নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
গত বছর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে পা রাখা নাঈম আহমেদ নিজের অভিষেক আসরে মাত্র তিনটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। চলতি মৌসুমেও তিনি রাজশাহীর প্রথম একাদশে সুযোগ পান, তবে প্রথম পাঁচ ম্যাচের দশ ইনিংসে দুটি ফিফটি পেলেও বড় কোনো ইনিংস খেলতে পারেননি।
অবশেষে নিজের প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পেতে নাঈমের বেশি সময় লাগেনি, যা তাঁকে এনে দেয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। গত পরশু সেঞ্চুরি পাওয়ার পর দিনই তিনি সেই ইনিংসটিকে এক দুর্দান্ত ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দেন।
মুঠোফোনে নিজের এমন অর্জনের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে এই তরুণ ব্যাটার কেবল এক শব্দের ইংরেজি উচ্চারণ করেই নিজের দারুণ উচ্ছ্বাসের কথা জানান।
গতকাল রাজশাহীর বিভাগীয় স্টেডিয়ামে যখন নাঈম ব্যাটিংয়ে নামেন, তখন তাঁর নামের পাশে যোগ হয়েছিল ১৭৬ রান।
মাঠের চতুর্দিকে দৃষ্টিনন্দন শট খেলে তিনি প্রতিপক্ষ বরিশালের বোলারদের একপ্রকার অসহায় করে তোলেন।
২১ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার ডাবল সেঞ্চুরির দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে কোনো স্নায়ুচাপে ভুগেছেন কি না, তা নিয়ে থাকে জল্পনা, তবে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।
নিজের ওপর অগাধ আস্থা রেখে নাঈম বিশ্বাস করতেন যে তিনি স্বাভাবিক খেলাটা খেলে ঠিকই দ্বিশতরান পূর্ণ করতে পারবেন।
ঝুঁকিপূর্ণ শট খেলা থেকে বিরত থেকে কেবল নিজের ব্যাটিং ফ্লো এবং দক্ষতার ওপর আস্থা রেখেই তিনি এগিয়ে গেছেন।
এই মাইলফলক স্পর্শ করার মাধ্যমে নাঈম নাম লিখিয়েছেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দেশের পঞ্চম ব্যাটার হিসেবে সেঞ্চুরিকে ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দেওয়া এক বিশেষ তালিকায়।
এই তালিকায় এর আগে নাম লিখেছিলেন তাইবুর রহমান, মোসাদ্দেক হোসেন, তাওহিদ হৃদয় ও আবদুল্লাহ আল মামুন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃতি সন্তান নাঈম ব্যক্তিগত জীবনে বেশ ছটফটে স্বভাবের এবং তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট।
বড় ভাইয়ের সঙ্গে চৌদ্দ বছর এবং বোনের সঙ্গে এগারো বছরের বয়সের ব্যবধান থাকায় পরিবারের সবার আদরের ছোট ছেলে তিনি।
তাঁর ভাষ্যমতে, তিনি যা-ই করেন না কেন, তাতেই তাঁর পরিবার সবসময় খুশি থাকে।
তাঁর বড় দুই ভাইবোন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
তবে নাঈমের পুরো জীবনটা আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা ছিল কেবল ক্রিকেটের সঙ্গে।
অনূর্ধ্ব-১৪ পর্যায়ে দেশজুড়ে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হওয়ার পর তিনি বিকেএসপিতে ভর্তি হন।
সেখান থেকে বয়সভিত্তিক ক্রিকেট হয়ে তিনি নাম লেখান প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের আঙিনায়।
এর মাঝে তিনি বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল এবং ঢাকা প্রিমিয়ার লিগেও ম্যাচ খেলেছেন।
তবে তাঁর ক্রিকেটের হাতেখড়িটা লাল বলে হয়নি, বরং তিনি টেপ টেনিস ক্রিকেট খেলে খ্যাতি কুড়িয়েছিলেন।
এলাকার এক বড় ভাইয়ের হাত ধরে তিনি পরবর্তী সময়ে ক্রিকেট বলে অনুশীলন শুরু করেন।
শুরুর দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান যে সুযোগ পেলেই তিনি যেকোনো জায়গায় খেলতে পছন্দ করতেন এবং মূল লক্ষ্য ছিল শুধু খেলা চালিয়ে যাওয়া।
ক্রিকেটের এই যাত্রায় তাঁর সঙ্গে চমৎকার মিল রয়েছে জাতীয় দলের উদীয়মান তারকা পেসার নাহিদ রানার।
উভয়েরই জন্মস্থান চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবং দুজনেরই ক্রিকেটজীবনের প্রথম পাঠ শুরু হয়েছিল টেপ টেনিস বলের মাধ্যমে।
শুধু জন্মস্থান বা শুরুর গল্পই নয়, রাজশাহীর ক্রিকেটে একসঙ্গে অনুশীলন ও ম্যাচ খেলার সুবাদে ২০১৯-২০ সাল থেকেই তাঁদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
খুব কাছ থেকে নাহিদ রানার অভাবনীয় উত্থান, জাতীয় দলে ডাক পাওয়া এবং তারকাখ্যাতি পাওয়ার পুরো সময়টাই দেখেছেন নাঈম।
এই অর্জনগুলো তাঁর নিজের মধ্যেও এক তীব্র বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে যে তিনিও অচিরেই জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করবেন।
তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি দেশের জার্সিতে খেলার সুযোগ পাবেন।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য চলতি মৌসুমের শুরু থেকেই তিনি নিজের খাদ্যাভ্যাস ও দৈনন্দিন জীবনাচার সম্পূর্ণ বদলে ফেলেছেন।
ধাপে ধাপে সিঁড়ি বেয়ে তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে জাতীয় দলে পৌঁছাতে চান।
পূর্বে রাজশাহীর হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নাহিদ রানার সঙ্গে মাঠে নামা এই তরুণের এখন মূল স্বপ্ন হলো দুজনের গায়ে একসঙ্গে জাতীয় দলের জার্সি জড়ানো।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর