স্বেচ্ছাসেবা, সমাজসেবা ও মানবিক উন্নয়নে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ Ten Outstanding Young Persons of Bangladesh (TOYP) ২০২৬ অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছেন মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। জেসিআই বাংলাদেশ (JCI Bangladesh) তাকে এ সম্মাননায় ভূষিত করেছে।
সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা, তরুণদের দক্ষতা ও নেতৃত্ব বিকাশ, নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে তার দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা এই অর্জনকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে।
মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ইগনাইট গ্লোবাল ফাউন্ডেশনের (Ignite Global Foundation) প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। পাশাপাশি তিনি মাতৃভূমি গ্রুপের পরিচালক এবং মাতৃভূমি হার্ট কেয়ার ও মাতৃভূমি ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ব্যবসায়িক নেতৃত্বের পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নে তার সম্পৃক্ততা তাকে তরুণ উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী হিসেবে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে।
একটি মানবিক উদ্যোগ থেকে লাখো মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যাত্রা।
মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের সমাজসেবামূলক যাত্রার অন্যতম প্রধান ভিত্তি ইগনাইট গ্লোবাল ফাউন্ডেশন। ২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি উদ্যোগ থেকে সংস্থাটির যাত্রা শুরু হয়।
শুরুর দিকে মানবিক সহায়তাকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম পরিচালিত হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা, যুব উন্নয়ন, দুর্যোগ মোকাবিলা, জীবিকা উন্নয়ন ও সামাজিক কল্যাণে কাজ করা একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ইগনাইট গ্লোবাল ফাউন্ডেশন দেশজুড়ে বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে। সংস্থাটির সঙ্গে যুক্ত স্বেচ্ছাসেবকেরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষা, মানবিক সহায়তা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন।
সংস্থাটির মূল লক্ষ্য শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদান নয়; বরং মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ তৈরি করা, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করা এবং তরুণদের সামাজিক উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দেওয়া।
বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ পেয়েছে ১২০০-এর বেশি শিক্ষার্থী।
ইগনাইট গ্লোবাল ফাউন্ডেশনের অন্যতম প্রধান কার্যক্রম হলো সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে যেসব শিশু শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, তাদের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে ইগনাইট স্কুল।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ইগনাইট স্কুলের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ১২০০-এর অধিক শিক্ষার্থী বিনামূল্যে শিক্ষা গ্রহণ করেছে। বর্তমানে ১৫৫ জন শিক্ষার্থী বিনামূল্যে পড়াশোনা করছে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ, পোশাক এবং অন্যান্য সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে তাদের শিক্ষাজীবন এগিয়ে নিতে কাজ করছে সংস্থাটি।
শিক্ষার পাশাপাশি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য থেরাপি সেবার উদ্যোগও রয়েছে, যার মাধ্যমে তাদের যোগাযোগ দক্ষতা, শেখার সক্ষমতা এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করা হয়।
ইগনাইট গ্লোবাল ফাউন্ডেশনের এই উদ্যোগের মূল দর্শন হলো, অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা কিংবা বিশেষ চাহিদা কোনো শিশুর শিক্ষা ও সম্ভাবনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো উচিত নয়। প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ, সহায়ক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করাই এ কার্যক্রমের অন্যতম উদ্দেশ্য।
১৫৮ পরিবারকে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ।
দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উন্নয়নের জন্য তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি মানুষের আয়ের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। এই লক্ষ্য সামনে রেখে ইগনাইট গ্লোবাল ফাউন্ডেশন জীবিকাভিত্তিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ‘শাবলম্বী’ উদ্যোগের আওতায় ইতিমধ্যে ১৫৮টি পরিবারকে স্বাবলম্বী করার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, আয়ের সুযোগ সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদে অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমানো।
এই ধরনের কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিবারগুলোকে নিজেদের জীবিকা উন্নয়নে সক্ষম করে তোলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অর্জনের সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর ফলে সামাজিক সহায়তাকে কেবল সাময়িক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
৫০ হাজারের বেশি মানুষের জন্য নিরাপদ পানির সুযোগ।
নিরাপদ পানি মানুষের মৌলিক অধিকার ও জনস্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিশুদ্ধ পানির অভাব মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ইগনাইট গ্লোবাল ফাউন্ডেশন নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা বাড়াতে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ করছে।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ইগনাইট গ্লোবাল ফাউন্ডেশনের প্রকল্পের মাধ্যমে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিরাপদ পানি পান করার সুযোগ পাচ্ছেন। সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ পানির সুযোগ সম্প্রসারণ সংস্থাটির মানবিক ও সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শিক্ষা, জীবিকা ও নিরাপদ পানির মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে সমন্বিতভাবে কাজ করার মাধ্যমে সংস্থাটি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে।
তরুণদের দক্ষতা, নেতৃত্ব ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ।
মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের কার্যক্রমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো তরুণ প্রজন্মের উন্নয়ন। তিনি মনে করেন, তরুণদের সঠিক দিকনির্দেশনা, দক্ষতা অর্জনের সুযোগ এবং নেতৃত্ব বিকাশের পরিবেশ দিতে পারলে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে তিনি বিভিন্ন যুব উন্নয়নমূলক কার্যক্রম, স্বেচ্ছাসেবামূলক উদ্যোগ এবং তরুণদের সম্ভাবনা বিকাশে সহায়তামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। তাঁর উদ্যোগগুলোর মূল উদ্দেশ্য তরুণদের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা, নেতৃত্বের গুণাবলি, উদ্যোক্তা মানসিকতা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করার আগ্রহ তৈরি করা।
ইগনাইট গ্লোবাল ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমেও তরুণদের স্বেচ্ছাসেবায় সম্পৃক্ত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এর মাধ্যমে তরুণেরা বাস্তব সামাজিক সমস্যা সম্পর্কে জানার পাশাপাশি মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সম্মিলিতভাবে পরিবর্তন আনার অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন।
লেখালেখির মাধ্যমে ক্যারিয়ার ও উদ্যোক্তা হওয়ার অনুপ্রেরণা।
সমাজসেবা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি লেখালেখির মাধ্যমেও তরুণদের অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করছেন মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। তিনি তিনটি বই লিখেছেন: Aviation Career, Way to Success এবং Student Startup।
A viation Career বইটির মাধ্যমে এভিয়েশন খাতে ক্যারিয়ার গড়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে আগ্রহী তরুণদের দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। Way to Success বইটি সাফল্যের পথে ব্যক্তিগত প্রস্তুতি ও অগ্রগতির ধারণাকে সামনে আনে।
অন্যদিকে, Student Startup শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনা, নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করা এবং নিজেদের উদ্যোগ গড়ে তোলার বিষয়ে আগ্রহী করতে সহায়তা করে।
তার লেখালেখির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো তরুণদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করা, নতুন কিছু করার সাহস জোগানো এবং প্রচলিত ক্যারিয়ার ভাবনার বাইরে নিজেদের সম্ভাবনা অন্বেষণে উৎসাহিত করা।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি।
সমাজসেবা, যুব উন্নয়ন, স্বেচ্ছাসেবা ও উদ্যোক্তা হিসেবে অবদানের জন্য মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আটটির বেশি পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন বলে তার প্রোফাইলে উল্লেখ রয়েছে।
তার অর্জনের তালিকায় রয়েছে Diana Award ২০২০, The Hero Award ২০২১, ILA 30 Under 30 -2025, JCI Young Entrepreneur Award ২০২২ এবং Student to Startup Award ২০১৯-এর মতো স্বীকৃতি।
এ ছাড়া স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম ও সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্বীকৃতিও তার অর্জনের তালিকায় রয়েছে। এসব সম্মাননা তার সামাজিক উন্নয়ন, তরুণদের ক্ষমতায়ন এবং মানবিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার যাত্রাকে তুলে ধরে।
এবারের TOYP ২০২৬ অ্যাওয়ার্ড তার অর্জনের তালিকায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই সম্মাননা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের স্বীকৃতি নয়, বরং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার জন্য তরুণদের নেতৃত্ব ও স্বেচ্ছাসেবার গুরুত্বকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে বড় মানুষের জন্য কাজ করার লক্ষ্য।
TOYP ২০২৬ অ্যাওয়ার্ড অর্জনের পর মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম জেসিআই বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি তার পরিবার, ইগনাইট গ্লোবাল ফাউন্ডেশনের নিবেদিতপ্রাণ টিম এবং মাতৃভূমি গ্রুপের সদস্যদের প্রতি ধন্যবাদ জানান।
তার মতে, এ ধরনের অর্জনের পেছনে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার পাশাপাশি দলীয় সহযোগিতা, পরিবারের সমর্থন এবং সম্মিলিতভাবে কাজ করার মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ।
তার পথচলায় শিক্ষা, নিরাপদ পানি, জীবিকা উন্নয়ন, যুব নেতৃত্ব ও মানবিক সহায়তা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। ইগনাইট গ্লোবাল ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে।
সামনে আরও বেশি মানুষের কাছে কার্যক্রম পৌঁছে দেওয়া, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, পরিবারগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করা এবং তরুণদের সামাজিক উন্নয়নে সম্পৃক্ত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য রয়েছে।
মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের এই অর্জন তাই শুধু একটি পুরস্কার পাওয়ার ঘটনা নয়; এটি সমাজের জন্য কাজ করে যাওয়ার দায়বদ্ধতা এবং নতুন প্রজন্মকে মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করার একটি উপলক্ষ। তার এই যাত্রা দেখায়, ব্যক্তিগত নেতৃত্ব যখন সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
TOYP ২০২৬-এর এই স্বীকৃতি তার চলমান প্রচেষ্টাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাবে-এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর