নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
অফিসে সপ্তাহের ব্যস্ততা শেষে ছুটির এই দিনটিতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকতে ভীষণ পছন্দ করেন মিমি। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে সকাল সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে ঘুম ভেঙে যায় তার। এরপর দ্রুত মুখ ধুয়ে পোশাক বদলে আটটায় ঘর ছাড়তে হয় তাকে, কারণ পৌনে নয়টায় তাকে কর্মস্থলে পৌঁছাতে হয়। একটি ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারে দীর্ঘ নয় বছর ধরে চাকরি করছেন এবং বেশ ভালো বেতন পান তিনি। বনশ্রীর ছোট্ট একটি ফ্ল্যাটে বর্তমানে সম্পূর্ণ একা বসবাস করেন এই নারী। প্রতিদিন ঘর থেকে বের হয়ে দরজায় তালা দেওয়ার সময় তার নিজের ছোট্ট বাসা নিয়ে মনে এক অদ্ভুত আনন্দ ও স্বস্তি জাগে।
এরপর তাকে নেমে পড়তে হয় ব্যস্ত ঢাকার রাজপথে, যেখানে পদে পদে লুকিয়ে থাকে নানা বিপদ। மிகுந்த সতর্কতার সঙ্গে তাকে চলাচল করতে হয়। গত মাসেই বাসে ওঠার সময় এক ব্যক্তির জুতার পেছনের অংশের আঘাতে তার ডান পায়ের বুড়ো আঙুলের বড় নখ উল্টে গিয়ে মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল। তবে আজ শুক্রবার হওয়ায় সেই সব ঝক্কি-ঝামেলা থেকে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত। অলস সকালের আচ্ছন্ন ঘুমে তিনি ভাবছেন, দুপুর বারোটার পর বিছানা ছাড়বেন। জমে থাকা কিছু ময়লা কাপড় ধোয়া এবং ঘরে জমে থাকা মাকড়সার ঝুল পরিষ্কার করার পরিকল্পনাও রয়েছে তার মাথায়। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ ফোন বেজে উঠলে তিনি একটি চোখ সামান্য মেলে তাকিয়ে দেখেন সাবেক স্বামী পলাশের কল এসেছে।
চল্লিশ বছর বয়স পার হলেও পলাশের মানসিকতা এখনো পুরোপুরি শিশুর মতোই সরল। তাদের ডিভোর্সের প্রথম দেড়-দুই বছর সাবেক স্ত্রীকে ফিরে পাওয়ার জন্য সে প্রায়ই শিশুদের মতো বায়না ধরত। পলাশের সেই নরম মনের ছোঁয়া আজও ভালো লাগে মিমির। সে একেবারেই শিশুদের মতো আবেগপ্রবণ, একরোখা ও কিছুটা ফাঁকিবাজ প্রকৃতির। পলাশ অসম্ভব অলস, ভাবনাবিলাসী, দায়িত্বহীন, কামপ্রবণ ও কল্পনাপ্রবণ হলেও কখনোই ধুরন্ধর নয়। মিমি মনে করেন, ছেলেটা যদি কিছুটা চালাক বা ধুরন্ধর হতো, তবে হয়তো নিজের মতো কিছু করে খেতে পারত। কোনো কাজেই সে কখনো থিতু হতে পারেনি এবং তার আয়-রোজগারও প্রায় নেই বললেই চলে।
বয়ের পর অল্প কদিনের মধ্যেই মিমি বুঝতে পেরেছিল যে তার স্বামী কোনো এক মাদকাসক্তিতে জড়িয়ে পড়েছে। এক গভীর রাতে ঘুম ভেঙে তিনি দেখেছিলেন, ঘরের মেঝেতে বসে আরাম করে কাঁচি দিয়ে কী যেন মিহি করে কাটছে পলাশ এবং তার পাশেই পড়ে আছে খালি সিগারেটের খোসা। দীর্ঘকাল ধরে পলাশ গাঁজা সেবনের অভ্যাসে আসক্ত ছিল এবং শত চেষ্টা করেও মিমি তাকে সেই বদঅভ্যাস থেকে ফেরাতে পারেননি। পলাশের একমাত্র ইতিবাচক দিক ছিল তার গভীর ও প্রকৃত ভালোবাসা, যা মিমিও মনেপ্রাণে গ্রহণ করেছিলেন। তারা দুজনে মিলে অতীতে বেশ কিছু সুন্দর ও প্রেমময় মুহূর্ত অতিবাহিত করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের সেই প্রেম ও সংসার টিকেনি। ভাগ্য ভালো যে তাদের কোনো সন্তান হয়নি, নইলে সেই শিশুর কষ্ট পেতে হতো।
মিমি নিজের জীবনে বেশ সফল হয়ে উঠেছেন এবং একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে মোটা বেতনের চাকরি করছেন। বাসাভাড়া, খাবার ও যাতায়াত খরচ মিটিয়ে তিনি প্রতি মাসে তার বাবা-মাকে নিয়মিত ভালো অঙ্কের টাকা পাঠাতে পারেন। অথচ এসব ক্ষেত্রে পলাশ সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। এমনকি বিবাহচ্ছেদের পর সে ঢাকায় টিকে থাকতে না পেরে শেষ পর্যন্ত নিজের গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে। সেখানে বাবার রেখে যাওয়া কিছু কৃষিজমি দেখাশোনার পাশাপাশি একটি অল্পবয়সী মেয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে সে। মিমি স্বভাবগতভাবে হিংসুটে না হলেও পলাশের এই জীবন দেখে তার মাঝে একধরনের ঈর্ষা কাজ করে, কারণ ছেলেটি ঠিক যেমনটি চেয়েছিল, তেমনই জীবন যাপন করছে।
গ্রামের মুক্ত প্রকৃতি ও নিসর্গের মাঝে থেকে সারা দিন বনবাদাড়, বাঁশঝাড়, বিল কিংবা খেতের আলে বসে মনের সুখে গাঁজা সেবন করা এবং নারীদের সঙ্গে প্রেম করে বেড়ানোই ছিল পলাশের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। তাদের প্রায় এক যুগ দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে বহুবার মিমিকে এসব অবাস্তব স্বপ্নের কথা শুনিয়েছিল পলাশ। তখন সেসব কথাকে গাঁজাখুরি বলে উড়িয়ে দিলেও বর্তমানে দেখা যাচ্ছে যে পলাশ অবিকল নিজের কল্পনার মতো একটি জীবনই বেছে নিয়েছে।
সাবেক স্ত্রীর মনে এই ভাবনা চলার মাঝেই ফোনটি রিসিভ করেন মিমি। ওপাশ থেকে ভেসে আসে পলাশের সেই চিরচেনা মায়াবী ও বিনীত কণ্ঠস্বর, যেখানে সে জানতে চায় তার ঘুমে কোনো ব্যাঘাত ঘটিয়েছে কি না। অন্য দিনগুলোতে মিমি ব্যস্ত থাকায় সে বিরক্ত করতে চায় না, কিন্তু আজ শুক্রবার হওয়ায় সে নিশ্চিত যে মিমি আরাম করে ঘুমাচ্ছে।
তন্দ্রাচ্ছন্ন আবেশে পলাশকে তখন মিমির কাছে কোনো এক রূপকথার স্বপ্নকুমার বলে মনে হতে থাকে। ঘুমের রেশ কাট-কাট ভাব নিয়ে মিমিও মৃদু স্বরে জানতে চান তার খবর। পলাশ তখন আরও কিছুক্ষণ ঘুমানোর পরামর্শ দিয়ে পরে ফোন করার কথা বলে। ছুটির সকালে এমন আমুদে ও ঘুমজড়িত পরিবেশে পলাশের সঙ্গে কথা বলতে মিমির বেশ ভালোই লাগে। পলাশের মনে যখন তীব্র আনন্দ ও উচ্ছ্বাস থাকে, তখন তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ বলে মনে হয়। পলাশ তো তার কোনো বড় ক্ষতি করেনি, বরং মিমিই তাকে তালাকনামা পাঠিয়ে চরম কষ্ট দিয়েছিলেন। তাই পলাশকে তার সামান্য সুখ থেকেও বঞ্চিত করতে চান না তিনি।
পলাশের মনে যখন কেবল আনন্দ ও আশার সঞ্চার ঘটে, তখন সে অত্যন্ত সুন্দরে ও মোটিভেশনাল বা ইতিবাচক ভঙ্গিতে কথা বলে। পক্ষান্তরে, সে যখন হতাশ ও বিপর্যস্ত থাকে, তখন তার মন এক জীবন্ত নরকে পরিণত হয় এবং সেই আগুনের পুড়িয়ে সে নিজের পুরো দুনিয়া ও অস্তিত্ব ছাই করে দিতে চায়। এই কারণেই পলাশের প্রতি মিমির মনে একধরনের গভীর মায়া কাজ করে। আজ পলাশের মন বেশ ভালো থাকায় তার সঙ্গে কথা বলতে পেরে মিমির মন্দ লাগছে না। তার কণ্ঠে এখন অফুরান প্রাণশক্তি ও চাঞ্চল্য বিরাজ করছে, যা মিমিকেও স্পর্শ করেছে।
কথার একপর্যায়ে পলাশ জানায় যে সে হোয়াটসঅ্যাপে একটি কানের দুলের ছবি পাঠিয়েছে এবং মিমিকে সেটি মনোযোগ দিয়ে দেখতে অনুরোধ করে। সে আরও জানায় যে কানের দুলের এই ছবিটি মিমিরই কয়েক দিন আগের একটি ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগ্রহ করেছে। মিমি একটু ভেবে জানান যে ওই গহনাগুলো তাদের নিজেদের কোনো প্রডাক্ট নয়।
পলাশ তখন মিনতি করে বলে যে যার পণ্যই হোক না কেন, সে ওই ছবিটিই পছন্দ করেছে এবং মিমি যেন যেকোনো মূল্যে সেটি জোগাড় করে দেন। ঢাকায় অবস্থান করায় মিমি চেষ্টা করলে খুব সহজেই দুলটি পেয়ে যাবেন কিংবা অনলাইনেও অর্ডার করতে পারবেন বলে পলাশ আশা প্রকাশ করে। ময়ূরের নকশা করা এবং ছোট লাল পাথর বসানো অবিকল ওই কানের দুলটিই তার প্রয়োজন। তার স্বপ্নে আসা সেই রূপকথার রাজকুমারী বা যার কথা সে আগেই উল্লেখ করেছে, তাকেই এই দুলটি উপহার দিতে চায় পলাশ। পলাশের কণ্ঠে সেই চেনা আবেগ ও আকুতি শুনে মিমির মন কিছুটা হলেও ছুঁয়ে যায়।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর