নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি নিয়ে শত পৃষ্ঠার একটি তালিকা প্রকাশ করেছে স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। এই প্রস্তুতকারক সংস্থার প্রকাশ করা ঝুঁকি সংক্রান্ত নথিতে বলা হয়েছে যে আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার কিংবা তাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার অপচেষ্টা চালাতে পারে। কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেও এই ধরনের ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে এআই মডেলগুলো। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে যে এমন কিছু ঘটনার নিদর্শন মিলেছে, যেখানে এআই মডেলগুলোর আচরণকে মানুষের সঙ্গে এক ধরণের ব্লাকমেইল বা ব্ল্যাকমেইলের সমতুল্য বলে মনে হয়েছে। ব্যবহারকারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে নিজেদের অনুকূলে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে এই বুদ্ধিমত্তাগুলো এমন সন্দেহজনক আচরণ প্রদর্শন করে থাকে।
এই ধরনের অপ্রত্যাশিত আচরণ মাত্র একবার সংঘটিত হলেও তা সাধারণ মানুষের মাঝে মারাত্মক উদ্বেগের জন্ম দিতে পারে। এমনকি বাস্তব ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বড় বা ছোট ক্ষতি না হলেও এর ফলস্বরূপ সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কঠোর নজরদারি শুরু হতে পারে। পাশাপাশি আইনি মামলা-মোকদ্দমার আইনি ঝুঁকি বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সুনাম ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের মতো অ্যানথ্রপিকও বিভিন্ন সরকারি বিধিনিষেধ, আইনি নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ এবং দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলার ঝুঁকির মুখে রয়েছে। কোম্পানিটি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছে যে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত পনেরটি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলরা নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে তাদের সমসাময়িক আরেকটি কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন। মূলত এখানে বিশ্বখ্যাত চ্যাটজিপিটি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
অ্যানথ্রপিক আরও জোরালোভাবে সতর্ক করেছে যে সাধারণ মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলগুলোর ওপর নির্ভর করার পর নিজেদের মারাত্মক আত্মক্ষতি ঘটিয়েছে কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সহিংস কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়েছে। এ জাতীয় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো পরবর্তীতে জনসাধারণের পক্ষ থেকে তীব্র সমালোচনা, আইনি লড়াই, ফৌজদারি তদন্ত, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কড়া নজরদারি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুনামহানির অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠতে পারে।
পরবর্তীতে এই ধরনের জটিল ঝুঁকিগুলো দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজনীয় বিমা কভারেজ সংগ্রহ করাও প্রতিষ্ঠানটির জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে। অ্যানথ্রপিক তাদের মূল্যায়নে উল্লেখ করেছে যে সম্পূর্ণ বিমা শিল্পটিই সম্ভবত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট কোনো বিপর্যয়কর বা আকস্মিক দুর্ঘটনার জন্য পর্যাপ্ত বিমা পলিসির ঝুঁকি গ্রহণ বা এর পূর্ণ আর্থিক দায়ভার বহন করতে সম্পূর্ণ অক্ষম হবে।
প্রতিষ্ঠানটি আরও বিশদভাবে জানিয়েছে যে এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা কোম্পানিগুলো স্থানীয়, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের দ্রুত পরিবর্তনশীল আইনগত কাঠামোর কঠোর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। পাশাপাশি বর্তমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার চলমান বিরোধ, বাণিজ্যিক সরবরাহব্যবস্থা এবং সার্বিক ব্যবসায়িক পরিচালনাগত ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকট তৈরি করছে। এই সমস্ত ঝুঁকির গভীর তালিকায় মার্কিন সরকারের বিভিন্ন নীতিনির্ধারক পদক্ষেপও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, বিগত ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কার্যকালে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পর্ক বেশ সংকটপূর্ণ ও বিরোধপূর্ণ রূপ নিয়েছিল।
প্রতিষ্ঠানটি গণমাধ্যমে জানিয়েছে যে চলতি বছরের একেবারে শুরুর দিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর বা পেন্টাগন অ্যানথ্রপিককে সরবরাহব্যবস্থার জন্য একটি সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। এর পূর্বেও অ্যানথ্রপিক প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিল যে তাদের তৈরি প্রযুক্তি যেন কোনোভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ভূখণ্ডের ভেতরে ব্যাপক নজরদারি কিংবা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় প্রাণঘাতী অস্ত্রের কাজে ব্যবহার করা না হয়।
এর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্বেগের কারণে এই বছরের প্রথমভাগে মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ অ্যানথ্রপিকের সর্বাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলগুলোর রপ্তানির ওপর সাময়িকভাবে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বিভিন্ন সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য ঝুঁকি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে অ্যানথ্রপিকের দেওয়া সতর্কবার্তার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তা সত্ত্বেও অ্যানথ্রপিক তাদের পূর্বনির্ধারিত অবস্থান থেকে একচুলও সরে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা করছে না। কোম্পানিটি দৃঢ়ভাবে জানিয়েছে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপদ ও সম্পূর্ণ দায়িত্বশীল বিকাশ সুনিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে তারা বিশ্বাস করে, এমন কঠোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার পক্ষে তারা তাদের প্রচার ও তৎপরতা অব্যাহত রাখবে।
অ্যানথ্রপিক আরও আলোকপাত করেছে যে তারা ইতোমধ্যে নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বর্ধিত দৃশ্যমানতার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে এবং ভবিষ্যতেই এই জাতীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু সরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে অতিরিক্ত নজরদারি কিংবা অন্য সমজাতীয় প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির তুলনায় পক্ষপাতদুষ্টভাবে তাদের বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার বড় ঝুঁকি রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের গভীর আশঙ্কা হলো, একই রকম পরিস্থিতিতে অন্যান্য কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে এমন নিবিড় নজরদারি না থাকলেও কেবল অ্যানথ্রপিককে বিশেষভাবে টার্গেট করা হতে পারে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর