নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
চলতি বছরের শুরুতে কন্যাসন্তানের মা হওয়া অস্ট্রেলীয় মডেল, ফ্যাশন ডিজাইনার ও ইনফ্লুয়েন্সার সাহারা রে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি হাসপাতালে মাত্র ৩৪ বছর বয়সে মারা গেছেন। গত রোববার ১৮ অক্টোবর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং সোমবার মার্কিন বিনোদনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টিএমজেড তাঁর মৃত্যুর খবরটি প্রকাশ্যে আনে। পরিবারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, মৃত্যুর মুহূর্তটিতে হাসপাতালের বিছানার পাশে তাঁর স্বজনেরা উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁরা সবাই সাহারাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন।
মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে পরিবার প্রথমে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করলেও ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইল একটি ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে জানিয়েছে যে, শক্তিশালী মাদকজাতীয় ব্যথানাশারক ফেন্টানিলের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। গত শুক্রবার রাতে অসুস্থ বোধ করায় তাঁকে লস অ্যাঞ্জেলেসের হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটলে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে রোববার পরিবারের পক্ষ থেকে সেই জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা খুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। পেজ সিক্সও ডেইলি মেইলের এই তথ্য সমর্থন করেছে, যদিও পরিবার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তরફ থেকে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি এবং অতিরিক্ত মাত্রার ওষুধ সেবনের এই ঘটনাটি দুর্ঘটনাবশত ছিল কি না, তাও স্পষ্ট নয়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে জন্ম নেওয়া কন্যাসন্তানের নাম রেখেছিলেন স্নো এবং মা হওয়ার পর থেকেই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেয়েকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে আসছিলেন। গত ২৫ জানুয়ারি সন্তান প্রসবের জন্য হাসপাতালে যাওয়ার আগে তিনি মা হওয়ার আনন্দের পাশাপাশি নিজের মনের উদ্বেগের কথাও ভক্ত-অনুরাগীদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন।
গত ১৯ জুলাই ইনস্টাগ্রামে শিশুকন্যা স্নোয়ের কয়েকটি ছবি শেয়ার করে ভালোবাসার বার্তা দিয়েছিলেন সাহারা, যা ছিল তাঁর ইনস্টাগ্রাম গ্রিডের সর্বশেষ পোস্ট। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর পর সেই ছবিগুলোর নিচে এখন আবেগঘন মন্তব্যের মাধ্যমে শোক প্রকাশ করছেন তাঁর অসংখ্য অনুসারী।
মৃত্যুর আগের বেশ কিছুদিন ধরে নানামুখী শারীরিক জটিলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন এই মডেল, যার মধ্যে ২০২৪ সালে তাঁর শরীরে গিয়াঁ-বারে সিনড্রোম নামের এক বিরল স্নায়বিক রোগ ধরা পড়েছিল। সাহারা নিজেই জানিয়েছিলেন যে, ওই বছরের এপ্রিলে একজন মদ্যপ চালকের গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার পর থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটেছিল।
সেই সড়ক দুর্ঘটনার পর তাঁর ঊরুর ওপরের অংশ থেকে শুরু করে পায়ের পাতা পর্যন্ত সম্পূর্ণ অনুভূতি ও চলাচলের ক্ষমতা হারিয়ে গিয়েছিল, যার ফলে তাঁকে হুইলচেয়ার ও বিভিন্ন হাঁটার সহায়ক যন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হতো। ২০২৪ সালের মে মাসে অস্ট্রেলিয়ার সেভেন নিউজ তাঁর এই অসুস্থতা ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে সাহারা বলেছিলেন তাঁর জীবন মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেলেও তিনি সুস্থ হয়ে ওঠার আশা ছেড়ে দেননি এবং পরবর্তীতে তাঁর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতিও হয়েছিল।
শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনের নানা সংকট ও সংগ্রামের কথাও সাহারা অনুরাগীদের কাছে প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে তিনি জানিয়েছিলেন যে, মাদক এবং অ্যালকোহলের ওপর নির্ভরতা কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য তিনি ত্রিশ দিনের একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
মানসিক স্বাস্থ্য ও আসক্তি থেকে মুক্তির লড়াইয়ের সেই অভিজ্ঞতাও তিনি নিজের অনুসারীদের সঙ্গে খোলামেলাভাবে আলোচনা করেছিলেন, যদিও অতীতে নেওয়া সেই আসক্তির চিকিৎসার সঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক মৃত্যুর কোনো সরাসরি সংযোগ রয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
অস্ট্রেলিয়ার পরিচিত সার্ফার টনি রের কন্যা সাহারা তাঁর শৈশবের বড় একটা অংশ অস্ট্রেলিয়া, ক্যালিফোর্নিয়া ও হাওয়াইয়ের বিভিন্ন স্থানে কাটিয়েছিলেন এবং বাবার মাধ্যমেই তাঁর মনে সমুদ্র ও সার্ফিংয়ের প্রতি গভীর অনুরাগের জন্ম হয়েছিল। কৈশোর পেরিয়ে তিনি মডেলিং ও ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের দুনিয়ায় প্রবেশ করেন এবং ২০১৪ সালে নিজের সুইমওয়্যার ব্র্যান্ড ‘সাহারা রে সুইম’ বাজারে নিয়ে আসেন।
মডেলিংয়ের পাশাপাশি ব্যবসা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব উপস্থিতির কারণে ধীরে ধীরে তাঁর পরিচিতি বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ২০১৬ সালে হাওয়াইয়ে কানাডীয় পপতারকা জাস্টিন বিবারের সঙ্গে তাঁর ছু্ট কাটানোর ছবি প্রকাশ্যে এলে তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। যদিও তাঁদের প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপক গুঞ্জন ছড়িয়েছিল, তবে এই জুটির কেউই কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিত করেননি এবং এর আগে অস্ট্রেলীয় সংগীতশিল্পী কোডি সিম্পসনের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্কের কানাঘুষা শোনা গিয়েছিল।
সাহারার মৃত্যুর পর তাঁর মা গ্রেচেন বাখ ডেইলি মেইলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, তাঁর মেয়ে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ, ভালোবাসায় পরিপূর্ণ এবং একজন সদয় মনের মানুষ ছিলেন। পরিবার, ফ্যাশনের দুনিয়া, তাঁর ছোট্ট মেয়ে স্নো আর সার্ফিং—এই সমস্ত কিছু নিয়েই আবর্তিত হয়েছিল সাহারার ভালোবাসার পূর্ণ পৃথিবীটি।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর