নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনার সূত্রে জানা গেছে যে গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টারা ইরান সংক্রান্ত নানাবিধ সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে বেশ কয়েকটি বৈঠক করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে এই মর্মে জানিয়েছেন যে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পূর্বে তিনি নতুন কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন না।
যদিও এ বিষয়ে কয়েকজন উপদেষ্টা ব্যক্তিগতভাবে সিএনএন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে ট্রাম্পের এই নির্দিষ্ট ঘোষণাটি আদৌ চূড়ান্ত কি না, কিংবা আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের আগেই তাঁর কোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হতে পারে কি না, সে বিষয়ে তাঁরা সম্পূর্ণ নিশ্চিত নন।
পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত একাধিক মার্কিন কর্মকর্তার বরা୍তে জানা গেছে যে ট্রাম্প যদি মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কিংবা পরে পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করার নির্দেশ প্রদান করেন, তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও বিভিন্ন পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর উদ্দেশ্যে নতুন পরিকল্পনা প্রস্তুত করে রেখেছে।
প্রস্তুতকৃত ওই সমস্ত সামরিক পরিকল্পনায় তথাকথিত ‘সব বোমার জননী’ বা ‘মাদার অব অল বোম্বস’ বোমাটি ব্যবহার করার সম্ভাবনাও বেশ জোরালোভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা সংঘাতের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অস্ত্রভান্ডারে বর্তমানে মজুদ থাকা সবচেয়ে বড় অ-পারমাণবিক বোমাটি হলো জিবিইউ-৪৩ /বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট বোমা, যা সাধারণত ‘মোয়াব’ বা ‘মাদার অব অল বোম্বস’ নামেই সর্বমহলে পরিচিত ও আলোচিত।
গত শনিবার ইরানের সেনাবাহিনীর কমান্ডার আলিরেজা শেখ এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করে বলেন যে এই ধরনের ভয়ভীতি মূলত ইরানের সাধারণ জনগণকে আতঙ্কিত করে তোলার উদ্দেশ্যে তৈরি করা একধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণার হাতিয়ার মাত্র।
তিনি আরও অত্যন্ত জোরালো ভাষায় যোগ করেন যে, খোদ ইরানের সাহসী জনগণই হলো মূলত সব বোমার জননী, যারা যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে।
এদিকে ইরান সম্পূর্ণ নতুন এবং তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক একটি সামরিক কৌশলের জোরালো ইঙ্গিত প্রদান করেছে, যার মূল তাৎপর্য হলো তারা আর নিষ্ক্রিয়ভাবে প্রথমে আক্রান্ত হওয়ার জন্য কেবল অপেক্ষা করে থাকবে না।
এর পরিবর্তে তেহরান প্রয়োজনে প্রতিপক্ষের হামলার আগেই নিজে থেকে আগেভাগে আক্রমণ পরিচালনা করার কথা ভাবছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূরাজনীতিতে এক নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
গত সপ্তাহে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় যে সম্প্রতি পুরো ইরানজুড়ে একটি বড় ধরনের সামরিক মহড়া সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
উক্ত সামরিক মহড়ার সময় অত্যন্ত সফলভাবে একসঙ্গে মোট ৩০টি শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়েছে বলেও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর পক্ষ থেকে জোরদার দাবি করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষণার ওপর বিশেষ মনোযোগী ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের সম্মানিত জ্যেষ্ঠ গবেষক ফারজিন নাদিমি এ বিষয়ে তাঁর সুচিন্তিত মতামত প্রকাশ করেছেন।
গবেষক ফারজিন নাদিমি বলেছেন যে তেহরান যদি শেষ পর্যন্ত তাদের নতুন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ব্যবহার করে সরাসরি ইউরোপে হামলা চালানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তাদের সম্ভাব্য প্রধান লক্ষ্যবস্তুগুলোর তালিকায় যুক্তরাজ্যে অবস্থিত মার্কিন বিমানঘাঁটি থাকতে পারে।
এ ছাড়া জার্মানির বিখ্যাত র্যামস্টেইন সামরিক সরবরাহকেন্দ্রটিও তাদের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ভূখণ্ডের বাইরে অবস্থিত দেশটির সবচেয়ে বড় এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা।
তবে বিশেষজ্ঞ নাদিমি অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলেছেন যে বর্তমান রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা যদি একেবারে চরম পর্যায়ে গিয়ে না পৌঁছায়, তবে সম্ভবত ইরান এই ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্পটি সহসা ব্যবহার করবে না।
সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে চলতি মাসের একদম শুরুর দিকে একটি অনির্দিষ্ট নতুন হুমকির তথ্য পাওয়ার পর যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে মোতায়েন থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সব দূরপাল্লার বোমারু বিমানকে অতসত্য় ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এই শক্তিশালী বোমারু বিমানগুলো যুক্তরাজ্য থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঠিক কয়েক দিন আগেই ব্রিটিশ সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সন্দেহভাজন কয়েকজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছিল।
গ্রেপ্তারকৃত ওই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের নির্দিষ্ট সেই বিমানঘাঁটিটিকে যেকোনো মূল্যে লক্ষ্যবস্তু বানানোর একটি কথিত ইরানি ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে, যেখানে পূর্বে মার্কিন বোমারু বিমানগুলো নিয়মিত অবস্থান করত।
নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সম্ভাবনা এবং কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়িয়ে তোলার জন্য ইরান অদূর ভবিষ্যতে আরও অনেক বেশি উন্নত এবং সমন্বিত ড্রোনবহর ব্যবহার করতে পারে বলে জোরালোভাবে মনে করেন গবেষক ফারজিন নাদিমি।
বিশেষজ্ঞ নাদির মতে, ইরানের তৈরি এই সমস্ত আধুনিক ড্রোনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথা এআই প্রযুক্তি, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা এবং বিশেষ তথ্য আদান-প্রদানের আধুনিক ব্যবস্থা সংযুক্ত থাকতে পারে।
এ ধরনের অত্যাধুনিক ড্রোনগুলো খুব সহজেই একে অপরের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করতে সক্ষম হবে এবং প্রয়োজনে নিজেদের নির্ধারিত উড্ডয়নপথ ও গতি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পরিবর্তন করতে পারবে।
পাশাপাশি শত্রুপক্ষের সব ধরনের সংকেত-বিঘ্নিত করার আধুনিক প্রযুক্তি এবং জটিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খুব সহজেই ফাঁকি দিয়ে নিজ লক্ষ্যভেদ করার চেষ্টা চালাতে পারবে এই ড্রোনগুলো।
গবেষক ফারজিন নাদিমি আরও উল্লেখ করেছেন যে ইরান এখনো পর্যন্ত তাদের এই ধরনের অত্যাধুনিক সামরিক সক্ষমতা ময়দানে বাস্তবে সফলভাবে প্রদর্শন করতে পারেনি।
তবে এটিও সত্য যে অতীতে বিভিন্ন সময়ে তেহরান অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গেই এ ধরনের ধ্বংসাত্মক প্রযুক্তি নিজ দেশে তৈরি করার বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে খোলামেলা আলোচনা করেছে।
তিনি আরও যোগ করেন যে ইরান তাদের বর্তমান ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা ও গতি বাড়িয়ে ভবিষ্যতে সেগুলোর সঙ্গে সর্বাধুনিক সুপারসনিক প্রযুক্তি যুক্ত করার জোরালো প্রচেষ্টা চালাতে পারে।
এর ফলে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শব্দের নির্ধারিত গতির চেয়েও অনেক বেশি গতিতে মহাশূন্যে বা বাতাসে ছুটতে পারবে এবং সেগুলোকে মাঝপথে আটকে দেওয়া শত্রুপক্ষের জন্য আরও অনেক বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
পরিশেষে গবেষক নাদিমি জানান যে এই সমস্ত সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি ইরান তাদের গোপন সামরিক যোগাযোগ ও আকাশপথের নজরদারির কাজে নিয়মিত ব্যবহৃত কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের সংকেতেও মারাত্মক বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা চালাতে পারে।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর