নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মেঝেতে পড়ে যাওয়া খাবার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তুলে নিলে তা খাওয়ার উপযোগী থাকে, এমন একটি ধারণা বহু দিন ধরে প্রচলিত রয়েছে। অনেক মানুষ এই কথায় বিশ্বাস করেন এবং এই যুক্তির পক্ষে তাদের নিজস্ব কিছু ধারণা রয়েছে।
তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, খাবার হঠাৎ নিচে পড়লে ময়লা বা জীবাণু তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে না। জীবাণুরও বিষয়টি বুঝতে পেরে খাবারে আক্রমণ করতে কিছুটা সময় লাগে।
এই সময়ের ব্যবধানে খাবারটি দ্রুত তুলে নিতে পারলে জীবাণু সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। যদিও বিষয়টি নিয়ে অনেকের মনে সংশয় থাকে, তবুও অনেকে সুযোগ পেলে এই ঝুঁকি নিয়ে থাকেন।
অনেকের কাছেই এই কাজটি একপ্রকার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে এবং তারা প্রায়ই মেঝে থেকে খাবার তুলে খেয়ে ফেলেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, এই বহুল প্রচলিত কথাটি কি আদৌ কোনো বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে?
যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানবিষয়ক সংস্থা গিলসন সায়েন্সেসের পরিচালক এরিন থেইন এই ধারণাকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, পাঁচ সেকেন্ডের এই নিয়মটি সম্পূর্ণ ভুল হলেও খাবারটি কোথায় ও কোন পরিবেশে পড়েছে, সেটাই আসল বিষয়।
বিজ্ঞানীদের গবেষণায় এই পাঁচ সেকেন্ডের তত্ত্বটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তবে সব পরিবেশ এবং সব ধরনের খাবার সমান নয়, তাই ঝুঁকি সব সময় একই রকম থাকে না।
কিছু খাবার মেঝেতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর জীবাণু শোষণ করে নেয়, আবার শুকনা খাবারের ক্ষেত্রে ময়লা জমার হার কিছুটা কম হয়।
বিজ্ঞানীদের একটি দল এই বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখেছেন এবং তাঁদের সেই পরীক্ষার ফলাফল সত্যিই বেশ চমকপ্রদ।
গবেشک এরিন থেইনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, খাবার কতটা আর্দ্র এবং মেঝেটি কী ধরনের উপাদানে তৈরি, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে।
একই পরিমাণ জীবাণু থাকা সত্ত্বেও কার্পেটের চেয়ে মসৃণ মেঝেতে থাকা খাবারে জীবাণু অনেক দ্রুত সংক্রমিত হয়।
শুকনা খাবারের তুলনায় ভেজা বা আঠালো প্রকৃতির খাবারে জীবাণু খুব দ্রুত আটকে যাওয়ার প্রবণতা থাকে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, টাইলসের মেঝেতে জ্যাম মাখানো পাউরুটি পড়লে তাতে ক্ষতিকর জীবাণু লাগার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
বিজ্ঞানী এরিন থেন আরও ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, বিষয়টি কেবল এতটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে আরও বেশ কিছু জটিল দিক রয়েছে।
খাবারটি কি কোনো ঘরের ড্রয়িংরুমের পরিষ্কার টাইলসে পড়েছে, নাকি কোনো ব্যস্ত বাসস্ট্যান্ড কিংবা রেলস্টেশনের পাবলিক টয়লেটের সামনে পড়েছে?
পড়ে যাওয়া বস্তুটি কি মুখ থেকে ফেলে দেওয়া কোনো চুইংগাম, যা পুনরায় মুখে তোলা হচ্ছে, নাকি একটি সাধারণ শুকনা বিস্কুট?
এ ছাড়া যিনি এই খাবারটি কুড়িয়ে খাচ্ছেন, তিনি কি একজন পূর্ণ সুস্থ মানুষ, নাকি তার রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বেশ দুর্বল?
এরিন থেইনের মতে, আমাদের ঘরের ভেতরের মেঝে এবং বাইরের রাস্তার পরিবেশের মধ্যে আদতে খুব বড় কোনো তফাত নেই।
নানা ধরনের মাধ্যম ও উপায়ে বাইরের ধুলাবালি খুব সহজেই ঘরের ভেতরের মেঝেতে এসে ছড়িয়ে পড়ে।
মেঝের এই ধুলাবালিতে এমন কিছু ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, যেগুলো মানবদেহের ত্বকের নানা সমস্যা বা বিভিন্ন রোগের জন্য দায়ী।
এ ছাড়া আমাদের অন্ত্রের বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াও ঘরের মেঝেমধ্যে উপস্থিত থাকতে পারে।
মানুষের জুতো, বহন করা ব্যাগ এবং পরিহিত জামাকাপড়ের মাধ্যমে নানা ধরনের ছত্রাক বা ইস্ট ঘরের ভেতর ছড়াতে পারে।
এই ছত্রাক বা ইস্ট মানুষের পেটের নানা জটিল সমস্যা কিংবা বমি হওয়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অতএব, যেকোনো পরিস্থিতিই হোক না কেন, মেঝেতে পড়ে যাওয়া খাবার পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে তুলে নিলে তা নিরাপদ থাকে, এই ধারণা বেশ বিপজ্জনক।
বিজ্ঞানী থেইনের স্পষ্ট পরামর্শ হলো, ভেজা বা আঠালো কোনো খাবার মেঝেতে পড়লে তা কোনো অবস্থাতেই খাওয়া উচিত নয়।
এই ধরনের খাবারগুলো স্পঞ্জের মতো খুব সহজেই সমস্ত জীবাণু ও ময়লা দ্রুত শুষে নেয়।
তবে এই সমস্ত ঝুঁকির বাইরে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হলো, মেঝেতে পড়ে যাওয়া যেকোনো ধরনের খাবারই বর্জন করা এবং তা না খাওয়া।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর