নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বিশ্বব্যাপী মোট নয়টি দেশের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে বলে স্বীকৃত। এর মধ্যে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের দখলেই রয়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ অস্ত্র। এই দুই পরাশক্তিই সরাসরি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। ২০২২ সাল থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন লড়াই চলছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত রয়েছে ইরান। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী।
২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে বর্তমান সময়েই বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি মাত্রায় যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ ও সংঘাত পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, চলমান এসব সংঘাতের কারণে পৃথিবীর বেশ কয়েকটি জনবহুল অঞ্চল এখন সরাসরি পারমাণবিক হামলার তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে।
পৃথিবীর কোনো জনবহুল শহরে যদি হঠাৎ একটি পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরিত হয়, তবে মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে উদ্ভাসিত হবে তীব্র আলোর এক ঝলকানি। সেই সঙ্গে প্রচণ্ড তাপ ও ভয়ংকর বিস্ফোরণের ধাক্কায় ধসে পড়বে একের পর এক ভবন, দুমড়ে-মুচড়ে উড়ে যাবে জানালার সমস্ত কাচ এবং চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে লেলিহান শিখা।
ওই বিস্ফোরণের ফলে আকাশে তৈরি হবে একটি বিশাল মাশরুম আকৃতির মেঘমালা। শহরের অগণিত মানুষ মুহূর্তেই প্রাণ হারাবেন এবং অনেকে গুরুতর আহত অবস্থায় বিভিন্ন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে থাকবেন। এমন এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে যদি কেউ শহরের ভূগর্ভে আগে থেকে তৈরি কোনো বাংকারে আশ্রয় নিয়ে থাকেন, তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে যে তিনি বেঁচে থাকতে পারবেন কি না।
অনেকেরই এমন ধারণা রয়েছে যে পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতা এতটাই অপ্রতিরোধ্য যে এমন ভয়ংকর বিস্ফোরণ ঘটলে বেঁচে ফেরার কোনো বিন্দুমাত্র সুযোগ থাকে না। তবে বাস্তব পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। মূলত বিস্ফোরণের উৎপত্তিস্থল থেকে দূরত্ব, বোমার মোট শক্তি, বিস্ফোরণের প্রকৃতি এবং চারপাশের অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে মানুষের জীবন নিয়ে ফেরার সম্ভাবনা।
এমনকি বিস্ফোরণস্থলের অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থান করেও কিছু মানুষ অলৌকিকভাবে বেঁচে যেতে সক্ষম হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে মাটির নিচের ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা অত্যন্ত শক্তপোক্ত কোনো কংক্রিটের ভবন মানুষের প্রাণ বাঁচানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
পারমাণবিক বিস্ফোরণের ঘটনায় মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কতটুকু, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় নিয়ামকগুলোর একটি হলো বিস্ফোরণের কেন্দ্রবিন্দু থেকে দূরত্ব। এই ক্ষেত্রে মাত্র কয়েক শ মিটারের ব্যবধানও জীবন এবং মৃত্যুর মধ্যে এক বিশাল পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজাস্টার প্রিপেয়ার্ডনেসের পরিচালক এবং চিকিৎসক আরউইন রেডলেনারের মতানুসারে, হিরোশিমায় নিক্ষিপ্ত বোমার সমশক্তি সম্পন্ন একটি পারমাণবিক বোমা যদি কোনো বড় শহরে বিস্ফোরিত হয়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৭৫ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় আহত হতে পারেন আরও কয়েক লাখ সাধারণ মানুষ। বিস্ফোরণের প্রচণ্ড আঘাত, দাবানল, তীব্র তাপ, তেজস্ক্রিয় বিকিরণ এবং চারদিকে উড়ে চলা ভাঙা কাচের টুকরার আঘাতে মূলত তাঁরা গুরুতর জখম হবেন।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে ওই আক্রান্ত শহরের প্রতিটি মানুষই নিশ্চিত মৃত্যুর শিকার হবেন। বিস্ফোরণের কেন্দ্রবিন্দু থেকে মানুষ যত বেশি দূরত্বে অবস্থান করবেন, তাঁদের বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
চিকিৎসক রেডলেনারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে দুই থেকে পাঁচ মাইল দূরত্বের মধ্যে থাকা মানুষেরা মূলত উড়ে আসা জানালার কাচের টুকরা কিংবা আগুনের লেলিহান শিখার কারণে প্রাণ হারাতে পারেন। তবে এর মানে এই নয় যে তাঁরা সবাই বিস্ফোরণের সরাসরি আঘাতের কারণে মারা যাবেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির স্বাস্থ্যপদার্থবিদ ব্রুক বাডেমেয়ারের মতে, বিস্ফোরণের উৎপত্তিস্থলের তুলনামূলক কাছাকাছি থেকেও যদি কোনো ব্যক্তি শক্তপোক্ত কোনো ভবনের ভেতরে আশ্রয় নেন, তবে তাঁর বেঁচে যাওয়ার বেশ ভালো সম্ভাবনা থাকে।
ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা নিক্ষিপ্ত হওয়ার পরও এমন বহু ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় বেশ কিছু মানুষ অত্যন্ত শক্তপোক্ত ও মজবুত ভবনের ভেতরে অবস্থান করার কারণে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন।
সে সময় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একজন নারী ছিলেন যিনি বিস্ফোরণের মাত্র প্রায় ৩০০ মিটার দূরে একটি ব্যাংক ভবনের ভেতর অবস্থান করছিলেন। সৌভাগ্যবশত সেই ব্যাংক ভবনটি বিস্ফোরণের অভিঘাতে পুরোপুরি ধসে পড়েনি, যে কারণে ওই নারী প্রাণে বেঁচে যান।
অবশ্য ব্যাংক ভবন থেকে বাইরে আসার পর বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্টি হওয়া ভয়াবহ আগুনে ওই নারীর পা ও কান মারাত্মকভাবে পুড়ে গিয়েছিল। ঠিক একইভাবে অন্য আরেকটি ব্যাংকের বেসমেন্টে আশ্রয় নেওয়া এক নারী এবং তাঁর কোলের ছোট শিশুটিও অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন।
যদিও সেই মা ও সন্তানের শরীরের বিভিন্ন অংশে চারপাশ থেকে উড়ে আসা কাচের টুকরা লেগে জখম হয়েছিল। অর্থাৎ পারমাণবিক বিস্ফোরণস্থলের খুব কাছাকাছি অবস্থান করলেই যে সবার নিশ্চিত মৃত্যু ঘটবে, বিষয়টি এমন নয়। চরম বিপদের মুহূর্তে সঠিক জায়গায় আশ্রয় নেওয়া জীবন রক্ষায় বড় নিয়ম হতে পারে।
একটি পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরিত হলে কেবল তার কেন্দ্রবিন্দুর আশপাশের এলাকাই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় না। বরং এর প্রচণ্ড তাপ, উজ্জ্বল আলো এবং আঘাতের শক্তিশালী তরঙ্গ বহুদূর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করতে পারে।
সাধারণত বোমার শক্তি যত বেশি শক্তিশালী হয়, তার সামগ্রিক ধ্বংসের পরিধিও ততটাই বিশাল আকার ধারণ করে। হিরোশিমায় ফেলা বোমার সমান ক্ষমতার পারমাণবিক বোমা যদি কোনো জনবহুল শহরে বিস্ফোরিত হয়, তবে এর কেন্দ্র থেকে আধা মাইলের মধ্যে থাকা তাবৎ স্থাপনা সম্পূর্ণ ধ্বংস বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বোমা বিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে আধা মাইল থেকে এক মাইলের মধ্যে থাকা ভবন ও অবকাঠামোগুলো মাঝারি ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। আর এক থেকে তিন মাইল দূরের এলাকার ভবন এবং অন্যান্য স্থাপনা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বোমার নিজস্ব শক্তি কেমন এবং সেটি ভূপৃষ্ঠে নাকি শূন্যে বিস্ফোরিত হচ্ছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আকাশে বিস্ফোরণ ঘটলে সেই আঘাতের তরঙ্গ মাটিতে প্রতিফলিত হয়ে আরও ব্যাপক পরিসরে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে।
অন্যদিকে বোমাটি যদি সরাসরি মাটিতে বিস্ফোরিত হয়, তবে চারপাশের প্রচুর মাটি ও পাথর শূন্যে উড়ে গিয়ে বিরাট এক গর্তের সৃষ্টি করে। এর ফলে স্থানীয় অঞ্চলে মারাত্মক তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার, ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্য এবং স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে ২০১০ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস শহরে একটি বিশাল মহড়ার আয়োজন করা হয়েছিল। ‘অপারেশন গোল্ডেন ফিনিক্স’ নামের সেই মহড়ায় হিরোশিমার বোমার ক্ষমতার একটি কাল্পনিক পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।
সে সময় ওই শহরটির মোট জনসংখ্যা ছিল ৩৮ লাখ। সেই মহড়ার গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী, লস অ্যাঞ্জেলেসে তেমন কোনো বিস্ফোরণ ঘটলে অন্তত ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারত।
বাংকার নির্মাণের মূল উদ্দেশ্যই হলো যেকোনো চরম বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে মানবজাতিকে একটি নিরাপদ আশ্রয় প্রদান করা। পারমাণবিক বিস্ফোরণের মারাত্মক প্রেক্ষাপটে এই ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রগুলো অত্যন্ত বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
এর কারণ হলো, কেউ যদি বোমা বিস্ফোরণের প্রাথমিক ও সরাসরি আঘাত থেকে কোনোভাবে বেঁচেও যান, তবে পরবর্তী সময়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়া তেজস্ক্রিয় পদার্থের কারণে তার জীবন বিপন্ন হতে পারে।
পারমাণবিক বোমা ফাটার সঙ্গে সঙ্গেই চারদিকে অত্যন্ত তীব্র তাপ ও আলোর বন্যা বয়ে যায়। এর ঠিক পরপরই সৃষ্টি হয় এক শক্তিশালী আঘাতের তরঙ্গ।
এই তীব্র তরঙ্গের প্রবল চাপে চারপাশের বহুতল ভবন ও ঘরবাড়ি মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে পারে। যখন বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তখন সমস্ত আবাসিক ঘরবাড়ি হুড়মুড় করে ধসে পড়ে।
এমনকি অত্যন্ত মজবুত ও শক্তপোক্ত ভবনগুলোও এই মহাপ্রলয়ের মুখে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাত্র ৫ পিএসআই অতিরিক্ত বায়ুচাপ যেকোনো সাধারণ মানের আবাসিক ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট।
অন্যদিকে ১০ পিএসআই বায়ুচাপের প্রভাবে দেশের অধিকাংশ বড় কারখানা ও বাণিজ্যিক ভবন ধসে পড়তে পারে। আর যদি বায়ুচাপের পরিমাণ ২০ পিএসআই পর্যন্ত পৌঁছায়, তবে রিইনফোর্সড কংক্রিটের তৈরি যেকোনো শক্তিশালী স্থাপনাও সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর