নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
উত্তরবঙ্গের সাঁওতাল জনপদে যখন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার ঢাকের কাঠি বাজে, ঠিক সে সময়ই সেখানে প্রবহমান হয় ভিন্ন এক সুর; যা বুয়াং আর মাদলের আদিম ও গম্ভীর ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। সনাতন সম্প্রদায়ের কাছে যা শারদীয় দুর্গোৎসব, সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর কাছে অবিকল সেই একই দেবী দুর্গার আবহে নিজেদের স্বতন্ত্র ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক দাসাই নৃত্য হিসেবে পালিত হয়।
উভয় উৎসবের বাহ্যিক আচার ও রূপ ভিন্ন হলেও এগুলোর অন্তர்নিহিত মূল বার্তা এক ও অভিন্ন; আর তা হলো অশুভ শক্তির বিনাশ এবং মানবতার বিজয় নিশ্চিত করা। সুদীর্ঘ কাল ধরে এই দুটি উৎসব আমাদের এই জনপদে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক অনন্য ও অনবদ্য উদাহরণ তৈরি করে আসছে।
সাঁওতাল সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী দাসাই নৃত্যের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে একটি অত্যন্ত গভীর ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট। প্রচলিত সাঁওতাল লোকগাথা থেকে জানা যায় যে, মহিষাসুরের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের সময় সাঁওতালদের দুই বীর যোদ্ধা এবং পরম গুরু আয়নম ও কাজলকে আর্যরা বন্দী করে নিয়ে গিয়েছিল।
ওই বন্দী বীরদের মুক্ত করার উদ্দেশ্যে সাঁওতাল পুরুষেরা বিশেষ উপায়ে নারীর ছদ্মবেশ ধারণ করতে বাধ্য হন। তাঁরা নিজেদের মাথায় ময়ূরের পালক গুঁজে নেন এবং হাতে বাঁশের তির-ধনুক দিয়ে তৈরি বুয়াং ধারণ করেন, যা তাঁদের সংস্কৃতির একটি বিশেষ বাদ্যযন্ত্র।
এ সময় তাঁরা ছেঁড়া বস্তার পোশাক পরিধান করেন এবং নিজেদের মুখে চুন ও কালি মেখে এক ধরনের বিদ্রূপাত্মক চেহারা তৈরি করে জনপদে বেরিয়ে পড়েন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে নাচ পরিবেশন, লাফানি-ঝাঁপানি এবং গুনগুন করে গান গেয়ে তাঁরা এই অদ্ভুত আচার পালন শুরু করেন।
মূলত শত্রুশিবিরে ছদ্মবেশে প্রবেশ করে নিজেদের হারিয়ে যাওয়া বীরদের সন্ধান লাভ করাই ছিল এই বিশেষ নৃত্যের প্রধান ও ঐতিহাসিক উদ্দেশ্য।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর