ঢাকা | বঙ্গাব্দ

বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহার করে কমানো যাবে ৫২৬০ মেগাওয়াট চাহিদা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 2, 2026 ইং
বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহার করে কমানো যাবে ৫২৬০ মেগাওয়াট চাহিদা ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

গ্রীষ্মকালে যখন বিদ্যুতের চাহিদা তার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছায়, তখন কেবল আবাসিক খাতের পাখাগুলো সচল রাখার মাধ্যমেই ৫ হাজার ২১২ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা তৈরি হয়ে থাকে। সাধারণত রাত নয়টার এই বিশেষ সময়টিতে বাসা বাড়িতে এই ঘূর্ণায়মান যন্ত্রগুলোর ব্যবহার সর্বাধিক মাত্রায় পরিলক্ষিত হয়। তবে প্রচলিত এই সাধারণ পাখাগুলো অপসারণ করে যদি কম বিদ্যুৎ খরচকারী বিএলডিসি বা ব্রাশলেস ডাইরেক্ট কারেন্ট প্রযুক্তি সম্পন্ন পাখা ব্যবহার করা যায়, তবে এক লাফে ২ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুতের তীব্র চাহিদা হ্রাস করা পুরোপুরি সম্ভবপর হবে।

ইনস্টিটিউট ফর অ্যানার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস বা আইইইএফএ নামক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রস্তুত করা একটি সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। চলতি সপ্তাহের সোমবার দিনটিতেই এই গবেষণার প্রতিবেদনটি সবার সামনে আনা হয়। গবেষণাটি পরিচালনার জন্য দেশের মোট ২৬টি ভিন্ন জেলার ৪৩৫টি পরিবারকে তাদের মাসিক আয়ের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা হয়েছিল এবং তাদের ওপর জরিপ চালিয়েই এই তথ্যগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে বলে একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

‘হাউসহোল্ড স্পেস কুলিং ইন বাংলাদেশ: রোল অব এনার্জি-এফিশিয়েন্ট ফ্যানস’ নামক এই বিস্তারিত প্রতিবেদনটি রচনা করেছেন ওই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ বিষয়ক প্রধান জ্বালানিবিশ্লেষক শফিকুল আলম। এই প্রকাশিত দলিলে আবাসস্থলে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী এই বিশেষ যন্ত্রগুলো ব্যবহারের ফলে জনগণ ও দেশ কী ধরনের সুফল লাভ করতে পারবে, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায় যে, বর্তমানে আমাদের দেশে যে পরিমাণ পাখা ব্যবহৃত হচ্ছে, তার মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ হলো বিএলডিসি প্রযুক্তির। এই উন্নত মানের ফ্যানগুলো চালাতে মাত্র ৩৫ ওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, অথচ ঐতিহ্যবাহী সাধারণ ফ্যানগুলো চালাতে ৭০ ওয়াট কিংবা তার থেকেও বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয়ে থাকে।

প্রতিষ্ঠানটির প্রেরিত বিজ্ঞপ্তিতে আরও পরিষ্কার করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের সিংহভাগই আবাসিক খাতে খরচ করা হয়। এই আবাসিক বিদ্যুৎ খরচের বড় একটা অংশ চলে যায় পাখা এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসির পেছনে। পরিচালিত গবেষণায় উঠে এসেছে যে, কম আয়ের পরিবারগুলোও গরমের মৌসুমে অন্তত দুটি করে পাখা সার্বক্ষণিক ব্যবহার করে থাকে, যার ফলে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ শিখর চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। সময়মতো সেই বর্ধিত চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব না হওয়ায় অনেক সময় ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটেরও বেশি লোডশেডিংয়ের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সামলাতে হয়। এমন প্রেক্ষাপটে সাধারণ ফ্যানের পরিবর্তে বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহার করা গেলে যেমন গ্রীষ্মকালের প্রচণ্ড চাহিদার চাপ কমানো যাবে, তেমনি ভবিষ্যতের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে চার শ কোটি ডলারেরও বেশি নতুন বিনিয়োগ করা থেকে বিরত থাকা সম্ভব হবে। বর্তমানে ব্যবহৃত অধিক বিদ্যুৎভোগী সমস্ত ফ্যান পরিবর্তন করতে এই সমপরিমাণ অর্থই যথেষ্ট হতো।

এই সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে জ্বালানিবিশ্লেষক শফিকুল আলম উল্লেখ করেন যে, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের চেন বিঘ্নিত হওয়ার কারণে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবির পক্ষে বর্তমানের এই চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা আরও বেশি দুরূহ হয়ে পড়েছে। যদি বাসা বাড়িতে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী এই যন্ত্রগুলোর ব্যবহার উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি পায়, তবে সামগ্রিকভাবেই বিদ্যুতের চাহিদা কমে আসবে এবং পিডিবির ওপর থেকে অতিরিক্ত চাপের বোঝা অনেকটাই হ্রাস পাবে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, সাধারণ মানুষের মাঝে বিদ্যুৎ বিল কমিয়ে আনার তীব্র আগ্রহ থাকলেও বাজারে উপলব্ধ এই বিদ্যুৎসাশ্রয়ী পাখাগুলো সম্পর্কে তাদের পর্যাপ্ত কোনো ধারণাই নেই।

জরিপে অংশগ্রহণকারী পরিবারগুলোর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ পরিবারই সম্পূর্ণভাবে অজ্ঞ ছিল যে বাজারে আদৌ এ ধরনের উন্নত ও সাশ্রয়ী ফ্যান ক্রয় করার জন্য পাওয়া যায় কি না।

বছরে আট হাজার নয়শত সাতাশি কোটি টাকা সাশ্রয় হবে

গবেষণা প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশের প্রতিটি বাড়িতে বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহার করা গেলে প্রতি বছর সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৯১৩ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। যার আর্থিক বাজারমূল্য হিসেব করলে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা বা প্রায় ৭৩ কোটি মার্কিন ডলার। এই বিশেষ পাখাগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে ঠিক কতখানি বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা যায়, সেই সুসংবাদটি জানার পরেই মূলত জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৯৬ শতাংশ পরিবারই নিজ গৃহে বিএলডিসি ফ্যানগুলো ব্যবহার করার জন্য প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে বাজারে এই যন্ত্রগুলোর দাম তুলনামূলকভাবে বেশি থাকায় সাধারণ অনেক পরিবারের পক্ষ থেকেই এত টাকা খরচ করে এই ফ্যানগুলো কেনা অত্যন্ত কঠিন একটি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান বাজারে একটি সাধারণ ফ্যানের দাম মাত্র দুই হাজার টাকার কাছাকাছি বা প্রায় ১৬ দশমিক ৩ মার্কিন ডলার, পক্ষান্তরে একটি বিএলডিসি ফ্যানের বাজারমূল্য ৫ হাজার থেকে শুরু করে ৬ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে, যা প্রায় ৪০ দশমিক ৭ থেকে ৫১ দশমিক ৩ মার্কিন ডলারের সমান।

আমাদের দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ পরিবারেরই মাসিক গড় আয় ২৫ হাজার টাকা কিংবা তার চেয়েও কম। অথচ গরমের এই মৌসুমে এই ধরনের দরিদ্র পরিবারগুলোরও মাসিক বিদ্যুতের বিল আসে গড়ে প্রায় ৬৬৩ টাকা। যদি কোনো ধরনের আর্থিক বা রাষ্ট্রীয় সহায়তা পাওয়া না যায়, তবে কেবল বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের মাধ্যমে বিএলডিসি ফ্যান কেনার অতিরিক্ত খরচটি সম্পূর্ণ পুষিয়ে নিতে এই পরিবারগুলোর দীর্ঘ ৭ দশমিক ৭ থেকে ৯ দশমিক ৬ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ব্যয় হবে। তবে যদি বড় কোনো পরিসরে একত্রে অনেকগুলো ফ্যান ক্রয় করা সম্ভব হয় এবং এর পাশাপাশি কার্বন ক্রেডিট বিক্রির অর্জিত অর্থ সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে এই দীর্ঘ সময়কালটি হ্রাস পেয়ে মাত্র ৪ দশমিক ৮ বছরে নেমে আসতে পারে। বর্তমান এই বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী এই যন্ত্রগুলোর ব্যবহার দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে সরকারকে অত্যন্ত পরিকল্পিত একটি বিশেষ কর্মসূচি হাতে নেওয়ার জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রে মোট সাতটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা পেশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে যে, দেশের প্রতিটি বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যানের ব্যবহার জনকল্যাণে ব্যাপকভাবে বাড়াতে হলে একটি জাতীয়ভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। সাধারণ জনগণকে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যানের উপযোগিতা এবং কীভাবে এই যন্ত্রগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে মাসিক বিদ্যুৎ বিল উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব, সে বিষয়ে স্পষ্টভাবে অবহিত করা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণ ক্রেতারা যাতে খুব সহজেই বাজার থেকে আসল বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যানগুলো নির্ভুলভাবে চিনতে পারেন, তার জন্য ফ্যানের মান নির্ধারণের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট লেবেল সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হলেও তা দারুণ সুফল বয়ে আনবে। এ ছাড়াও, স্বল্প আয়ের প্রান্তিক পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে বিএলডিসি ফ্যানের দাম কমিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। এমনকি সহজ কিস্তির মাধ্যমে এই ফ্যানের মূল্য পরিশোধ করার সুযোগ রাখার পাশাপাশি মাসিক বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে তার সমন্বয় সাধনের পথও উন্মুক্ত রাখা যেতে পারে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ইসলামে স্ত্রীগণের অধিকার ও স্বামীদের কর্তব্য

ইসলামে স্ত্রীগণের অধিকার ও স্বামীদের কর্তব্য