নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সোমবার মহা অষ্টমীর সকালে মন্ত্রপাঠ এবং ঢাকের বাদ্যে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে ঢাকার নবাবগঞ্জের বর্ধনপাড়ার তিনশো দশ বছরের পুরোনো বড় পালবাড়ি সর্বজনীন দুর্গামন্দির প্রাঙ্গণ। প্রতিমার পায়ে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণের উদ্দেশ্যে সেখানে নারী ও পুরুষের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। ভক্তদের কারোর মুঠোয় ছিল ফুল আবার কারোর হাতে শোভাবর্ধন করছিল বেলপাতা।
ঐতিহাসিক এই মন্দিরে স্থানীয় ভক্তদের পাশাপাশি উপস্থিত হন ভারতের চন্দননগর ও কোচবিহার থেকে আগত অতিথিবৃন্দও। অনেকের কাছেই এই পূজায় অংশগ্রহণ নিছক উৎসব অবলোকন নয়, বরং পৈতৃক শেকড়ের সান্নিধ্যে ফিরে আসার এক সুবর্ণ সুযোগ।
সকালবেলা মন্দিরের ভেতরে ভক্তদের সারিতে যথেষ্ট শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দেখা যায়। অঞ্জলি প্রদান পর্ব শেষ হওয়ার পর পুণ্যার্থীরা নিজেদের পাশাপাশি পরিবারের সবার কল্যাণ প্রার্থনা করেন। এ সময় কেউ কেউ প্রার্থনা জানান শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য, আবার অন্য অনেকে দেশ ও সর্বস্তরের মানুষের মঙ্গলের কামনা করেন।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কোচবিহার জেলা থেকে নবাবগঞ্জের বর্ধনপাড়ায় এসে উপস্থিত হয়েছেন যদুনাথ পাল এবং তাঁর সহধর্মিণী হেনা পাল। প্রায় ৩৮ বছর বাদে তাঁরা নিজেদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটিতে পা রাখলেন। সোমবার সকালেও অঞ্জলি প্রদানকালে এই দম্পতিকে একান্ত মনে প্রার্থনা করতে দেখা যায়।
সীমান্তের ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও শারদীয় দুর্গোৎসবের আবেদন কীভাবে মানুষকে একই সুতোয় বেঁধে ফেলে, তার বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে এই মন্দির চত্বরে। ভারতের চন্দননগরের বাসিন্দা তেইশ বছর বয়সী ইতি পাল দিদির বাড়িতে এসেছেন আজ থেকে এক যুগ পর, পূর্বপুরুষদের এই মন্দিরের উৎসবে শামিল হতে। তাঁর সঙ্গে পুরো পরিবারও উপস্থিত রয়েছে এবং দশমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাঁরা নিজ দেশে ফিরে যাবেন।
ইতি পাল মন্তব্য করেন যে কলকাতার জাঁকজমকপূর্ণ পূজাও তাঁকে নিজের টানে ধরে রাখতে পারেনি। ইছামতী নদীর তীরের সেই পুরনো স্মৃতিগুলো তাঁকে বরাবরই হাতছানি দিয়ে ডেকে আনে।
কোচবিহারের যদুনাথ পাল জানান যে এই গ্রামের সঙ্গে তাঁর অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। এত দীর্ঘ সময় পর এখানে আসায় সবকিছুই যেন ফিকে মনে হচ্ছে এবং অনেক কিছুই বদলে গেছে। তা সত্ত্বেও গ্রামীণ পরিবেশের চিরচেনা আবহ তাঁকে দারুণ আনন্দ দিয়েছে বলে জানান তিনি।
এলাকাবাসীর কাছে এই মন্দির কেবল উপাসনার স্থান নয়, এটি বহুদিনের সংস্কৃতি এবং পারিবারিক স্মৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিন শতাব্দীর বর্ণাঢ্য ইতিহাস ধারণ করে এই মন্দিরটি অদ্যাবধি দুর্গোৎসবের আবহ সযত্নে টিকিয়ে রেখেছে।
অঞ্জলি সমাপ্তির পর অনেক ভক্তকেই মন্দির আঙিনায় কিছু সময় কাটাতে দেখা যায়। প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী, পূজার নান্দনিক আয়োজন এবং পরিচিত মানুষদের পারস্পরিক সাক্ষাতের ফলে পুরো প্রাঙ্গণটি এক আনন্দঘন মিলনমেলায় রূপ নেয়।
স্থানীয় ও ভিনদেশি অতিথি এবং আত্মীয়স্বজনের সরব উপস্থিতির কারণে এবারের পূজার আনন্দ বহুলাংশে বেড়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন মন্দির কমিটির সভাপতি শ্যামল পাল। তিনি জানান, নবাবগঞ্জ উপজেলাজুড়ে এবছর সর্বমোট দু'শো একটি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপিত হচ্ছে, যার মধ্যে বর্ধনপাড়ার বড় পালবাড়ি সর্বজনীন দুর্গামন্দিরের বয়স তিনশো দশ বছর। প্রশাসনসহ সকলের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা পাওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর