ঢাকা | বঙ্গাব্দ

পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতাই সাজেক সংকটের মূল কারণ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 25, 2026 ইং
পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতাই সাজেক সংকটের মূল কারণ ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

রাঙামাটির সাজেক অঞ্চলে সম্প্রতি ঘটে চলা ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় হিসেবে মূল্যায়ন করার সুযোগ নেই। অগাধ পর্যটন সম্ভাবনা সম্পন্ন এই পাহাড়ি অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে ভেবে কেবল অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হলে মূল সত্য ঢাকা পড়ে যাবে। আসলে এগুলো কোনো স্বতন্ত্র সংকট নয়, বরং পার্বত্য অঞ্চলের দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা জটিল সমস্যার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। সঠিক রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা না দিয়ে কেবল উপসর্গের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে, যার ফলে আসল সংকট আড়ালে চলে যাচ্ছে।

দেশের সাধারণ মানুষের মাঝে বর্তমানে হানাহানি, পাল্টাপাল্টি আক্রমণ, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ এবং সাজেকে সড়ক অবরোধের মতো বিষয়গুলোকেই পাহাড়ের মূল সমস্যা বলে ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে। অথচ এই সমস্ত অস্থিতিশীলতা হলো কেবল দৃশ্যমান কিছু উপসর্গ। আশির দশক থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের আমলে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সঙ্গে বহুবার আলোচনা হয়েছে এবং এই অঞ্চলের মূল সমস্যাকে একটি রাজনৈতিক বিরোধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখানকার বিভিন্ন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী মূলত তাদের স্বশাসন, নিজেদের জমির মালিকানার নিরাপত্তা এবং সাংবিধানিক স্বীকৃতি দাবি করে আসছে।

মোগল, ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান আমলের ধারাবাহিকতায় দেশের স্বাধীনতার পরেও তারা এই ন্যায্য অধিকারের দাবি জানিয়ে আসছে। যেহেতু এটি মূলত একটি রাজনৈতিক সমস্যা, তাই রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই এর সমাধান সম্ভব। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই তৎকালীন সরকারের সাথে জেএসএসের মধ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা দেশ-বিদেশে শান্তি চুক্তি হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।

কিন্তু দীর্ঘ প্রায় তিন দশক সময় পেরিয়ে গেলেও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষের বহু প্রত্যাশিত সেই শান্তি চুক্তি আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। জেএসএসের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তি বাস্তবায়নের প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে ১৯৯৮ সালে পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন জেলা ও আঞ্চলিক পরিষদ, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন এবং শরণার্থী পুনর্বাসন টাস্কফোর্স গঠন করা হলেও পুরো কার্যক্রম ওই প্রস্তুতি পর্বেই স্থবির হয়ে আছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ব্যবস্থা, জেলা পুলিশ এবং ভূমি ব্যবস্থাপনার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক বিষয়গুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন আজও সম্পন্ন হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের সামান্য উদ্যোগ নেওয়া হলেও অপর দিক থেকে নানা অপচেষ্টার মাধ্যমে সেই প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করার তৎপরতা চালানো হয়েছে।

এই দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতার ফলে সাজেকে সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় তিন হাজার পর্যটক চরম আতঙ্কে আটকা পড়েন এবং স্থানীয় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। এই সমস্ত ঘটনাপ্রবাহ থেকে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, স্থায়ীভাবে পরিস্থিতি শান্ত করতে হলে অবিলম্বে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন এবং মূল সমস্যা সমাধানের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

চুক্তি স্বাক্ষরের একদম শুরুতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে পুলিশ বিভাগ জেলা পরিষদের নিকট হস্তান্তর করা অত্যন্ত জরুরি ছিল, যা চুক্তির ২৪ ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। কারণ, চুক্তি সফল করার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো চুক্তিকালীন স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখা।

অথচ প্রায় ২৯ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও পুলিশ বিভাগ জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তরের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। পুলিশ বিভাগ হস্তান্তর করা হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আসনবিন্যাস অনুযায়ী সদস্য পদ ঠিক করে জনবল নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হতো, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকে আরও সহজ করত।

চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, বম, খেয়াং এবং খুমিসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সমন্বয়ে একটি মিশ্র পুলিশ বাহিনী গঠিত হলে পাহাড়ের নিরাপত্তা বিধান করা অনেক সহজ হতো। এই অঞ্চলে কাজের ক্ষেত্রে ভাষা একটি অত্যন্ত বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করে আসছে, কারণ এখানে বসবাসকারী জাতিগুলোর আলাদা ভাষা রয়েছে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনের বিকল্প নেই, যা ভাষার মাধ্যমেই কেবল অর্জন করা সম্ভব। মিশ্র পুলিশ বাহিনীতে বিভিন্ন ভাষার সদস্য থাকলে সাধারণ মানুষের সাথে ভাষাগত দূরত্ব সহজে ঘুচে যেত এবং পুলিশ বাহিনী সত্যিকার অর্থে একটি বহু জাতিগোষ্ঠীর বাহিনীতে রূপ নিতে পারত।

বর্তমানে পাহাড়ের দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় সবাই বাঙালি সদস্য, যাঁরা স্থানীয় কোনো জনগোষ্ঠীর ভাষা জানেন না এবং পাহাড়ি সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কেও সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল নন। হাজারো মানুষের ভিড়ে থেকেও তাঁরা পরিবেশ বা পরিস্থিতি ঠিকমতো অনুধাবন করতে পারেন না এবং ভাষার দূরত্বের কারণে স্থানীয় জনসাধারণও তাঁদের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে ব্যর্থ হয়।

পার্বত্য চুক্তি সফল করতে হলে পারস্পরিক বিশ্বাস এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি হলেও এই শর্তগুলো পূরণ না হওয়ায় চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি গত প্রায় তিন দশক ধরে অধরাই থেকে গেছে। মূলত এ ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে আন্তরিকতার অভাব বা শৈথিল্যকেই প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা চলে।

চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার আগের প্রায় আড়াই দশক ধরে চলা অশান্ত পরিস্থিতিতে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে নানা নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। উদ্বাস্তু পুনর্বাসন টাস্কফোর্সের তথ্য অনুযায়ী, তিন পাহাড়ি জেলায় প্রায় ৯০ হাজার পরিবার গৃহহারা হয়ে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছিল, যা তখনকার পাহাড়ি জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।

ভারতে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ৭০ হাজার শরণার্থী পরবর্তীতে দেশে ফিরে আসেন এবং চরম নিগ্রহের শিকার এই মানুষগুলো চুক্তির সময় শান্তির আশায় বুক বেঁধে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখন তাঁরা দেখলেন যে চুক্তি বাস্তবায়িত হচ্ছে না এবং আগের মতোই নানা দল-উপদল ও বিশৃঙ্খলা ফিরে এসেছে, তখন তাঁদের সেই আশাবাদ গভীর হতাশায় পর্যবসিত হয়।

সাজেকের সাম্প্রতিক ঘটনাবলিকে মূলত সেখানকার অধিবাসীদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা তীব্র হতাশারই একটি বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। মাচালং ও বাঘাইহাট এলাকায় আঞ্চলিক দলগুলোর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সড়ক অবরোধ এবং পরবর্তী সংঘাতের ঘটনাগুলো যৌক্তিক বা অযৌক্তিক যা-ই হোক না কেন, বাস্তব সত্য হলো এই ধরনের ঘটনা ঘটছে।

হাজার হাজার পর্যটকের আটকে পড়া এবং স্থানীয়দের জীবনযাত্রা সংকটাপন্ন হওয়ার মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, চুক্তি বাস্তবায়ন ও সংকট নিরসনে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এই সমস্যার কোনো সঠিক ও গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে না পাওয়া গেলে সাজেকে এ ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রথম আলোর বান্দরবান প্রতিনিধি বুদ্ধজ্যোতি চাকমা।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
সিলেটে বিউটি পালের পাশে শিক্ষক-লেখক ও সাংবাদিকরা

সিলেটে বিউটি পালের পাশে শিক্ষক-লেখক ও সাংবাদিকরা