নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
অনেকেই বেশ আক্ষেপের সুরে প্রশ্ন করেন যে, তাঁরা তো বিশ্বাসের যাবতীয় নিয়মকানুন যথাযথভাবে পালনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা নির্দিষ্ট সময়ে দৈনিক সালাত আদায় করছেন, নিয়মিত পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করছেন, দিন ও রাতের নির্দিষ্ট তাসবিহ বা জিকির করছেন, পিতা-মাতার খেদমত করছেন, যাবতীয় পাপকাজ থেকে দূরে থাকছেন এবং কোনো অন্যায় ত্রুটি হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে মহান স্রষ্টার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। এত কিছুর পরও কেন তাঁদের জীবনে কোনো বড় ধরনের সাফল্য ধরা দিচ্ছে না, তা নিয়ে মনে নানা প্রশ্ন জাগে।
এই পরিস্থিতি মানুষের মনে গভীর হতাশার জন্ম দিতে পারে, যখন কেউ দেখে যে সে পবিত্র কোরআন মুখস্থ করার জন্য প্রচুর চেষ্টা করেও সফল হচ্ছে না। আবার কেউ সৎ উপায়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে গিয়ে কোনো রকমে টেনেটুনে দিন পার করছে, কিংবা একজন আদর্শ পিতা হওয়ার শতচেষ্টা করেও নিজের সন্তানকে নিজের অনুকূলে পাচ্ছে না। এমনকি নিয়মিত দান-সদকা করার পরও যখন বিপদ বা সংকট কমে না, তখন অন্তরে একধরনের মানসিক যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়।
চারপাশে তাকালে এই মানসিক কষ্ট আরও বহুগুণ বেড়ে যায়, যখন দেখা যায় যে সমস্ত মানুষ ধর্মীয় কোনো বিধিবিধানের তোয়াক্কাই করে না, তারা দিব্যি চরম সফলতা অর্জন করে চলেছে। ইসলাম ধর্মের জীবনদর্শনের আলোকের বিচার করলে এই না পাওয়ার নেপথ্যে দয়াময় আল্লাহর কোনো গোপন কল্যাণ বা রহস্য লুকিয়ে আছে কি না, সেই প্রশ্নটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।
আমাদের কাঙ্ক্ষিত বস্তু বা লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ার অর্থ কখনোই এমন নয় যে মহান প্রতিপালক আমাদের আকুতি বা প্রার্থনা শুনছেন না। বরং কোনো কিছু না দেওয়া বা আটকে রাখার ফলের মধ্যেই বহু ক্ষেত্রে আল্লাহর বিশেষ বরকত বা কল্যাণ লুকিয়ে থাকে।
পবিত্র কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা মানুষ অপছন্দ করে, অথচ সেটাই তার জন্য পরম কল্যাণকর হয়ে দেখা দেয়। আবার এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা মানুষ অত্যন্ত পছন্দ বা ভালোবাসে, অথচ তা আদতে তার জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়। এই নিখিল সৃষ্টিজগতের প্রকৃত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহই রাখেন, সাধারণ মানুষ তা অবগত নয়।
পার্থিব জীবনের চাওয়া এবং পাওয়ার হিসাবের ক্ষেত্রেও এই শাশ্বত নীতিটি শতভাগ সত্য ও কার্যকর। আমাদের অপূর্ণ এবং অধরা ইচ্ছাগুলোর বিপরীত দৃশ্যপট যদি আমরা একবার কল্পনা করার চেষ্টা করি, তবে এর মূল রহস্য সহজে অনুধাবন করা সম্ভব হবে।
কোরআন হিফজ করার বিষয়টি যদি বিবেচনা করা যায়, তবে দেখা যাবে কোনো ব্যক্তি যদি একবার চোখ বুলিয়েই সঙ্গে সঙ্গে পুরো পৃষ্ঠা মুখস্থ করে ফেলতে পারত, তবে কি সে পবিত্র এই গ্রন্থের সঙ্গে দিনের পর দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অতিবাহিত করত? বারবার তেলাওয়াত করার মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ সওয়াব বা পুণ্য অর্জিত হয়, তা কি সে পেত?
ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের ক্ষেত্রটি যদি লক্ষ্য করা যায়, তবে দেখা যাবে সূরুতে বা প্রারম্ভেই যদি ব্যবসায় অভাবনীয় সফলতা চলে আসত, তবে এত দ্রুত ব্যবসা সম্প্রসারণ করার এবং চাপ সহ্য করার মতো মানসিক পরিপক্বতা কি ব্যবসায়ীর থাকত? প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার পর সে কি আগের মতো খাঁটি অন্তরে দান করতে পারত, নাকি কেবল কর ছাড় পাওয়ার উদ্দেশ্যে হিসাব করে দান করত?
পারিবারিক জীবনের সম্পর্কের কথা চিন্তা করলে দেখা যায়, সন্তানরা যদি কোনো ধরনের কষ্ট না দিয়ে একেবারে নিখুঁতভাবে বাবা-মায়ের প্রতিটি নির্দেশ মেনে চলত, তবে অভিভাবকত্ব পালনের নেপথ্যে যে আত্মিক ধৈর্য, দয়া এবং প্রজ্ঞার এক সুদীর্ঘ শিক্ষণীয় সফর রয়েছে, তা কি কখনো অর্জন করা সম্ভব হতো?
বিখ্যাত সুফি সাধক ইবনে আতাউল্লাহ আল-ইস্কান্দারি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, অনেক সময় আল্লাহতায়ালা কোনো কিছু না দেওয়ার আড়ালের মাধ্যমেই মানুষকে দান করেন, আবার কখনো দেওয়ার আড়ালের মাধ্যমে তাকে বঞ্চিত করেন। যখন মানুষের কাছে কোনো কিছু না পাওয়ার বা বঞ্চনার আসল রহস্য স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়, তখন এই না পাওয়া বিষয়টিকে তার কাছে একটি পরম উপহার বলে মনে হয়।
কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জিত না হওয়া মানেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়া বা বিষণ্ণ হয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই; বরং এটি মানুষের ভেতরের যাবতীয় ঘাটতি ও দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করার একটি চমৎকার তাগিদ। এই আহ্বানকে প্রধানত দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি ও ফলপ্রসূ।
প্রথম দিকটি হলো আত্মিক ও নৈতিক মূল্যায়ন। ঐতিহাসিক ওহুদ যুদ্ধের ময়দানে সাহাবিদের সাময়িক বিপর্যয়ের ঘটনাটি তাঁদের এই শিক্ষাই দিয়েছিল যে মহান নবীর নির্দেশ অমান্য করার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। ঠিক একইভাবে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে যখন কোনো কাজ বারবার আটকে যায়, তখন গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখতে হবে যে কোনো সূক্ষ্ম পাপ বা অসচেতন আচরণ আমাদের বরকতের পথকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে কি না। হয়তো জন্মদাতা পিতা-মাতা কিংবা রক্ত সম্পর্কের কোনো আত্মীয়ের সঙ্গে আচরণে কোনো মারাত্মক ত্রুটি রয়ে গেছে।
বাহ্যিক দৃষ্টিতে কোনো বড় ভুল বা অপরাধ খুঁজে না পেলেও মহান আল্লাহর দরবারে নিয়মিত ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। কারণ, ইস্তিগফার হলো জীবনের বন্ধ হয়ে যাওয়া সকল দুয়ার খুলে দেওয়ার সবচেয়ে মোক্ষম ও শক্তিশালী মাধ্যম।
নবী নুহ (আ.)-এর পবিত্র বাণী স্মরণ করে কোরআনে বলা হয়েছে যে, মানুষ যেন তার প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, কারণ তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি আসমান থেকে প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন এবং অফুরন্ত সম্পদ ও সন্তানসন্ততি দিয়ে মানুষকে সমৃদ্ধ করবেন।
দ্বিতীয় দিকটি হলো কৌশলগত মূল্যায়ন। কেবল নির্দিষ্ট আমল বা দোয়ার ওপর ভরসা করে বসে না থেকে কাজের কর্মপদ্ধতিতে কোনো ভুল বা ঘাটতি আছে কি না, তাও ভালোভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। মুখস্থ করার পুরনো কৌশল বা পদ্ধতি কাজ না করলে নতুন কোনো উপায়ে চেষ্টা চালাতে হবে। একইভাবে ব্যবসায় আশানুরূপ অগ্রগতি না হলে পণ্যের মান উন্নয়ন, ক্রেতাদের মূল্যায়ন এবং বাজারজাতকরণের কৌশল পরিবর্তন করতে হবে। চেষ্টার কোনো বিকল্প হতে পারে না।
মহান স্রষ্টা যদি আমাদের প্রতিটি চাওয়া চাওবামাত্রই সঙ্গে সঙ্গে পূরণ করে দিতেন, তবে এই নশ্বর পৃথিবীর ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রতি মানুষের মনে তীব্র মোহ ও প্রীতি জন্মে যেত। মানুষ কি তবে রাতের শেষ তৃতীয়াংশে তাহাজ্জুদ সালাতে দাঁড়িয়ে পরম রবের দরবারে দুই ফোঁটা চোখের জল ফেলত?
পরকালের চিরস্থায়ী বেহেশত লাভ করার জন্য কি মানুষের অন্তরে এত তীব্র আকুলতা ও ব্যাকুলতা সৃষ্টি হতো? প্রকৃত সত্য হলো এই পৃথিবী কখনো বেহেশত বা জান্নাত হতে পারে না, এখানে নানা ধরনের কষ্ট, বিলম্ব এবং অপূর্ণতা সবসময়ই বিদ্যমান থাকবে।
ইসলাম ধর্ম আমাদের সবসময় কাজের সেরা প্রস্তুতি গ্রহণ করতে এবং কঠোর পরিশ্রম করে যেতে শিক্ষা দেয়, কিন্তু ফলাফলের মায়াজাল থেকে নিজের মনকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখতে বলে। কারণ আমাদের কর্মের চূড়ান্ত ফলাফলের আসল মালিক আমরা নই, এর একক মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ।
বিচার দিবসে আল্লাহ আমাদের কাজের ফলাফলের জন্য কোনো হিসাব নেবেন না, বরং তিনি নিখুঁতভাবে বিচার করবেন আমাদের বিশুদ্ধ নিয়ত এবং আন্তরিক প্রচেষ্টার মাত্রা।
মহানবী (সা.) স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, সমস্ত কাজকর্মের ফলাফল সম্পূর্ণরূপে নিয়তের ওপর নির্ভরশীল এবং প্রতিটি মানুষ ঠিক ততটুকুই লাভ করবে, যতটুকু সে নিয়ত করবে।
অতএব, কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করতে কিছুটা বিলম্ব ঘটলেও মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও ভরসা বজায় রেখে অবিরাম পরিশ্রম ও দোয়া চালিয়ে যেতে হবে। যে পরম সত্তা আজ আমাদের কোনো বস্তু দেওয়া থেকে বিরত রেখেছেন, তিনি তাঁর অসীম প্রজ্ঞার মাধ্যমে আমাদের জন্য এর চেয়েও অধিক উত্তম ও স্থায়ী কোনো বরকত গোপনে সুরক্ষিত রেখেছেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর