ঢাকা | বঙ্গাব্দ

সুন্দর ও মধুর বাক্যের জাদুকরী ৬ সুফল

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 20, 2026 ইং
সুন্দর ও মধুর বাক্যের জাদুকরী ৬ সুফল ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

সাধারণ মানুষের সঙ্গে যেকোনো আলাপচারিতায় শ্রুতিমধুর ও ভদ্র ভাষা প্রয়োগ করার অর্থ হলো এমন বার্তা বিনিময় করা, যা শ্রবণকারীর মনে গভীর স্বস্তি ও আনন্দ জাগায় এবং যার প্রভাবে অন্তরে ইতিবাচক ভাবনার উন্মেষ ঘটে। যে ধরনের সংলাপ সমাজজীবনে সুফল বয়ে আনে, সব ধরনের অশান্তি চিরতরে মুছে ফেলে এবং কল্যাণের পথ প্রশস্ত করে অকল্যাণের পথ শক্তহাতে রুদ্ধ করে, তাকেই মূলত উত্তম অভিব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।

ইসলাম ধর্মে এই ধরনের সুন্দর বাক্যকে 'কালিমাতুত তাইয়্যিবাহ' অভিধায় ভূষিত করা হয়েছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে সদাচারী ও সুমধুর ভাষা ব্যবহারের নির্দেশ দিয়ে পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন যে, তোমরা সকলে মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত সুন্দরভাবে কথা বলবে, যা সুরা বাকারার ৮৩ নম্বর আয়াতে উল্লেখ রয়েছে।

মানবসমাজে পারস্পরিক শান্তি, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির ধারা অব্যাহত রাখতে এবং একটি আদর্শ সুখ-সমৃদ্ধ সমাজ বিনির্মাণে মিষ্টি ভাষার প্রয়োগের কোনো বিকল্প হতে পারে না। এই কারণে পবিত্র কোরআন ও হাদিসের বিভিন্ন স্থানে মানুষের সঙ্গে ব্যবহারের ক্ষেত্রে মধুর শব্দচয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে এবং এর বিনিময়ে পরকালে মহাপুরস্কার বা সওয়াব প্রাপ্তির সুসংবাদ ঘোষণা করা হয়েছে।

উত্তম বাক্যালাপের সুফল সমাজ এবং ব্যক্তির জীবনে অত্যন্ত ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী হয়ে থাকে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলা একটি চমৎকার রূপকের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন যে, ভালো কথার প্রকৃত দৃষ্টান্ত হলো একটি উর্বর ও সুন্দর গাছের মতো, যার শিকড় মাটির গভীরে সুদৃঢ়ভাবে প্রোথিত থাকে এবং যার শাখা-প্রশাখা উঁচুতে আকাশে বিস্তৃত হয়ে প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে সব সময় ফল দান করতে থাকে।

পবিত্র কোরআনের সুরা ইব্রাহিমের ২৪ ও ২৫ নম্বর আয়াতে বর্ণিত এই রূপকের মাধ্যমে মূলত মানুষের সঙ্গে সুন্দর কথোপকথনের দীর্ঘস্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী কল্যাণের দিকটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিশিষ্ট মুফাসসির ইবনে কাসির তাঁর বিখ্যাত 'তাফসিরুল কুরআনিল আজিম' গ্রন্থের চতুর্থ খণ্ডের ৫২২ পৃষ্ঠায় এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, যা বৈরুতের দারুল ফিকর থেকে ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয়।

মিষ্টি ভাষা বা মার্জিত অভিব্যক্তি মানুষকে পরস্পরের সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির এক অদৃশ্য মায়ার বন্ধনে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ করে তোলে। মানুষের সঙ্গে যদি অনুপম ভাষাশৈলী ও চমৎকার আচরণ বজায় রাখা যায়, তবে চরম কোনো শত্রুকেও অতি সহজে পরম বন্ধুতে পরিণত করা সম্পূর্ণ সম্ভব হয়।

পবিত্র কোরআনের সুরা ফুসসিলাতের ৩৪ নম্বর আয়াতে এই মর্মে বলা হয়েছে যে, ভালো এবং মন্দ কখনো সমান হতে পারে না, তাই মন্দকে প্রতিহত করো এমন কিছু দিয়ে যা অত্যন্ত উত্তম, যার ফলে তোমার সঙ্গে যার শত্রুতা রয়েছে সে যেন একপর্যায়ে অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হয়।

ইসলাম ধর্মে সুন্দর কথাবার্তার গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) প্রতিটি ভালো কথা বলাকে এক একটি সদকা হিসেবে গণ্য করার কথা বলেছেন। মুসনাদে আহমদের ৭৪৭০ নম্বর হাদিসে তিনি স্পষ্ট ভাষায় এরশাদ করেছেন যে, মানুষের সঙ্গে ভালো কথা বলা এক প্রকার সদকা এবং নামাজের দিকে ধাবিত হওয়া প্রতিটি পদক্ষেপই সদকা।

সাধারণত যেকোনো ধরনের দান-সদকা মানুষের জাহান্নামের প্রজ্জ্বলিত আগুন নিভিয়ে ফেলতে সাহায্য করে থাকে। যেসব অসহায় মানুষের নগদ অর্থ বা অন্য কোনো সম্পদ দান করার আর্থিক সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য এই উত্তম বাক্য বা ভালো কথা বলাকে দানের একটি চমৎকার বিকল্প হিসেবে জোরালোভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) একসময় সাহাবিদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনা দিয়ে বলেছিলেন যে, খেজুরের দানার একটি ক্ষুদ্র টুকরো দিয়ে হলেও তোমরা নিজেদের দোজখের আগুন থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করো। যদি তোমাদের সেই সামর্থ্যটুকুও না থাকে, তবে অন্তত ভালো কথা বলে নিজেদের রক্ষা করো, যা সহিহ বুখারির ১৪১৭ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

তিনি আরও একটি হাদিসে ইরশাদ করেছেন যে, তোমরা কখনো ভালো কাজের কোনোটিকেই সামান্য বা তুচ্ছ জ্ঞান করো না। যদি এমন হয় যে তোমরা দৃশ্যমান কোনো ভালো কাজ খুঁজে পাচ্ছো না, তবে অন্তত মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত নরম ও ভদ্র ভাষায় কথা বলবে এবং সেই বিশেষ মুহূর্তে তোমাদের চেহারা যেন থাকে প্রসন্ন, যা সহিহ ইবনে হিব্বানের ৫৯৮ নম্বর হাদিসে উল্লেখ আছে।

মিষ্টি ও মার্জিত ভাষা ব্যবহার করা হলো সরাসরি বেহেশত বা জান্নাত লাভ করার অন্যতম প্রধান একটি চাবিকাঠি। বিশিষ্ট সাহাবি হজরত জাবির (রা.) থেকে একটি বর্ণনা এসেছে যেখানে রাসুল (সা.) বলেছেন যে, সাধারণ মানুষকে তৃপ্তিভরে খাবার খাওয়ানো এবং সর্বদা মধুর ভাষা ব্যবহার করা মানুষের জন্য নিশ্চিত জান্নাত লাভ করা সুগম করে দেয়।

তাবারানির বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-মুজামুল আওসাত'-এর চতুর্থ খণ্ডের ৫৮ পৃষ্ঠায় ১৯৯৫ সালে কায়রো থেকে প্রকাশিত তথ্যে এই ঘটনার উল্লেখ আছে, যেখানে জনৈক সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এমন একটি বিশেষ আমল সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন যার মাধ্যমে জান্নাত নিশ্চিত হয়। তখন তিনি তাকে উত্তম কথা বলা এবং ক্ষুধার্তকে খাবার দান করার কথা বলেছিলেন।

কঠোর, কর্কশ ও রূঢ় ভাষা দিয়ে কখনোই কোনো মানুষের মন জয় করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) যদি স্বভাবগতভাবে মিষ্টভাষী ও কোমলহৃদয় না হতেন, তবে তিনি তাঁর ওপর অর্পিত মহান দ্বীনি মিশনে কখনোই সফল হতে পারতেন না।

পবিত্র কোরআনের সুরা আলে ইমরানের ১৫৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন যে, তাঁর বিশেষ রহমতেই আপনি তাদের প্রতি অত্যন্ত কোমলহৃদয় হতে পেরেছেন, পক্ষান্তরে আপনি যদি কর্কশভাষী ও কঠিন মনের অধিকারী হতেন, তবে তারা সকলেই আপনার আশপাশ থেকে চিরতরে সরে যেত।

কোনো মানুষ যদি কোনো বিশেষ প্রয়োজনে কারও কাছে আসে এবং সেই মুহূর্তে তার সেই প্রয়োজনটি পুরোপুরি পূরণ করা যদি সম্ভব নাও হয়, তবুও তার সঙ্গে অত্যন্ত ভালো ও নম্র ভাষায় কথা বলা উচিত। কারণ এর মাধ্যমেই ওই ব্যক্তি মনে গভীর শান্তি ও প্রশান্তি লাভ করতে পারে।

হজরত আলী (রা.) অত্যন্ত সুন্দর একটি বাণীতে বলেছেন যে, তোমরা কখনোই মানুষকে শুধু অর্থকড়ি দিয়ে সন্তুষ্ট করতে পারবে না, বরং তাদের চরিত্র ও ভালো ব্যবহার দিয়ে সন্তুষ্ট করো। সুতরাং সব মানুষের সঙ্গেই সর্বদা ভালো কথা বলতে হবে এবং নম্র আচরণ বজায় রাখতে হবে।

হজরত আলী ইবন আবি তালিব রচিত 'নাহজুল বালাগা' গ্রন্থের ৪১২ পৃষ্ঠায়, যা ২০০২ সালে বৈরুতের দারুল মরতাদা থেকে প্রকাশিত হয়েছে, এই অমূল্য উপদেশটি লিপিবদ্ধ আছে। এমনকি ফেরাউনের মতো কুখ্যাত ও অবাধ্য জালেমের কাছে দাওয়াত দেওয়ার জন্য পাঠানোর সময়ও আল্লাহ তাআলা নবী মুসা ও হারুন (আ.)-কে অত্যন্ত নরম ভাষা প্রয়োগ করার সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন।

পবিত্র কোরআনের সুরা ত্বহার ৪৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন যে, অতঃপর তোমরা উভয়ে সেই জালেমের সঙ্গে অত্যন্ত নরম ও ভদ্র ভাষায় কথা বলো, হয়তো সে তোমাদের এই উপদেশ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে কিংবা আল্লাহর আজাবকে ভয় পাবে।

অন্যদিকে যে ধরনের কথাবার্তা শুনলে মানুষ মনে কষ্ট পায়, তা কখনোই ভালো কথার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। যারা সর্বদা মানুষের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়ায়, কথায় কথায় অন্যদের অভিসম্পাত করে এবং মুখে অশ্লীল ও নির্লজ্জ কথাবার্তা বলে বেড়ায়, তারা কস্মিনকালেও প্রকৃত মুমিন বা ঈমানদার হতে পারে না, যা সুনানে তিরমিজির ১৯৭০ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

এই পুরো বিষয়টির ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন রাজবাড়ীর নাদির হোসেন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সাকী মাহবুব।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
রামকৃষ্ণ মিশনে মহাষ্টমীতে আজ অনুষ্ঠিত হবে কুমারীপূজা

রামকৃষ্ণ মিশনে মহাষ্টমীতে আজ অনুষ্ঠিত হবে কুমারীপূজা