ঢাকা | বঙ্গাব্দ

রাশিয়া গিয়ে প্রতারণার শিকার রাজবাড়ীর শ্রমিক, হাসপাতালে কান্নায় ভাঙলেন সোহেল

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 22, 2026 ইং
রাশিয়া গিয়ে প্রতারণার শিকার রাজবাড়ীর শ্রমিক, হাসপাতালে কান্নায় ভাঙলেন সোহেল ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

রাশিয়ার পেনজা শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার বাসিন্দা মো. আলী হাসান সোহেল। রাজধানী মস্কো থেকে প্রায় সাত শ কিলোমিটার দূরের ওই চিকিৎসাকেন্দ্রে তিনি গত এক মাস ১০ দিন ধরে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। আলী হাসানের সঙ্গে ভিডিও কলের মাধ্যমে কথা হয় সংবাদমাধ্যমের, যেখানে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান যে এ ধরনের মানবেতর জীবন কেউ কখনো কামনা করে না এবং বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করা হলে সুস্থ হওয়ার পর তাঁকে দেশে ফেরানোর চেষ্টা করা হবে বলে জানানো হয়েছে, তবে তাঁর আশঙ্কা সুস্থ হলেই তাঁকে আবার জোর করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

এক বছর পার হলেও নিজের দুই পায়ের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারবেন কি না তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন এই প্রবাসী। সারাক্ষণ শুধু প্রার্থনা করেন যাতে দ্রুত দেশে ফিরে প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে যেতে পারেন এবং যেকোনো উপায়ে তাঁকে এই নরককুণ্ড থেকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার আকুল আবেদন জানিয়েছেন তিনি।

গত ৭ মে নির্মাণকাজের চুক্তিতে দেশ ছেড়ে রাশিয়ায় পাড়ি জমান ৩০ জন বাংলাদেশি শ্রমিক, যাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আলী হাসান। এই ৩০ জনের একটি বড় অংশের সঙ্গে কথা বলে এবং তাঁদের পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের কোনো প্রতিশ্রুত চাকরি দেওয়া হয়নি; বরং সুচতুর প্রতারণার আশ্রয়ে তাঁদের জোরপূর্বক ইউক্রেনীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামানো হয়েছে। এই ভয়াবহ পরিণতিতে এখন পর্যন্ত অন্তত ২০ জন বাংলাদেশির মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে, ৬ জন এখনো সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে সক্রিয় আছেন, দুজন হাসপাতাল থেকে পালিয়ে স্বদেশে ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছেন এবং অন্য দুটি আলাদা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বাকি দুজন যেকোনো মূল্যে দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে যাচ্ছেন।

নিহত ব্যক্তিদের স্বজন ও আহত শ্রমিকদের ভাষ্যমতে, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর ওই ৩০ জনকে একটি সেনা ক্যাম্পে নিয়ে মোট তিনটি আলাদা দলে বিভক্ত করা হয়েছিল। আলী হাসান ছিলেন তাঁদেরই একটি ১৬ সদস্যের দলে। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, মাত্র পাঁচ দিন সংক্ষিপ্ত সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর ষষ্ঠ দিনেই তাঁদের পাঁচজনের একটি অগ্রবর্তী দলকে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়া হয়। এর পর মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে এবং সঙ্গে থাকা সামান্য শুকনো খাবার খেয়ে টানা তিন দিন পথ চলার পর তাঁরা মাটির নিচে অবস্থিত একটি গোপন সেনা ক্যাম্পে গিয়ে পৌঁছান, যেখানে পরবর্তীতে তাঁদের দলের বাকি ১১ জন সদস্যও এসে যোগ দেন।

পরবর্তীতে সেই ১৬ জনের দলকে সেনাবাহিনীর নির্দিষ্ট পোশাক পরিয়ে এবং হাতে অস্ত্র ধরিয়ে একজন একজন করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতো। এই দলটি থেকে বর্তমানে অন্তত ১৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন এবং কেবল দুজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেঁচে আছেন।

যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালে বন্দী করে শারীরিক নির্যাতনসহ নানা ধরনের কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো, যার ফলে বাধ্য হয়েই তাঁদের সামনে অগ্রসর হতে হতো। আলী হাসান জানান, অস্ত্র হাতে ধরিয়ে দিয়ে তাঁদের প্রলোভন দেখানো হতো যে সরাসরি যুদ্ধ করতে হবে না, শুধু ডানে-বাঁয়ে বা সামনে-পিছে অবস্থান করতে হবে। কিন্তু এটি ছিল মূলত একটি নির্মম মরণফাঁদ; সেখানে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার মুখে পড়তে হতো। হামলায় অনেকে প্রাণ হারাচ্ছেন, আবার কেউ আহত হয়ে বেঁচে ফিরলে তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত শুরু হওয়ার পর ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশ থেকে কর্মী গমনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। গত তিন বছরে এই প্রবণতা বহুগুণ বাড়লেও তাঁদের অনেকেই দেশটিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধের বলি হচ্ছেন। অনেকেই টোপে পড়ে সেখানে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন, যার প্রকৃত সংখ্যা অস্পষ্ট থাকলেও বিভিন্ন মাধ্যমে ৫৪ জনের বেশি বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশিদের এভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে মস্কোয় অবস্থিত রুশ দূতাবাসের কাছে ইমেইলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে আলী হাসানকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং তাঁর পরিবারের জন্য আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করতে গত ২৬ জুলাই প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে একটি আবেদনপত্র জমা দেন তাঁর স্ত্রী আকলিমা খাতুন। ওই আবেদনে উল্লেখ করা হয় যে জীবিকা অর্জনের তাগিদে রাশিয়ায় চাকরি নিয়ে যাওয়া আলী হাসান প্রতারণার ফাঁদে পড়ে রুশ সেনাবাহিনীর কবলে পড়েন, আর এদিকে দেশে পাওনাদারদের চাপ ও ঋণের কিস্তি পরিশোধের তাগিদে চরম বিপাকে রয়েছে তাঁর পরিবার।

আলী হাসানের মতোই প্রথম দফায় যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া পাঁচ সদস্যের আরেকটি দলের অংশ ছিলেন গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মো. পলাশ শেখ। ড্রোন হামলায় তাঁর একটি হাত সম্পূর্ণ উড়ে গেছে এবং তিনি গত ২৪ দিন ধরে মস্কোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পলাশের ফুফাতো ভাই আবু সালেহ ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, যেহেতু তাঁর একটি হাত নেই, তাই হয়তো তাঁকে আর যুদ্ধে পাঠানো হবে না এবং সুস্থ হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে। দূতাবাস থেকেও বলা হয়েছে যে সুস্থ হলেই তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে এবং পলাশ যেকোনো মূল্যে দেশে ফিরতে উদগ্রীব হয়ে আছেন।

পলাশ শেখকে কূটনৈতিক উপায়ে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং পরিবারের জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ চেয়ে গত ২৬ জুলাই তাঁর বোন চুমকি খানম প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে একটি লিখিত আবেদন করেন। চিঠিতে বলা হয়, উন্নত ভবিষ্যতের আশায় চড়া সুদে ঋণ ও ধারদেনা করে গত ৭ মে রাশিয়ায় যাওয়ার পর পলাশ চরম প্রতারণার শিকার হন এবং তাঁকে চতুরতার সঙ্গে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, আলী হাসান ও পলাশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মস্কোতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা এবং দেশে ফিরতে ইচ্ছুক এমন কোনো ব্যক্তি বা তাঁদের প্রতিনিধি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।

রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ কখনোই নিজ দেশে স্বজনদের কাছে ফিরে আসে না এবং পরিবারগুলো কোনো ধরনের আর্থিক ক্ষতিপূরণ থেকেও বঞ্চিত হয়। অভিবাসন খাতের সুপরিচিত বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী এ বিষয়ে মতামত দিয়ে বলেছেন যে, রুশ সরকারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এই দুই বাংলাদেশির সম্পূর্ণ দায়িত্ব বাংলাদেশ দূতাবাসকে নিজেদের কাঁধে নিতে হবে। তাঁদের যাবতীয় চিকিৎসা ব্যয়, বকেয়া পাওনা এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ রাশিয়ার কাছ থেকে আদায় করতে হবে এবং সুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁদের নিরাপদে স্বদেশে ফিরিয়ে আনার সুব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
খায়রুল কবির খোকন বললেন, ‘তারেক রহমানই সরকার পতন আন্দোলনের মা

খায়রুল কবির খোকন বললেন, ‘তারেক রহমানই সরকার পতন আন্দোলনের মা