নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতরা নানা ধরনের উপহারসামগ্রী পাঠানোর অনুরোধ নিয়ে হাজির হন। ওষুধের বোতল, শিশুদের পোশাক, রক্তচাপ মাপার যন্ত্র, চকলেট, আইফোনের পাশাপাশি নানা রহস্যময় জিনিস থাকে, যেগুলোর ওজন সাধারণত সাত থেকে দশ পাউন্ড পর্যন্ত হয়ে থাকে। বিমানগুলো একজন সাধারণ যাত্রীকে সর্বোচ্চ এক শ পাউন্ড ওজনের লাগেজ সঙ্গে নেওয়ার অনুমতি দেয়। ফলে নিজেদের কাপড়চোপড় ও উপহারের ওজন সামলাতে গিয়ে যাত্রীদের বিমানবন্দরে চরম বিড়ম্বনায় পড়তে হয়, যা অনেক সময় পরিচিতরা বুঝতেই চান না। এদিকে বাংলাদেশিদের স্বভাবজাতভাবে মুখের ওপর না বলতে পারার অপারগতার কারণে অনেকেই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দেশে ফেরার খবর গোপন রাখতে পছন্দ করেন।
সে সময় সপরিবার দেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল নাবিলা। স্বামী ও তিন সন্তানের জন্য তাদের মোট দশটি লাগেজ নেওয়ার সুযোগ ছিল, যার ওজন হতে পারত পাঁচ শ পাউন্ড। ডালাসের প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই তার বাসাটি একটি ছোটখাটো কুরিয়ার সার্ভিসে পরিণত হয়। সন্ধ্যার সময় রাইসা তার সঙ্গে দেখা করতে যায়। তার হাতে কোনো উপহার বা ফরমায়েশ ছিল না এবং সে প্রায় আধঘণ্টা বসে থাকার পর নাবিলা কৌতূহলী হয়ে জানতে চায় সে কোনো কিছু পাঠাবে কি না। রাইসা কিছুক্ষণ নিরব থাকার পর মৃদু হেসে জানায় যে তার কাছে পাঠানোর মতো অনেক জিনিস রয়েছে, তবে সে যখন নিজে দেশে যাবে তখন সেগুলোর যত্ন নেবে। তাছাড়া নাবিলার স্যুটকেসে জায়গা না থাকলে বিমানবন্দরে গিয়ে অতিরিক্ত ওজনের ভয়ে প্যান্ট বা টি-শার্টের ওপর শাড়ি পরে নেওয়ার বিড়ম্বনার কথা স্মরণ করে তারা সবাই হেসে ওঠে। এই বাড়তি ওজনের মাশুল এড়াতে যাত্রীদের অতিরিক্ত কাপড় গায়ে চাপিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা প্রবাসীদের কাছে বেশ পরিচিত। নাবিলা আশ্বস্ত করে বলে যে প্রচুর জায়গা রয়েছে এবং সে চাইলে জিনিসপত্র নিয়ে আসতে পারে।
বাসায় ফিরে আসার পর রাইসা তার আলমারির ওপরের তাক থেকে একটি বিশেষ ব্যাগ নামায়। ওই ব্যাগের ভেতরে ছিল তার বাবার জন্য কেনা একটি ধূসর রঙের সোয়েটার, যা সে গত বছরের থ্যাংকসগিভিংয়ের সময় সংগ্রহ করেছিল। তার বাবা কখনো আমেরিকায় আসেননি এবং বাংলাদেশের শীতের জন্য এমন ভারী সোয়েটারের কোনো প্রয়োজনও ছিল না। তবুও দোকানে এক বয়স্ক আমেরিকানকে ওই সোয়েটার কিনতে দেখে তার বাবার কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। ব্যাগের পাশেই মায়ের জন্য রাখা হয়েছিল একটি ছোট পারফিউম। মা কখনো মুখে না বললেও রাইসা জানত যে তিনি সুগন্ধি ভীষণ পছন্দ করেন এবং কেউ উপহার দিলে তা অতি যত্নে তুলে রেখে ঈদের মতো বিশেষ দিনে একটু একটু করে ব্যবহার করেন। মায়ের জন্য এই পারফিউমটি পছন্দ করার মূল কারণ ছিল বোতলের গায়ে মুদ্রিত ‘Homme’ শব্দটি, যা থেকে তার মনে হয়েছিল এটি হয়তো ‘Home’ বা বাড়ির প্রতীক। বাড়ি মানেই তো মায়ের কোল এবং মায়ের হাতের কোমল স্পর্শ। যদিও ‘homme’ শব্দের অর্থ যে পুরুষ এবং এটি মূলত পুরুষদের সুগন্ধি, সে কিংবা তার মা তখন তা জানতেন না। কারণ তাদের কাছে সুগন্ধি মানেই সুগন্ধি, সেটির আবার নারী বা পুরুষ ভেদাভেদ নেই। এ ছাড়া ভাই রায়হানের জন্য দুই বছর আগে কেনা একটি ঘড়িও সেখানে রাখা ছিল, কারণ ভাইটির একটি ভালো ঘড়ির দারুণ শখ ছিল। এসব জিনিস সে অন্য কারও মাধ্যমে পাঠাতে চায়নি, কারণ তার বিশ্বাস ছিল নিজের হাতে পৌঁছে দিলে উপহারগুলোর আসল মর্যাদা থাকে এবং নেওয়ার সময় মা-বাবা ও ভাইয়ের মুখের অভিব্যক্তি সে নিজের চোখে দেখতে পাবে। অন্যের স্যুটকেসে গেলে এগুলো কেবল সাধারণ মালামালে পরিণত হতো।
উপহারগুলো গুছিয়ে রেখে রাইসা রান্নাঘরের সিঙ্কে পড়ে থাকা থালাবাসন ধুতে চলে যায়। প্রবাসজীবনে দীর্ঘ অবসাদ বা অলসভাবে সময় কাটানোর কোনো অবকাশ থাকে না, এখানে থালাবাসন মাজা থেকে শুরু করে টয়লেট সিট পর্যন্ত সব কাজ নিজ হাতে করতে হয়। রাইসার প্রতিটি সকাল শুরু হতো ঘড়ির ছয়ে অ্যালার্ম বাজার মধ্য দিয়ে। প্রথম অ্যালার্মে সে ঘুম থেকে উঠত না, দ্বিতীয় অ্যালার্মে চোখ মেলে ফোনের দিকে তাকাত এবং তৃতীয় অ্যালার্ম বাজার সময় তার স্বামী আদনান বিরক্ত হয়ে বলত যে আধঘণ্টা পরেই যদি উঠতে হয়, তবে সেই সময়েই অ্যালার্ম সেট করলেই তো হতো। রাইসা তখন চোখ বন্ধ রেখেই উত্তর দিত যে তার অ্যালার্মটি ঠিক তার মায়ের মতো, যাকে তিনবার না ডাকলে কোনো কাজ হয় না। এরপরই শুরু হয়ে যেত তার ব্যস্ত দৌড়ঝাঁপ—ছেলের সকালের নাশতা প্রস্তুত করা, মেয়ের চুল বেঁধে দেওয়া, পানির বোতল গোছানো, নিজের ল্যাপটপ গুছিয়ে অফিসের মিটিংয়ে যোগ দেওয়া, তীব্র ট্রাফিক ঠেলে গ্রোসারি কেনাকাটা ও রান্না করা। বাংলাদেশে থাকা দিনগুলোতে তার মা ঠিক এভাবেই তার পিছে পিছে ঘুরে বেড়াতেন। মায়ের সেইসব শাসন ও তদারকি তখন তার কাছে লোহার শিকলের মতো ভারী মনে হতো। এমনকি একদিন রাগ করে সে মাকে বলেই ফেলেছিল যে তিনি তাকে কোনো দিন বড় হতে দেবেন না। জবাবে তার মা বলেছিলেন যে মায়ের কাছে সন্তানরা কখনো বয়সে বড় হয় না, তাদের শুধু বয়সটাই বাড়ে।
আমেরিকায় এসে রাইসা সত্যি সত্যিই বড় হয়ে গিয়েছিল, এতটাই যে অসুস্থ হলেও সে কথা কাউকে বলতে পারত না। গায়ে জ্বর নিয়ে সে রান্না করত এবং কোমরব্যথা সহ্য করে নিজের সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দিত। প্রবাসের মাটিতে দেশের কথা মনে পড়ে যখন তার দুই চোখ লাল হয়ে উঠত, তখন অফিসের সহকর্মীদের সে বলত এটি নিছক ‘অ্যালার্জি’। তবুও মনের গভীর কোণ থেকে মাঝেমধ্যে তীব্র ইচ্ছা জাগত, যদি কেউ এসে কপালে হাত দিয়ে পরম যত্নে বলত যে তার শরীর কেন এত গরম। মানুষের শারীরিক বয়স বাড়লেও তার মনটি চিরকাল শিশুর মতো মায়ের উষ্ণ কোলে ফিরে যেতে চায়। প্রতি সপ্তাহের শনিবার সকালে মায়ের সঙ্গে তার ভিডিও কলে কথা হতো। মা ফোনটি এমন অদ্ভুতভাবে ধরে রাখতেন যে পর্দার ভেতর শুধু তার কপালটিই দেখা যেত। রাইসা তখন অনুরোধ করত ফোনটি একটু নিচে নামাতে। মা তখন ফোন আরও নামিয়ে নিজের থুতনি দেখাতেন। এমন দৃশ্য দেখে পাশ থেকে বাবা বিরক্ত হয়ে বলতেন যে তিনি যেন ফোনটি তাঁর হাতে দেন, কারণ সামান্য একটা ফোন চালানো আজও তিনি শিখতে পারেননি। ফোনটি হাতে নিয়ে বাবা প্রথমে ক্যামেরা বন্ধ করে দিয়ে নিজের নাকের একটি বিশাল ছবি সামনে এনে বলতেন যে এবার তাঁকে দেখা যাচ্ছে কি না। বাবার এমন কৌতুক দেখে রাইসার এত হাসি পেত যে সে আর কথাই বলতে পারত না। মেয়ের হাসিমুখ দেখে বাবাও হেসে উঠতেন এবং মা তখন রাগের ভান করতেন।
ভিডিও কল শেষ হওয়ার পর রাইসার ঘরটি হঠাৎ অত্যন্ত নিস্তব্ধ হয়ে যেত। ফোনের স্ক্রিনে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে তার মনে হতো, মা-বাবার সঙ্গে কথা বলার ওই কয়েকটা মুহূর্তের জন্য সে আবার সেই পুরোনো রাইসা হয়ে গেছে। যে মেয়েটি দুপুরে ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর পড়ার টেবিলে ঢাকা ভাত পেত এবং বাড়িতে ফিরতে একটু দেরি হলেই বাবা গলির মোড়ে অধীর আগ্রহে দাঁড়িয়ে থাকতেন। কল কেটে যাওয়ার সঙ্গেই সে আবার দুই সন্তানের জননী, একজন দায়িত্বশীল স্ত্রী এবং একটি কোম্পানির গুরুদায়িত্ব পালনকারী কর্মী। প্রবাসের এই প্রান্তে তাকে আর কেউ স্নেহের সঙ্গে শুধু মেয়ে বলে ডাকত না। অথচ তার বাবা তাকে কখনোই ‘মা’ ছাড়া অন্য কোনো নামে ডাকেননি। রাইসা যখন কলেজজীবনে একবার অনেক রাতে বাসায় ফিরেছিল এবং তার ফোনের চার্জ ফুরিয়ে গিয়েছিল, তখনো তার বাবা গলির মোড়েই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর মুখ ছিল বেশ কঠিন এবং চোখের নিচে স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ। কিন্তু তাকে দেখামাত্র বাবা শুধু নরম সুরে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে তার ক্ষুধা লেগেছে কি না এবং সে কিছু খেয়েছে কি না। সেদিন বাবার সঙ্গে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে রাইসার উপলব্ধি হয়েছিল যে বাবার ভালোবাসা হয়তো সন্তানের ওপর রাগ করতেও ভয় পায়, পাছে সন্তানটি আরও দূরে চলে যায়। আমেরিকায় চলে আসার দিন বিমানবন্দরে বিদায়লগ্নে তার বাবা অবিকল সেই একই প্রশ্ন করেছিলেন। মা তখন কাঁদতে কাঁদতে অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন যে প্লেনেই তো খাবার দেওয়া হয়, তাদের মেয়ে কোনো গভীর জঙ্গলে যাচ্ছে না। সেদিন যাওয়ার আগে বাবা একেবারে গোপনে রাইসার হাতের মুঠোয় পাঁচ শ টাকার একটি নোঙ গুঁজে দিয়েছিলেন। রাইসা তখন মৃদু হেসে বলেছিল যে বিদেশের মাটিতে এই টাকা দিয়ে সে কী করবে। জবাবে বাবা পরম স্নেহে বলেছিলেন যে তার কিছু করতে হবে না, শুধু যেন টাকাটা নিজের কাছে দেশের স্মৃতি হিসেবে রাখে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর