَحسَنُ ۚ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعلَمُ بِمَن ضَلَّ عَن سَبيلِهِ ۖ وَهُوَ أَعلَمُ بِالمُهتَدينَ
আচরণগত দাওয়াহ (আমল): মুখে বলার চেয়ে নিজের আচরণের মাধ্যমে ইসলামকে ফুটিয়ে তোলা বেশি প্রভাবশালী। সততা, আমানতদারিতা এবং সদাচরণের মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করা সম্ভব।
পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতি: মহানবী (সা.) যেভাবে ধাপে ধাপে প্রথমে তাওহিদ, তারপর সালাত এবং পরবর্তীতে অন্যান্য বিধানের দাওয়াহ দিয়েছেন, সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন।
সহজ ও ইতিবাচক উপস্থাপন: ইসলামকে কঠিন বা ভীতিজনক হিসেবে না দেখিয়ে এর সৌন্দর্য, শান্তি এবং ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণের দিকগুলো তুলে ধরা জরুরি।
পারিবারিক সচেতনতা: দাওয়াহর কাজ শুরু হওয়া উচিত নিজের ঘর থেকে। পরিবারে দ্বীনি পরিবেশ তৈরি হলে তা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ: মক্তব, মাদ্রাসা, দ্বীনি শিক্ষাকেন্দ্র এবং সমসাময়িক মিডিয়া—সোশ্যাল মিডিয়া, বই ও সেমিনারের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে সব বয়স ও পেশার মানুষের কাছে ইসলামের সঠিক জ্ঞান পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।
তরুণ সমাজ: যুবসমাজকে দ্বীনের পথে আনতে তাদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি, মিডিয়া এবং সমসাময়িক ভাষা ব্যবহার করে তাদের কাছে ইসলামের শিক্ষা ও মূল্যবোধ তুলে ধরা প্রয়োজন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
لَقَد أَرسَلنا رُسُلَنا بِالبَيِّنٰتِ وَأَنزَلنا مَعَهُمُ الكِتٰبَ وَالميزانَ لِيَقومَ النّاسُ بِالقِسطِ
পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবী মহল: কর্মক্ষেত্রে সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করা যায়। বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার মাধ্যমে ইসলামের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও বিচারব্যবস্থার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা প্রয়োজন।
আলী বিন আবী তালেব (রা.) থেকে বর্ণিত, খাইবার যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন:
«فَوَاللَّهِ لَأَنْ يَهْدِيَ اللَّهُ بِكَ رَجُلًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ»
অর্থ: “আল্লাহর কসম! তোমার মাধ্যমে যদি আল্লাহ কোনো একজন ব্যক্তিকেও হিদায়াত দান করেন, তবে তা তোমার জন্য লাল উটের পালের চেয়েও উত্তম।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
সাধারণ জনগণ: মসজিদের জুমআর খুতবা, ওয়াজ মাহফিল, দ্বীনি বইপত্র বিতরণ এবং ব্যক্তিগত আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো—যেমন আকীদা, ইবাদত ও আখলাক—সহজ ভাষায় শেখানো প্রয়োজন।
সামাজিক কল্যাণমূলক কাজ: অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো, আর্তমানবতার সেবা করা এবং সামাজিক অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ ভূমিকা রাখা দাওয়াহর গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এর ফলে ইসলামের প্রতি মানুষের অনুরাগ বাড়তে পারে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
ثُمَّ كَانَ مِنَ الَّذِيْنَ آمَنُوا وَتَوَاصَوا بَالصَّبْرِ وَتَوَاصَوا بِالْمَرْحَمَةِ- أُولَئِكَ أَصْحَابُ الْمَيْمَنَةِ
মানুষকে আল্লাহর পরিচয় করানো: সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য যে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা, তা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া দাওয়াহর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) মু‘আয (রাঃ)-কে ইয়ামান দেশে প্রেরণ করেন। এ সময় তাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন,
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رضى الله عنهما أَنَّ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم بَعَثَ مُعَاذًا رضى الله عنه إِلَى الْيَمَنِ فَقَالَ ادْعُهُمْ إِلَى شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ، وَأَنِّيْ رَسُوْلُ اللهِ، فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوْا لِذَلِكَ فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللهَ قَدِ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ خَمْسَ صَلَوَاتٍ فِيْ كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ، فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوْا لِذَلِكَ فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً فِيْ أَمْوَالِهِمْ، تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ وَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ-
অর্থ: “সেখানকার অধিবাসীদেরকে এ সাক্ষ্য দানের প্রতি আহ্বান জানাবে যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল। যদি তারা তা মেনে নেয়, তবে তাদের অবগত করাবে যে, আল্লাহ তায়ালা তাদের ওপর দিনে ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করেছেন। যদি সেটাও তারা মেনে নেয়, তবে তাদের অবগত করাবে যে, আল্লাহ তায়ালা তাদের সম্পদে সদাকাহ (যাকাত) ফরজ করেছেন। যা তাদের ধনীদের নিকট থেকে গ্রহণ করা হবে আর দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করা হবে।”
কুসংস্কার ও অনৈসলামিক সংস্কৃতির দূরীকরণ: সমাজ থেকে অন্যায়, জুলুম, মাদক, দুর্নীতি এবং জাহেলিয়াত দূর করে একটি শান্তিপূর্ণ ও নৈতিক সমাজ গঠন করা।
মানবতার কল্যাণ: ইসলাম যে কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠানের নাম নয়, বরং এটি মানবজাতির সার্বিক কল্যাণের একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা—তা সমাজে প্রতিষ্ঠা করা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلاً مِمَّنْ دَعَا إِلَى اللهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَّقَالَ إِنَّنِيْ مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ، وَلاَ تَسْتَوِى الْحَسَنَةُ وَلاَ السَّيِّئّةُ ادْفَعْ بِالَّتِى هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِيْ بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةً كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيْمٌ.
অর্থ: “ঐ ব্যক্তির কথার চেয়ে কার কথা উত্তম হতে পারে, যে আল্লাহর পথে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে যে, নিশ্চয়ই আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত। সৎকর্ম ও অসৎকর্ম সমান নয়। প্রতুত্তর নম্রভাবে দাও, দেখবে তোমার শত্রুও অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে পরিণত হয়েছে।” (হা-মীম সিজদা ৩৩-৩৪)
দাওয়াহর মাধ্যমে মানুষের মাঝে ইসলামের শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি একটি শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণমুখী সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখা সম্ভব।
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দ্বীনের মুবাল্লিগ হিসেবে কবুল করুন। আমিন।
লেখক: মাওলানা শাহ্ মোঃ মাসউদুর রহমান
সহ-সভাপতি, আইএবি ময়মনসিংহ জেলা দক্ষিণ শাখা