নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
রাজধানীর হাজারীবাগের এ জে আর পার্সেল অ্যান্ড কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয়ে ভাঙচুর ও হামলার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার প্রতিষ্ঠানটির গুদামঘরে পেট্রল দিয়ে অগ্নিসংযোগের অপচেষ্টা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। তবে উপস্থিত কর্মীদের দ্রুত তৎপরতায় বড় ধরনের বিপদ এড়ানো সম্ভব হয়েছে এবং আগুন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা সফলভাবে নিভিয়ে ফেলা হয়েছে। কুরিয়ার সার্ভিসটির কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কেবল এই অগ্নিকাণ্ডের চেষ্টাই নয়, বরং কর্ম সমাপ্তির পর নিজ বাসায় ফেরার সময় প্রতিষ্ঠানটির একজন সাধারণ কর্মীকেও রাস্তায় আটকে মারধর করার গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ঘটনাটির সূত্রপাত ঘটে আজ রোববার ভোর সাড়ে চারটার দিকে, যখন অতর্কিতভাবে এই অগ্নিসংযোগের চেষ্টা চালানো হয়। এর আগে গত শুক্রবার রাতের বেলা কুরিয়ার সার্ভিসটিতে পূর্বের হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার বাদীকে মোবাইল ফোনে সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। ওই হুমকির বার্তায় অত্যন্ত ভীতিপ্রদ ভাষায় বলা হয়েছিল যে সবার আগে মামলার বাদীর মরদেহ মাটিতে পড়ে থাকবে। সব মিলিয়ে হিসাব করলে দেখা যায়, মাত্র পাঁচ দিনের সংক্ষিপ্ত ব্যবধানে এই প্রতিষ্ঠানটিতে দু-দুবার হামলার ঘটনা ঘটল এবং সঙ্গে যুক্ত হলো একবার আগুন দেওয়ার অপচেষ্টা।
ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী ও এ জে আর কুরিয়ার সার্ভিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান যে রোববারের ভোরের দিকে মোট তিনটি আলাদা মোটরসাইকেলে চেপে ছয়জন অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্ত গুদামঘরের কাছাকাছি এসে পৌঁছায়। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী তারা কাপড়ের টুকরোয় পেট্রল ঢেলে গুদামঘরের পেছনের অংশে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালায়। তবে সৌভাগ্যবশত আশপাশের লোকজন বিষয়টি দ্রুত লক্ষ্য করতে সক্ষম হন এবং কালবিলম্ব না করে আগুন নিভিয়ে ফেলেন। এ সময় স্থানীয়রা দুর্বৃত্তদের ধাওয়া করলে তারা দ্রুত মোটরসাইকেলে চড়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে খবর পেয়ে পুলিশ দল ঘটনাস্থলে এসে পরিদর্শন করে যায়।
উল্লেখ্য যে গত ২০ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে সিকদার মেডিকেল কলেজসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত এই এ জে আর পার্সেল অ্যান্ড কুরিয়ার সার্ভিসের মূল কার্যালয়ে অতর্কিত হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল। হামলাকারীরা প্রথমে সুকৌশলে কার্যালয়ের চারপাশের বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর সংযোগ বন্ধ করে দেয়। এরপর সন্ত্রাসীদের একটি সুসংগঠিত দল প্রাচীর টপকে জোরপূর্বক ভেতরে প্রবেশ করে এবং দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীদের নানাভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করে। সেই সময় আক্রমণকারীদের মুখে মুখোশ ও মাথায় হেলমেট পরিহিত অবস্থায় দেখা গিয়েছিল।
সন্ত্রাসীরা কুরিয়ারের গুদামে বলপূর্বক প্রবেশ করে ভেতরের ক্যামেরা ও ফুটেজ সংরক্ষণের যন্ত্র তথা ডিভিআরগুলো খুলে নিয়ে যায়। এরপর কার্যালয় ছেড়ে যাওয়ার প্রাক্কালে তারা ভেতরের সমস্ত আসবাবপত্র ভাঙচুর করে এবং বেশ কয়েকটি দামি ল্যাপটপ লুট করে নিয়ে যায়। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে পরবর্তীতে সুনির্দিষ্টভাবে জানানো হয় যে এই হামলায় মোট একত্রিশ লাখ টাকার মূল্যের বিভিন্ন পণ্য লুট করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, যারা এই হামলা চালিয়েছিল তারা নিজেদের শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের ক্যাডার বাহিনী বা লোক বলে পরিচয় দিয়েছিল। জানা যায়, এই কুরিয়ার সার্ভিসটি আজ থেকে দুই বছর আগে সিকদার গ্রুপের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট চুক্তির মাধ্যমেই এই জমিটি ভাড়া নিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই চুক্তির তোয়াক্কা না করে জমির নির্ধারিত ভাড়া সিকদার গ্রুপকে না দিয়ে সরাসরি সন্ত্রাসী ইমনকে পরিশোধ করার জন্য কুরিয়ার কর্তৃপক্ষকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
এই পূর্বের অপ্রীতিকর ঘটনার প্রেক্ষিতে গত ২১ অক্টোবর এ জে আর পার্সেল অ্যান্ড কুরিয়ার সার্ভিসের মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের ব্যবস্থাপক আফসার উদ্দিন বাদী হয়ে হাজারীবাগ থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন। পুলিশ এই মামলার তদন্তে নেমে এখন পর্যন্ত মোট আটজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। মামলা করার জেরে গত শুক্রবার রাত এগারোটার মধ্যে বাদী আফসার উদ্দিনকে মুঠোফোনে ফোন করে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। বাদীকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে শনিবারের মধ্যে যদি কোনো ধরনের সমঝোতায় না পৌঁছানো হয়, তবে তাঁর লাশ রাজপথে পড়ে থাকবে।
এই হত্যার হুমকির ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর গতকাল শনিবার ভোরে কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানটির দুটি সচল কাভার্ড ভ্যান ভাঙচুর করা হয়। লাগাতার এসব হুমকির মুখে পড়ে বাদী আফসার উদ্দিন বাধ্য হয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করেন। কুরিয়ার সার্ভিসটির কর্মকর্তারা জানান যে গুদামে আগুন দেওয়ার চেষ্টার ঠিক দুই ঘণ্টা পর অর্থাৎ আজ সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে তাদের এক কর্মী কাজ শেষ করে নিজ বাসায় ফিরছিলেন। ওই সময় ছয় থেকে সাতজন দুর্বৃত্ত আকস্মিকভাবে তাঁর গতিরোধ করে এবং তিনি এ জে আর কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী কি না তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করে।
পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর দুর্বৃত্তরা ওই কর্মীকে বেদম মারধর করে এবং তাঁর সঙ্গে থাকা একটি অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন ও টাকাভর্তি মানিব্যাগ জোরপূর্বক ছিনতাই করে নিয়ে পালিয়ে যায়। এ জে আর কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবস্থাপক আফসার উদ্দিন গণমাধ্যমকে জানান যে একের পর এক এমন হামলা, ভাঙচুর ও প্রাণনাশের হুমকির কারণে প্রতিষ্ঠানের সব কর্মী চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। কর্মীদের অনেকের মধ্যেই এত বেশি ভয় কাজ করছে যে তাঁরা ভয়ে কর্মক্ষেত্রে আসতেই চাচ্ছেন না। এমন একটি ভীতিকর পরিস্থিতির মাঝেই আবার নতুন করে একজন কর্মীকে মারধর করা হলো এবং তাঁরা এখন প্রশাসনের কাছে কর্মীদের সার্বজনীন নিরাপত্তা ও এই ঘটনার সঠিক বিচার দাবি করছেন।
অন্যদিকে হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসির দায়িত্ব পালনকারী মোশাররফ হোসেন জানান যে মূলত চাঁদা বা টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই আসামিরা এই ধরনের ত্রাস ও ভীতি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের ধ্বংসাত্মক হামলা ও ভাঙচুর চিরতরে বন্ধ করার জন্য পুলিশ সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং সেই সঙ্গে পলাতক আসামিদের ধরতে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ওসি আরও যোগ করেন যে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামির দেওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে তারা লুট হওয়া সিসিটিভি ক্যামেরার চারটি ডিভিআর উদ্ধার করতে পেরেছেন। গত শনিবার গভীর রাতে রায়েরবাজার এলাকার একটি মাঠের কাছ থেকে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই ডিভিআরগুলো উদ্ধার করা হয়।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর