নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মা ইলিশ প্রজনন নিরাপদ করার সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের কয়েকটি ঘাট এলাকায় অবৈধভাবে ইলিশ শিকারের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপজেলার উত্তর অঞ্চলের নির্দিষ্ট কিছু ঘাটে রাতের বেলা নৌকা নিয়ে সাগরে গিয়ে এই মাছ ধরা হচ্ছে এবং অন্ধকার নামলেই তা বেচাকেনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন বাসিন্দারা। অন্যদিকে এই চলমান নিষেধাজ্ঞার কারণে পেশাজীবী জেলেদের সব ধরনের আয় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে তীব্র অর্থসংকটে দিন কাটাতে হচ্ছে। অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, সরকারিভাবে নিষেধাজ্ঞা জারির দীর্ঘ পনেরো দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষতিগ্রস্ত জেলেকে খাদ্যসহায়তার চাল দেওয়া হয়নি। পেটের টানে বাধ্য হয়েই অনেক দরিদ্র জেলে জীবনঝুঁকি নিয়ে পেটের দায়ে মাছ শিকারে নামতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ইলিশ শিকারের ওপর চলমান এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে গত ৮ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত সন্দ্বীপের বিভিন্ন ঘাটে মোট ২৩ বার যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এর মধ্যে একুশটি অভিযানেই কোনো অপরাধীকে আটক কিংবা নিষিদ্ধ ইলিশ জব্দ করা সম্ভব হয়নি। বাকি মাত্র দুটি সফল অভিযানে সর্বমোট তিনশো পাঁচ কেজি ইলিশ মাছ এবং বিয়াল্লিশ হাজার মিটার অবৈধ জাল জব্দ করতে সক্ষম হয় কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে আটককৃত ওই দুই জেলেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক জরিমানা করা হয়।
এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে সন্দ্বীপ উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত মৎস্য কর্মকর্তা মো. মোতাছিম বিল্লাহ জানান, নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারী অসাধু চক্রকে ধরতে এবং চলমান অভিযানগুলোর কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়াতে তারা নতুন কৌশল নিয়ে গভীরভাবে ভাবছেন। অপরাধীদের হাতেনাতে ধরার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের সক্রিয় সহায়তায় গভীর সমুদ্রে সাঁড়াশি অভিযান চালানো কিংবা নিজস্ব লোকবল বৃদ্ধি করে একই এলাকায় بیکযোগে একাধিক স্থানে আকস্মিক অভিযান পরিচালনার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তাদের রয়েছে।
উত্তর সন্দ্বীপের বটগাছতলা এবং রহমতপুর এলাকায় যখন নিষেধাজ্ঞা অমান্যের এমন গুরুতর চিত্র দেখা যাচ্ছে, তখন ঠিক উল্টো দৃশ্য চোখে পড়ে দ্বীপটির দক্ষিণ অঞ্চলের ঘাটগুলোতে। দক্ষিণ সন্দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় জেলেরা গভীর সমুদ্রে যাওয়ার পরিবর্তে ডাঙায় বসে নতুন জাল বুনতে, জালের ছেঁড়া অংশ নিখুঁতভাবে মেরামত করতে এবং মোটা রশি জোড়া লাগানোর কাজে দারুণ ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন। নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার হওয়া মাত্রই তারা দলবেধে পুনরায় উত্তাল সাগরে মাছ ধরতে ফিরে যাবেন বলে সংবাদকর্মীদের নিশ্চিত করেছেন।
গত বুধবার দক্ষিণ সন্দ্বীপের সারিকাইত ইউনিয়নের বাংলাবাজার ও গাছতলী ঘাটে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, উপকূলীয় বেড়িবাঁধের ওপর বসে বেশ কয়েকজন জেলে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে তাদের ব্যবহৃত জালের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করছেন। এ ছাড়া পশ্চিম মাইটভাঙ্গা বেড়িবাঁধ ধরে গাছতলীর দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় আরও কয়েকটি স্থানে একই রকমের চিত্র দেখতে পাওয়া যায়। কাজ করতে করতেই স্থানীয় জেলে আবুল বাশার জানান যে, বর্তমানে সাগরে মাছ ধরা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় পর্যাপ্ত অবসর সময় পাওয়া গেছে এবং সে কারণেই তারা জালগুলো সেলাই করে পুরোপুরি প্রস্তুত করে রাখছেন যাতে নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ামাত্রই সাগরে নামা যায়।
অন্যদিকে সন্দ্বীপের সদরঘাটের একটি ফাঁকা স্থানে বসে ভারী সুতার সাহায্যে নতুন জাল বুনতে ব্যস্ত ছিলেন দুর্লভ জলদাস নামের এক ব্যক্তি যিনি স্বয়ং একটি নৌকার মালিক। তিনি গণমাধ্যমকে জানান যে, সরকারি নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার নৌকাটি একেবারে নতুন জালসহ সাগরে পাড়ি জমাবে। তিনি বর্তমানে যে বড় আকৃতির জালটি নিজ হাতে বুনছেন, সেটি মূলত গভীর সমুদ্রের বড় সাইজের নানা প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ শিকারের কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
দক্ষিণ সন্দ্বীপের প্রধান ঘাটগুলোতে যখন জেলেরা নিয়ম মেনে সামনের দিনগুলোতে সাগরে ফেরার পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন উত্তর সন্দ্বীপের বটগাছতলা নামক ইলিশের ঘাটে রাতের আঁধারে গোপনে ইলিশ কেনাবেচার মারাত্মক অনিয়ম ঘটছে। এমনকি সন্দ্বীপের মধ্যবর্তী অংশে অবস্থিত রহমতপুর ঘাট থেকেও একই কায়দায় নিষেধাজ্ঞার এই সময়টাতে ইলিশ শিকারের খবর স্থানীয়দের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এ বিষয়ে সন্দ্বীপ মৎস্য অফিসের মাঠ সহকারী মাহমুদুন নবী জানান যে, গত বুধবার রহমতপুর ঘাটের আশপাশ থেকে বেশ কিছু অবৈধ জাল উদ্ধার করে তা ঘটনাস্থলেই পুড়িয়ে ধ্বংস করেছে মৎস্য বিভাগ। এর আগে গত ১৫ অক্টোবর ঠিক একই ঘাট থেকে নিষিদ্ধ ইলিশসহ হাতেনাতে ধরা পড়া দুই জেলেকে উপযুক্ত আর্থিক জরিমানা করা হয়েছিল।
মাহমুদুন নবী আরও জানান যে, গত ১৪ অক্টোবর রাতে উত্তর সন্দ্বীপের বটগাছতলা ইলিশের ঘাটে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে আইন লঙ্ঘনকারীদের আটক করার চেষ্টা চালিয়েছিল তাদের দল। তারা সারারাত ওই ঘাটের কাছাকাছি সতর্ক অবস্থানে থেকে ভোরের আলোর প্রতীক্ষায় ছিলেন। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভোর হওয়ার পরেও ঘাটে কোনো মানুষকে দেখতে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তারা জানতে পেরেছেন যে মাছগুলো অন্য কোনো গোপন স্থানে হাতবদল করা হয়েছে। তারা উত্তর অঞ্চলে মাছ শিকারের প্রবণতা রোধে তাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা এই প্রতিবেদককে বিস্তারিত জানিয়ে বলেন যে, সমুদ্রের জোয়ারের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে সাধারণত রাত দশটা থেকে ভোর পাঁচটার নির্দিষ্ট এই সময়সীমার মধ্যে জেলেরা মাছ বোঝাই নৌকা নিয়ে ঘাটে ফিরে আসেন। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এই অবৈধভাবে ধরা মাছগুলো অনেক কম মূল্যে গোপনে বিক্রি করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভুক্তভোগী জেলে সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, নিষিদ্ধ খুব সূক্ষ্ম ফাঁসের কারেন্ট জালের কারণে অবলীলায় ছোট আকৃতির ইলিশ এবং এমনকি অপরিণত জাটকাও দেদারছে ধরা পড়ছে। এর পাশাপাশি মাঝে মধ্যে এক কেজি ওজনের বড় ইলিশও জালের টানে উঠে আসছে। এগুলোর মধ্যে কিছু মাছের দৈর্ঘ্য মাত্র ছয় থেকে আট ইঞ্চি, যা মূলত জাটকা। স্বাভাবিক সময়ে প্রকাশ্যে উন্মুক্ত ডাকের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতার নিকট ইলিশ বিক্রি করা হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু নির্দিষ্ট অসাধু ব্যবসায়ী গোপনে এই মাছগুলো কিনে নিচ্ছেন।
মা ইলিশ সংরক্ষণের মহৎ উদ্দেশ্যে গত ৮ অক্টোবর থেকে আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ২২ দিনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। এই সময়ে কর্মহীন হয়ে পড়া অসহায় জেলেদের সামাজিক সুরক্ষার অংশ হিসেবে খাদ্যসহায়তা হিসেবে মাথাপিছু পঁচিশ কেজি করে চাল বিতরণের কথা ঘোষণা করেছে মৎস্য বিভাগ। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রথমে জেলেদের সঠিক তালিকা তৈরি করে তাদের নামে বিশেষ মৎস্য কার্ড প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু সাধারণ জেলেদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ হলো, তাদের অর্ধেকের বেশি মানুষ এখনো কোনো ধরনের কার্ড হাতে পাননি। পরবর্তীতে নতুন করে কার্ড প্রদান করা হবে বলে সংশ্নিষ্ট কতৃপক্ষ তাদের শুধু আশ্বস্তই করে চলেছে।
কার্ডবঞ্চিত জেলেদের একজন সন্দ্বীপ উপজেলার সন্তোষপুর ইউনিয়নের অর্জুন জলদাস। তার সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান যে, নিয়মিত মাছ ধরা ছাড়া তার জীবিকা নির্বাহের অন্য কোনো বিকল্প উপায় নেই। নিষেধাজ্ঞার এই দুঃসময়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দিনাতিপাত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ালেও তার নিজের নামে কোনো মৎস্য কার্ড বরাদ্দ হয়নি।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মোতাছিম বিল্লাহ এই প্রসঙ্গে জানান যে, জেলেদের কার্ডের বিদ্যমান তালিকাটি নতুন করে হালনাগাদ করার জন্য ওপর মহলের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা তারা পেয়েছেন। এই হালনাগাদের কাজ শেষ হলেই অন্তর্ভুক্ত সবাই পর্যায়ক্রমে কার্ড পেয়ে যাবেন বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এ ছাড়া কোনো কার্ডবঞ্চিত জেলে সরাসরি তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি নিজ দায়িত্বে দ্রুত কার্ড পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন বলেও আশ্বস্ত করেন।
মৎস্য বিভাগের দাপ্তরিক হিসাব অনুযায়ী, সন্দ্বীপ উপজেলায় সর্বমোট কার্ডধারী জেলের সংখ্যা আট হাজার তিনশত বত্রিশ জন। এর মধ্যে চলতি বছরে মাত্র চার হাজার নিবন্ধিত জেলেকে নিয়ম অনুযায়ী পঁচিশ কেজি করে চাল দেওয়া হবে। তবে অত্যন্ত দুঃখজনক হলো, সরকারি নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার ইতিমধ্যে প১৫ দিন অতিবাহিত হয়ে গেলেও আজ শুক্রবার পর্যন্ত একজন জেলেও কোনো ধরনের খাদ্যসহায়তা হাতে পাননি।
উপজেলার সারিকাইতের সাধারণ জেলে মো. ইউনুস তার কষ্টের কথা প্রকাশ করে বলেন যে, সারাবছর মাছ ধরেই তাদের সংসার কোনোমতে টিকে থাকে। এমতাবস্থায় যখন মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তখন তাদের জীবিকা নির্বাহের পথ কীভাবে উন্মুক্ত থাকতে পারে? পঁচিশ কেজি চাল খুব বিশাল কিছু না হলেও এই চরম অভাবের দিনে তা তাদের পরিবারের জন্য অনেক উপকারে আসত।
খাদ্যসহায়তা এখনো না পাওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে চাইলে সন্দ্বীপ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমজাদ হোসেন গণমাধ্যমকে জানান যে, ইতোমধ্যে নির্ধারিত চাল উপজেলার প্রতিটি এলাকায় নিরাপদে পৌঁছে গেছে। তবে দুর্গোৎসব ও পূজার ছুটির দীর্ঘ প্রক্রিয়া চলার কারণে যথাসময়ে সেই চাল বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। আসছে আগামী রবিবার থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে জেলেদের মাঝে এই চাল বিতরণের কাজ শুরু করা হবে।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর