ঢাকা | বঙ্গাব্দ

৪০ কোটির মেহেরপুর নার্সিং কলেজ দুই বছরেও চালু হয়নি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 31, 2026 ইং
৪০ কোটির মেহেরপুর নার্সিং কলেজ দুই বছরেও চালু হয়নি ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

মেহেরপুর পৌর এলাকায় অবস্থিত একটি বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে সেবিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সুইটি আক্তার। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই শাখায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে অতীতে তাঁকে রাজধানী ঢাকায় পাড়ি জমাতে হয়েছিল। সেখানে মেস বা বাসা ভাড়া নিয়ে জীবনযাপন ও পড়াশোনার খরচ চালাতে গিয়ে তাঁর অভিভাবক পক্ষ চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছিল। সুইটি আক্তার গণমাধ্যমকে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, নিজেদের জেলা শহরে এই শিক্ষার সুব্যবস্থা না থাকায় তাঁদের মতো নিম্নবিত্ত ঘরের মেয়েদের রাজধানীতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ে বসবাস করতে হয়েছে। অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার ব্যয় মেটাতে তাঁর জন্মদাতা পিতার বন্ধক রাখা কৃষিজমি বিগত দুই বছর ধরে চাকরি করেও মুক্ত করতে পারেননি।

সুইটির মতো এলাকার তরুণী ও নারীদের নিজ এলাকায় থেকে স্বাস্থ্য বিষয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনের সুযোগ দিতে প্রায় ৪০ কোটি টাকা খরচ করে মেহেরপুর নার্সিং কলেজ স্থাপন করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় চারতলা বিশিষ্ট মূল পাঠদান ভবন এবং চারতলা বিশিষ্ট আবাসিক ছাত্রাবাসসহ যাবতীয় অবকাঠামোর নির্মাণকাজ ২০২৪ সালের ছাব্বিশে জুন সমাপ্ত হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে দুই বছরের বেশি কাল অতিবাহিত হলেও এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের শিক্ষা কার্যক্রমের সূচনা করা সম্ভব হয়নি। সেখানে কোনো শিক্ষক কিংবা শিক্ষার্থী অনুপস্থিত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ বা জনবল নিয়োগের কাজটিও সম্পন্ন হয়নি। এমনকি পাঠদানের জন্য জরুরি আসবাবপত্র এবং ল্যাবরেটরির প্রশিক্ষণের যন্ত্রপাতিও এখনো এসে পৌঁছায়নি। ফলশ্রুতিতে জনগণের এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোটি সম্পূর্ণ অকেজো ও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, পৌর এলাকার টিঅ্যান্ডটি মোড় সংলগ্ন মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রায় ৩ একর ৬৩ শতক জমির ওপরে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ৩৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। দেশে সেবামূলক শিক্ষা প্রসারণ এবং দক্ষ পেশাজীবী সেবিকা তৈরির মহান উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করা হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এলাকার শিক্ষার্থীরা এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাতিষ্ঠানিক পঠনপাঠন শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দ অনুমোদন, প্রশাসনিক ছাড়পত্র প্রাপ্তি, নতুন পদ সৃষ্টি এবং সেখানে জনবল পদায়নের প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এই বহুমুখী কাজের সঙ্গে মূলত অর্থ বিভাগ, স্বাস্থ্য বিভাগ ও জনপ্রশাসন বিভাগ ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের শিক্ষা, অর্থ ও বাজেট বিষয়ক পরিচালক নাহিদ-উল-মোস্তাক টেলিফোনে গণমাধ্যমকে জানান যে, কলেজ পরিচালনার কার্যক্রমটি মোট তিনটি স্তরে প্রশাসনিকভাবে চলমান রয়েছে। এর মধ্যে অর্থ বরাদ্দের ফাইলটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে, প্রশাসনিক অনুমোদন ও পদায়নের নথি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এবং নতুন পদ সৃষ্টির বিষয়টি জনপ্রশাসন দপ্তরে প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় রয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে জানান যে, আগামী বছরের জানুয়ারি মাসের মধ্যে এই প্রশাসনিক ধাপগুলো সম্পন্ন হতে পারে।

তবে এই প্রশাসনিক কাজ শেষ হওয়ার পরেও প্রশিক্ষক ও অন্যান্য কর্মচারী নিয়োগ, আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা আবশ্যক। এর ফলে বছরের প্রথম মাসের মধ্যে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা শেষ হলেও ঠিক কোন সময়ে মূল পাঠদান শুরু হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার পাশাপাশি সেবিকাদের পদায়ন সংক্রান্ত বিচারাধীন মামলাও প্রতিষ্ঠানটি চালুর পথে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। নতুন জনবল নিয়োগের প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই অন্য কোনো কর্মস্থলে কর্মরত সেবিকাদের বদলি বা পদায়ন করে অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু উচ্চ আদালত এবং প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে পদায়ন সংক্রান্ত আইনি মামলা থাকায় সেই বিকল্প উদ্যোগও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।

উক্ত দপ্তরের পরিচালক নাহিদ-উল-মোস্তাক আরও জানান যে, তাঁদের আন্তরিক ইচ্ছা ছিল অন্তত বর্তমান কর্মরত সেবিকাদের দিয়ে হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চালু করা। কিন্তু উচ্চ আদালত ও ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার কারণে দেশের অন্য যেকোনো স্থান থেকে এখানে কর্মী পদায়ন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

মেহেরপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী সামিয়া আক্তার ভবিষ্যতে এই পেশায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে ইচ্ছুক। কিন্তু নিজ জেলায় সেই সুযোগ না থাকায় তাকে দূরবর্তী অন্য কোনো জেলায় গিয়ে পড়াশোনা করতে হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে তাদের পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক বোঝা চেপে বসার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। সামিয়া আক্তার সংবাদমাধ্যমকে জানায়, সে এই বিষয়ে পড়াশোনা করতে ইচ্ছুক এবং সে শুনেছে যে এই পেশায় কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। দেশে প্রশিক্ষিত সেবিকাদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে উল্লেখ করে সে বলে, তাদের নিজ শহরে যদি পড়াশোনার সুযোগ থাকত, তবে বাড়িতে থেকেই পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো।

সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন, এই প্রতিষ্ঠানটি চালু হলে কেবল শিক্ষার্থীরাই উপকৃত হবেন না, বরং স্থানীয় হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে। শিক্ষার্থীরা হাসপাতালে সশরীরে উপস্থিত থেকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুবর্ণ সুযোগ পাবেন। মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ স্টাফ নার্স মিনতি বিশ্বাস গণমাধ্যমকে বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসকের ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে এবং অনেক সময় চিকিৎসকদের কিছু সাধারণ দায়িত্বও তাঁদের পালন করতে হয়। সেখানে শিক্ষানবিশ বা ট্রেইনি সেবিকা পাওয়া গেলে রোগীদের আরও দ্রুত ও উন্নত সেবা দেওয়া নিশ্চিত করা যেত।

গত বুধবার দুপুরে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আশেপাশের স্থানীয় লোকজন জানান যে ভেতরে কেবল একজন নিরাপত্তাকর্মী অবস্থান করছেন। অনেক ডাকাডাকির পর তিনি ভেতর থেকে বাইরে এসে মূল ফটকের তালা খুলে দেন। ভেতরে প্রবেশ করতেই সারি সারি ফাঁকা কক্ষ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ভবনের সামনের উন্মুক্ত স্থানে প্রাকৃতিকভাবে কাশফুল ফুটে রয়েছে এবং চারপাশ জুড়ে এক ধরনের সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। আবাসিক ভবনে যাতায়াতের কংক্রিটের রাস্তার ফাঁক দিয়ে ছোট ঘাস জন্ম নিয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহার না করার ফলে ভবনের কামরাগুলোতে ধুলার আস্তরণ জমে গেছে।

নিরাপত্তাকর্মী রবিউল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানান যে এখানে কেউ আসে না এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি কবে নাগাদ চালু হবে সে বিষয়ে তাঁর কোনো ধারণাই নেই। সমস্ত কক্ষেই পুরু ধুলার স্তর জমে রয়েছে বলে তিনি জানান। মেহেরপুর জেলার সিভিল সার্জন এ কে এম আবু সাঈদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, কলেজটি চালুর বিষয়ে তারা প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন এবং নিয়মিত চিঠি চালাচালি করছেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভবন নির্মাণের কাজ শেষ করে তা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নিকট বুঝিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কেবল ভবন দিয়ে তো আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালানো সম্ভব নয়, বরং তা সচল করতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, জনবল ও চিকিৎসা সংক্রান্ত উপকরণের সংস্থান করা একান্ত প্রয়োজন।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
চলন্ত ট্রেনে তরুণীর ব্যাগ ছিনতাই, ভিডিও দেখে অভিযুক্ত শনাক্ত

চলন্ত ট্রেনে তরুণীর ব্যাগ ছিনতাই, ভিডিও দেখে অভিযুক্ত শনাক্ত