নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
চাঁপাইনবাবগঞ্জে একই সড়ক ঘিরে সাবেক ও বর্তমান সংসদ সদস্যের পাল্টাপাল্টি উদ্বোধনী কার্যক্রম নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনার জন্ম হয়েছে। দিনের বিভিন্ন সময়ে দুই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব পৃথকভাবে সড়কটির তদারকি বা উদ্বোধনের দাবি জানালে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় মহলে নানা মতের সৃষ্টি হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার পর এক মতবিনিময় সমাবেশে বর্তমান সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, এলাকার অগ্রগতিতে সাবেক সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদের সঙ্গে একত্রে কাজ করতে তাঁর দিক থেকে কোনো বাধা নেই।
তবে তিনি পরিষ্কার ভাষায় জানান যে, যেকোনো সরকারি উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ওপর সংসদ সদস্যের তদারকি করার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন যে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই সদর নির্বাচনী এলাকায় যতগুলো উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন হবে, সেগুলোর সবগুলোর মূল দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত।
জনসাধারণ তাঁকে ৬২ হাজার ৬১৯ ভোটের বিশাল ব্যবধানে বিজয়ী করেছে বলে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, তাঁর নিজস্ব উদ্যোগে বাস্তবায়িত বা গৃহীত কোনো কাজ অন্য কোনো ব্যক্তি উদ্বোধন করবেন, এমন এখতিয়ার জনগণ কাউকে প্রদান করেনি।
এদিকে একই সড়ক ভিন্ন সময়ে দুইবার উদ্বোধনের বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে, হারুনুর রশীদ মুঠোফোনে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি দাবি করেন যে, এই সড়কটির জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি বরাদ্দ এবং পুরো প্রকল্পটি তিনিই মূলত নিয়ে এসেছিলেন।
সাবেক সংসদ সদস্য এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে তিনি যেকোনো সময় এই সড়কটি দেখতে যাওয়ার কিংবা উদ্বোধন করার অধিকার রাখেন বলে মন্তব্য করেন। বর্তমান সংসদ সদস্য বুলবুলকে এই বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করা হলে তা তাঁর কাছেই করার পরামর্শ দিয়ে তিনি জানান, এই প্রকল্পের বরাদ্দ যেহেতু তাঁর মাধ্যমেই এসেছে, তাই সড়কটি উদ্বোধনের পূর্ণ অধিকার তাঁর রয়েছে।
অপরদিকে, উদ্বোধনের পর আয়োজিত অন্য একটি আলোচনা সভায় হারুনুর রশীদ বর্তমান সংসদ সদস্যকে উদ্দেশ্য করে আরও নতুন নতুন সড়ক নির্মাণের জন্য সরকারের নিকট থেকে বাড়তি বরাদ্দ নিয়ে আসার জোরালো আহ্বান জানান।
আলোচ্য সড়কটি তাঁর নির্বাচনী ইশতেহার বা প্রতিশ্রুতির একটি অন্যতম অংশ ছিল এবং এই পূর্ণাঙ্গ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাঁর যথেষ্ট সহযোগিতা ছিল বলেও তিনি জোর দাবি জানান। তবে এই অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বর্তমান সংসদ সদস্যকে কিছুটা কটাক্ষ করতেও পিছপা হননি।
স্থানীয় নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকেও এই ধরনের রাজনৈতিক ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার হোসেন জুয়েল সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগের সময় থেকেই এই নির্দিষ্ট আসনে রাজনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘনের নানা ঘটনা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই পরিস্থিতি যদি ক্রমাগত চলতে থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে দলের নেতাকর্মীদের মাঝে শারীরিক হাতাহাতির মতো অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। এতে এলাকার সার্বিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চেয়ে রাজনৈতিক শিষ্টাচারটাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
রাজনৈতিক এই দ্বন্দ্রমূলক পরিস্থিতির কারণে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষই নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন এবং এর ফলে পুরো এলাকার শান্ত পরিবেশ মারাত্মকভাবে নষ্ট হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
পুরো বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন সড়ক নির্মাণের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদার মো. সেলিম রেজা। তিনি জানান যে, বর্তমান এবং সাবেক দুই প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের আয়োজিত অনুষ্ঠানেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত ছিলেন।
সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা যখন কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্প পরিদর্শন কিংবা তদারকি করতে যান, তখন ঠিকাদার হিসেবে তাঁকে সেখানে উপস্থিত থাকতে হয়। মূলত এই পেশাগত বাধ্যবাধকতার কারণেই তিনি উভয় নেতার অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন।
এই পুরো প্রসঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার এলজিইডির প্রকৌশলী মো. আজহারুল ইসলাম পরিষ্কার করে জানান যে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সড়কটির কোনো উদ্বোধন করা হয়নি।
যদি দাপ্তরিকভাবে এর কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন সম্পন্ন হতো, তবে সেখানে অবশ্যই একটি স্থায়ী উদ্বোধনী ফলক স্থাপন করা হতো। বর্তমান ও সাবেক এই দুই সংসদ সদস্য মূলত সেখানে গিয়েছিলেন কাজটি সঠিকভাবে তদারকি করার জন্য।
তিনি আরও জানান যে, সরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা প্রকল্প পরিদর্শন বা তদারকিতে গেলে এলজিইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত থাকেন। এই সড়কটির নির্মাণ সংক্রান্ত প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর