নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
দীর্ঘ সময় প্রবাসে কাটিয়েও ভাগ্য বদলাতে না পেরে নিজের পুরোনো পেশা হিসেবে চাষাবাদ বেছে নিয়েছিলেন আবদুল বাছির। অভাবের তাড়নায় সুদমুক্ত ও চড়া সুদে ছয় লাখ টাকার ঋণ নিয়ে ২০২২ সালের শেষ ভাগে নিজের জ্যেষ্ঠ সন্তানকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে পাঠিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর মাত্র আট মাসের মধ্যে আইনগত ঝামেলায় জড়িয়ে আটক হন ওই তরুণ। তখনো আগের নেওয়া ঋণের সাড়ে চার লাখ টাকা পরিশোধ করা বাকি ছিল।
কারাগারে বন্দিদশার প্রায় তিন বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর গত বুধবার চৌদ্দই অক্টোবর অত্যন্ত মর্মান্তিক এক সংবাদ পান প্রবীণ পিতা। তিনি জানতে পারেন যে তাঁর সন্তানের মৃত্যুদণ্ডের রায় বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এমন আকস্মিক সংবাদ পাওয়ার পর থেকেই তিনি মানসিক দিক দিয়ে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন। এখন তাঁর একটাই তীব্র আকুতি, বিদেশ বিভুঁই থেকে সন্তানের মরদেহ নিজ দেশে ফিরিয়ে এনে তাঁকে যেন শেষবারের মতো চোখের দেখা দেখতে দেওয়া হয়।
সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দুই বাংলাদেশি নাগরিকের প্রাণদণ্ড हाल ہی میں কার্যকর করা হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে গত বুধবার গণমাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে সৌদি প্রেস এজেন্সি বা এসপিএ। যাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, তাদের নাম নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতার।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ সংবাদমাধ্যমকে জানান, স্থানীয় প্রশাসন ইতিমধ্যেই গোটা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে জেলা প্রশাসন।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নজরুল ইসলামের বয়স পঁচিশ বছর এবং তাঁর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার একটি গ্রামে। আবদুল বাছির ও রহিমা বেগম দম্পতির ঘরে জন্ম নেওয়া তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তিনি ২০২০ সালে একটি স্থানীয় মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এর পর সদর উপজেলার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানবিক শাখায় পড়াশোনার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন।
নজরুলের বাবা দীর্ঘ চৌবিশ বছর সৌদি আরবে কাটিয়ে ২০২০ সালে নিজ দেশে ফিরে আসেন। এত দীর্ঘ সময় প্রবাসজীবন যাপন করলেও তিনি পরিবারের সচ্ছলতা আনতে পারেননি। দেশে ফিরে তিনি কৃষিকাজে মনোনিবেশ করেন। নজরুলের চৌদ্দ বছর বয়সী ছোট ভাই একটি স্থানীয় মাদ্রাসায় এবং নয় বছরের বোন একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। এ ছাড়া পরিবারে চার বছর বয়সি আরেকটি ছোট বোন রয়েছে।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, নজরুল ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে সৌদি আরবে পাড়ি জমান। মক্কা নগরীর পবিত্র হারাম শরিফ এলাকায় তিনি একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দেশটিতে যাওয়ার পর মাত্র আট মাস কাটতে না কাটতেই সেখানকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁকে আটক করে। সেই থেকে তিনি কারাগারেই বন্দি ছিলেন। আটকের প্রায় এক মাস পর পরিবারের লোকজন বিষয়টি জানতে সক্ষম হন।
কারাবন্দი থাকা অবস্থায় মাঝেমধ্যে পিতা-মাতার সঙ্গে ফোনে কয়েক মিনিট কথা বলার সুযোগ পেতেন নজরুল। পরিবারের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথোপকথন হয় গত এগারোই অক্টোবর। সে সময় তিনি মাত্র দুই থেকে আড়াই মিনিট কথা বলতে পেরেছিলেন। এরপর গত বুধবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে একটি ফোনকলের মাধ্যমে তাঁর পরিবারের কাছে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংবাদটি পৌঁছে দেওয়া হয়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরটি শোনার পর তাঁর পঁয়ষট্টি বছর বয়সি ফুফু আবেদা বেগম আকস্মিকভাবে মূর্ছা যান। এরপর ওই দিন রাতেই অর্থাৎ গত বুধবার রাত দুইটার দিকে তিনি ইন্তেকাল করেন।
নজরুল অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের ও ভদ্র প্রকৃতির ছিলেন বলে জানান তাঁর আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুরা। সৌদি আরবে তাঁর বিরুদ্ধে যে ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে, তা তাঁর ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি করেছেন তাঁরা। এই পুরো অভিযোগের পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র ছিল বলেই তাঁরা জোরালোভাবে বিশ্বাস করেন।
নজরুলের দূরসম্পর্কের দুই চাচাতো ভাই মোস্তাকিম ভূঁইয়া ও ইমাম হাসান ভূঁইয়া সংবাদমাধ্যমকে জানান, হারাম শরিফ চত্বরে পরিচ্ছন্নতার কাজ করার সময় এক ব্যক্তির সঙ্গে নজরুলের বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। সেই ব্যক্তি পাকিস্তানের নাগরিক ছিলেন বলে নজরুল ফোনে তাঁর বাবা-মাকে জানিয়েছিলেন। ওই পাকিস্তানির ষড়যন্ত্রের ফলেই নজরুলের এমন মর্মান্তিক পরিণতি বরণ করতে হয়েছে বলে তাঁদের ধারণা।
নজরুলের বন্ধু রাহাত ভূঁইয়া বলেন, সৌদি আরবে নজরুলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগের কথা বলা হচ্ছে, তা তাঁর আসল চরিত্রের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তিনি এমন অপরাধ করতে পারেন, বিষয়টি তাঁর বন্ধুদের কাছে একেবারেই অবিশ্বাস্য ঠেকছে।
যে মাদ্রাসায় নজরুল একসময় পড়াশোনা করেছিলেন, সেই প্রতিষ্ঠানের সুপারিনটেনডেন্ট মাওলানা নাঈমুর রহমান বলেন, ছাত্রাবস্থায় নজরুলের আচরণ ও চলাফেরা অত্যন্ত প্রশংসনীয় ছিল। কেউ কখনো তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ পায়নি বা সে খারাপ প্রকৃতির ছিল এমন কথা কেউ বলতে পারবে না। দেশে থাকা অবস্থায় তাঁর চলাফেরায় কখনোই এমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।
আজ সোমবার সকালে এই প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে নজরুলদের বাড়িতে যাওয়া হয়। শোকার্ত বাবা আবদুল বাছিরের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন।
আবদুল বাছির সংবাদমাধ্যমকে জানান, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তিনি ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছিলেন। প্রথম সাত-আট মাসে ছেলে প্রায় দেড় লাখ টাকা পাঠাতে পেরেছিল। কিন্তু এরপর দীর্ঘ তিন বছর ধরে ছেলেটি কারাগারে বন্দি ছিল। ছেলের এমন মৃত্যুর খবর শুনে তাঁর বোনও হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন। এখন তিনি কেবল সন্তানের মরদেহ চোখের দেখার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন।
সন্তান হারানোর তীব্র শোকে গত কয়েক দিন ধরে অবিরাম কেঁদে চলেছেন মা রহিমা বেগম। তিনি বলেন, তাঁর ছেলে প্রতি এক মাস পর পর ফোনে যোগাযোগ করত এবং এক থেকে দুই মিনিট কথা বলত। তাঁর সন্তানের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি জীবনের শেষ মুহূর্তে হলেও তাঁর আদরের ছেলের লাশটি নিজের চোখে দেখতে চান।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর