নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ফুটবল তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পের কোনো মন্তব্যে বেইজিংয়ের তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলেও দেশটির সাধারণ মানুষের মাঝে তৈরি হয়েছে এক ধোঁয়াশা। রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ডের সুনির্দিষ্ট কোন বক্তব্যে এই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া এসেছে, সেটি খুঁজে পেতেই ইন্টারনেট দুনিয়ায় গলদঘর্ম হচ্ছেন স্থানীয় নাগরিকরা।
সামাজিক মাধ্যমে নানা জন নানাভাবে সত্য উদঘাটনের চেষ্টা চালাচ্ছেন। অনেকেই আবার চ্যাটবট কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিচ্ছেন। তবে উত্তর দিতে গিয়ে এমন সব রূপক ও সাংকেতিক শব্দের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে, যা দেখে মনে হতে পারে কোনো অতি গোপনীয় রাষ্ট্রীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে।
গত সোমবার ব্যালন ডি’অর আয়োজনে উপস্থিত থাকার দিনে একটি পুরোনো মিম নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। একটি সাক্ষাৎকারে নিজের পছন্দের হাস্যকর ভিডিও প্রসঙ্গে ফরাসি এই খেলোয়াড় এমন একটি ক্লিপের কথা জানান, যেখানে তাঁর মুখাবয়ব একজন প্রাচীন শাসকের শরীরের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল।
ওই ভিডিওচিত্র প্রদর্শনের সময় পর্দার পেছনে সাবেক চীনা রাষ্ট্রনায়ক মাও সে-তুংয়ের ছবি ফুটে ওঠে। দেশটির ইতিহাস অনুযায়ী মাওকে নিয়ে যেকোনো ধরনের হাস্যরস বা বিদ্রূপ করা অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং নিষিদ্ধ একটি বিষয়। তাঁর বিতর্কিত শাসন আমলের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে অতীতে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।
যদিও কৌতুকপূর্ণ ওই ভিডিওটি তৈরি হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ায় দেশজুড়ে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর জেরে ফরাসি তারকার সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তি বাতিল করে একাধিক ব্র্যান্ড। সরকারি গণমাধ্যম লা লিগা খেলাগুলোর সটান সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়।
তীব্র সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদ এবং খেলোয়াড় নিজে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বাধ্য হন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও জানিয়ে দেওয়া হয় যে, জাতির অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো যেকোনো আচরণের বিরুদ্ধে পুরো সমাজ ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
কিন্তু এত সব কান্ড ঘটে যাওয়ার পরও মূল কারণটি সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের কাছে ধোঁয়াশাপূর্ণ রয়ে গেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির তথ্যমতে, ওয়েইবো প্ল্যাটফর্মে অসংখ্য মানুষ বারবার জানতে চেয়েছেন ঠিক কোন কথাটির কারণে এত বড় কাণ্ড ঘটে গেল।
এর পেছনে প্রধান কারণ হলো দেশটির কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট ব্যবস্থা। ভিনদেশি তথ্যের অবাধ প্রবাহ না থাকায় এই তীব্র উত্তেজনার মূল উৎস সম্পর্কে অনেকের পক্ষেই পরিষ্কার ধারণা লাভ করা সম্ভব হচ্ছে না।
যাঁরা ঘটনাটির পেছনের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তাঁরাও খোলাখুলি কোনো মন্তব্য করতে সাহস পাচ্ছেন না। ফলে শুরু হয়েছে চরম সতর্কতা অবলম্বন করে রূপক ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা।
মাও সে-তুংয়ের নাম সরাসরি উচ্চারণ না করে তাঁকে ১০০ টাকার নোটে থাকা প্রতিকৃতি কিংবা শিক্ষক হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। অতীতে এই উপাধিটি ওই নেতার নিজেরও ব্যবহৃত হয়েছিল।
ভিডিও বা ছবি শেয়ার করার ক্ষেত্রেও সমানভাবে বজায় রাখা হচ্ছে এই রাখঢাক নীতি। চিত্রের বিভিন্ন অংশ অস্পষ্ট করা হচ্ছে, কোথাও খেলোয়াড়ের মুখ ঢেকে দেওয়া হচ্ছে কিংবা মূল স্বৈরশাসক শব্দটি সম্পূর্ণরুপে বাদ দেওয়া হচ্ছে।
তথ্য জানানোর প্রবল আগ্রহ থাকলেও সেন্সরশিপের বেড়াজালে পড়ে সবাই যেন এক লুকোচুরি খেলায় লিপ্ত হয়েছেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, ঘটনার গভীরতা সবাই বুঝতে পারলেও তা মুখফুটে বলার কোনো উপায় নেই।
সঠিক কারণ অনুসন্ধানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বারস্থ হয়েও খুব একটা সুবিধা করতে পারছেন না কৌতূহলী নেটিজেনরা। কারণ স্থানীয় চ্যাটবটগুলো কঠোর সরকারি নীতিমালার আওতায় পরিচালিত হয়ে থাকে।
সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই পুরো ঘটনায় সরকারি বা করপোরেট পর্যায়ের কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ওই নেতার নাম সরাসরি উচ্চারণ করা হয়নি। পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিক্রিয়া কিংবা সংশ্লিষ্ট ক্লাব ও খেলোয়াড়ের ক্ষমা প্রার্থনার কোনোটিতেই সুনির্দিষ্টভাবে তাঁর নাম আনা হয়নি।
পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে ক্ষোভের মাত্রা চরম পর্যায়ে পৌঁছালেও তার পেছনের আসল অনুঘটক বা কারণটি মুখে আনার ক্ষেত্রে সবাই এক অদ্ভুত অদৃশ্য ভয়ে ভুগছেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর