নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মেঘনা নদীর ওপারে প্রকৃতির নান্দনিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে অবশেষে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হলো। রিকশাচালক ডান বা বাঁ কোনো এক ইশারায় সাদা রঙের একটি বাড়ি নির্দেশ করে জানালেন যে সেটাই কবির বসতভিটা। সেই নির্দেশ অনুযায়ী সামনে এগিয়ে যাওয়া মাত্রই যাত্রাপথ রোধ করল একটি মূল ফটক। ইঁট ও সিমেন্টে নির্মিত ওই ফটকটিতে রয়েছে একটি বিশাল কাঠের কপাট, যার গায়ে স্পষ্ট অবহেলার ও অযত্নের চিহ্ন। অনুমান করা যায়, অল্প কিছুদিনের মধ্যে হয়তো কাঠের এই দরজাটি আর অক্ষত থাকবে না, কারণ তীব্রভাবে ভেসে আসছে ঘুণপোকার শব্দ। মনে হয় যেন তারা সেখানে মহাআনন্দে স্থায়ী বসতি গেড়েছে।
কপাটের ওপরের দিকে দৃষ্টিপাত করতেই চোখে পড়ল ফটকের দেয়ালে বাংলা ও আরবি হরফে খোদাই করা বাড়ির নাম ‘বায়তুল আমান’। নামটির মাঝে এক ধরনের আভিজাত্যের আমেজ রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ১৯৬৪ সালে এই বাসভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছিল। ভেতরে প্রবেশের ইচ্ছা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি, কারণ বাড়িটি ছিল সম্পূর্ণ শূন্য। মূল ফটকে ঝুলছিল মাঝারি আকারের একটি তালা। তাই সীমানাপ্রাচীরের বাইরে দাঁড়িয়েই কবিকে নিয়ে স্মৃতিতে ঘেরা বাড়িটি অবলোকন করতে হলো। জানা যায়, কবি এখানে সর্বশেষ এসেছিলেন ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে এবং তার পরের বছরেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
কবির পৈতৃক বাড়ির ঠিক উত্তর দিকে প্রায় দেড় শ বছরের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ‘বায়তুন নূর’ পাড়াতলী শাহি জামে মসজিদ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সেখানকার ইমামের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, ১২৯৯ হিজরি সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে কবির পরিবারের সদস্যরা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে এর রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছেন। তিনটি দৃষ্টিনন্দন গম্বুজ ও একটি ছোট মিনার নিয়ে গঠিত এই মসজিদটি বেশ আকর্ষণীয়। সিঁড়ি বেয়ে সেই মিনারের ওপর ওঠার পর মসজিদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে সবার আগে নজর কাড়ে এর ভেতরের নিখুঁত কারুকাজ খচিত মিম্বর। খিলানের আদলে তৈরি চমৎকার নকশাটি সহজেই যে কারও মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম। নীল, লাল এবং সাদা রঙের সুষম ও চমৎকার প্রয়োগ এই পুরো স্থাপত্যটিকে দিয়েছে এক অনন্য রূপ ও পরিচিতি।
মসজিদ ভবনটির পাশেই রয়েছে একটি পুকুর, যার চারপাশ ঘন সবুজে ঘেরা গাছপালায় পরিপূর্ণ। শান্ত ও স্নিগ্ধ সেই জলাশয়ের পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে একটি সুন্দর শানবাঁধানো ঘাট। আর কিছু সময় পরই যখন বিকেল নেমে আসবে, তখন পুকুরের স্বচ্ছ জলে শুরু হবে আলো ও ছায়ার চমৎকার লুকোচুরি খেলা। স্বয়ং কবিও তো এই পুকুরটিকে নিয়ে তার সৃষ্টিতে কলম ধরেছিলেন।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর