নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তানের তৎকালীন মন্ত্রিসভা থেকে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পদত্যাগের পরবর্তী ঘটমান বিষয়গুলো দেশটির জাতীয় পরিষদে তীব্র রাজনৈতিক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। রাওয়ালপিন্ডির ক্ষমতার অন্দরে তাঁর জাতীয়তা ও নাগরিকত্ব নিয়ে যখন নানা প্রশ্নের জন্ম হচ্ছিল, তারও বহু আগে দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব এই বিষয়টির ওপর গভীর নজর রেখেছিলেন এবং নিজের ব্যক্তিগত ডায়েরিতে এ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।
প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ১৯৬৭ সালের মার্চ মাসের ডায়েরি পাতায় লিখেছিলেন যে তিনি ভারতের কাছ থেকে বেশ কিছু প্রমাণপত্র ও সরকারি নথি হাতে পেয়েছেন। ওইসব কাগজপত্রে পরিষ্কার হয়ে যায় যে জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত নিজেকে ভারতের একজন নাগরিক হিসেবে জাহির করে আসছিলেন। সেই সঙ্গে তিনি তখন দাবি করেছিলেন যে করাচি শহরে তাঁর উপস্থিতি কেবলই সাময়িক ও অস্থায়ী প্রকৃতির।
পাকিস্তান সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের কাছে এই পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ঠেকেছিল। আইয়ুব খানের সেই নোটটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছিল যে এই সমস্ত ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির নীতিহীনতা ও বিবেকহীন চরিত্রকেই জাতির সামনে উন্মোচন করে দেয়। তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান তখন এই সমস্ত অভিযোগের সত্যতা যাচাই করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে আরও গভীরভাবে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন।
১৯৬৭ সালের জুন মাসের শেষ দিকে এসে বিষয়টি সংসদীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। ওই মাসের ৩০ তারিখে ডায়েরির পাতায় আইয়ুব খান লিখেছিলেন যে জাতীয় পরিষদের ভেতরে একটি অত্যন্ত জটিল ও বিব্রতকর প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগের সময় পর্যন্ত ভুট্টো ভারতের বিভিন্ন আদালতে আইনি লড়াইয়ের সময় নিজেকে করাচিতে বসবাসরত একজন ভারতীয় নাগরিক বলে দাবি করে আসছিলেন।
এই সমস্ত দ্বিমুখী অবস্থানের মূল লক্ষ্য ছিল ভারতে ফেলে আসা নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তির বিপরীতে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ আদায় করা। রাষ্ট্রপতির ডায়েরির ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন সময়ে প্রায় দেড় লাখ রুপির মোহে পড়ে নিজের রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানকে বিসর্জন দিচ্ছিলেন এই রাজনৈতিক নেতা। ভারতীয় সংসদের ভেতরে এই নিয়ে যখন তুমুল আলোচনা শুরু হয় এবং দেশটির সংবাদপত্রগুলোতে খবর প্রকাশিত হয়, তখনই বিষয়টি পাকিস্তানের নজরে আসে।
আইয়ুব খানের এই সমস্ত পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে ভুট্টোর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর রাজনৈতিক তাৎপর্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর নাগরিক অবস্থানকে কেবল একটি সাদামাটা আইনি বিতর্ক হিসেবে দেখতে নারাজ ছিল প্রশাসন। বরং এটিকে পাকিস্তানের প্রতি এই নেতার পূর্ণ আনুগত্য এবং তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার এক বিশাল সংকট হিসেবে জাতির সামনে জোরালোভাবে তুলে ধরা হচ্ছিল।
পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৭ সালের ৩০ জুন দেশটির জাতীয় পরিষদের প্রশ্নোত্তর পর্বে এই নাগরিকত্ব প্রসঙ্গটি বড় ধরনের চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। সরকারের তরফ থেকে সংসদ সদস্য হাবিব-উর-রহমান ভান্ডারি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত নোটিশের মাধ্যমে এই বিষয়টি অধিবেশনের টেবিলে উত্থাপন করেন। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা যখন একের পর এক সম্পূরক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছিলেন, তখন তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করেন।
প্রাথমিক তদন্তে প্রাপ্ত নথিপত্রের বরাত দিয়ে তথ্যমন্ত্রী জানান যে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত ভুট্টো এক অদ্ভুত দ্বিমুখী নীতি বজায় রেখেছিলেন। তিনি পাকিস্তানের অভ্যন্তরে নিজেকে এ দেশের নাগরিক হিসেবে উপস্থাপন করলেও ভারতের ভেতরে গিয়ে নিজেকে ভারতীয় নাগরিক বলে দাবি করতেন। এই দ্বৈত নীতি তখন সংসদের ভেতরে তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে।
বিরোধী শিবিরের বেশ কয়েকজন প্রবীণ সদস্য উচ্চস্বরে আপত্তি জানিয়ে বলেন যে ঠিক এই মুহূর্তে এই ধরনের পুরনো বিষয় তুলে আনার পেছনে শাসকদলের কোনো অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। সংসদ সদস্য ভান্ডারি তখন পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় সচিবের কাছে জানতে চান যে পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে ভারতের একজন মন্ত্রীর বক্তব্য সম্পর্কে সরকার অবগত কি না।
পার্লামেন্ট সচিব আবদুল আওয়াল ভূইয়া এই প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁসূচক উত্তর দেন এবং সংসদীয় টেবিলে একটি লিখিত বিবৃতি পাঠ করেন। ওই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয় যে ১৯৬৫ সালের ১৯ নভেম্বর ভারতের রাজ্যসভায় একটি দৃষ্টি আকর্ষণী প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হয়েছিল। সেই সময় দেশটির তৎকালীন শরণার্থী পুনর্বাসনমন্ত্রী মহাবীর ত্যাগী একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন।
ত্যাগীয়ের সেই বক্তব্যে বলা হয়েছিল যে কাস্টডিয়ানের মাধ্যমে বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তিগুলো ফিরিয়ে পাওয়ার জন্য আইনি আবেদন দাখিল করেছিলেন ভুট্টো। সেই শুনানির সময় তিনি জোর দিয়ে দাবি করেছিলেন যে তিনি একজন জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিক এবং জীবনের শুরু থেকেই এই পরিচয় বহন করে আসছেন।
উক্ত লিখিত বিবৃতির সূত্র ধরে আরও জানানো হয় যে ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পরেই কেবল ভুট্টো পাকিস্তানে স্থায়ীভাবে বসবাস করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। এর পরেই তিনি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন দাখিল করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল কাস্টডিয়ানের আগের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা আপিল মামলাটি প্রত্যাহার করে নেওয়া।
সম্পত্তি পুনরুদ্ধারসংক্রান্ত এই দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং এর পেছনের বিতর্ক শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়। এই পুরো ঘটনার পেছনে ছিল দেশভাগের অব্যবহিত পরের কিছু পারিবারিক ও সম্পত্তিগত জটিলতা, যা পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়।
বিশিষ্ট লেখক সালমান তাসির তাঁর ‘ভুট্টো: আ পলিটিক্যাল বায়োগ্রাফি’ নামক গ্রন্থে এই ঘটনার এক বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৬৫ সালে ভারতের শরণার্থী পুনর্বাসনমন্ত্রী যখন ভুট্টোর নাগরিকত্ব নিয়ে গুরুতর সব অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন, তখন পাকিস্তানের তৎকালীন সরকার সেই সমস্ত অভিযোগ সর্বান্তঃকরণে ও জোরালোভাবে অস্বীকার করেছিল।
এই সমস্ত আইনি ঝামেলার মূল সূত্রপাত হয়েছিল বোম্বে শহরে অবস্থিত শাহনওয়াজ ভুট্টোর মালিকানাধীন একটি সম্পত্তি বিক্রির ঘটনাকে কেন্দ্র করে। আইনের চোখে এই বিশাল বাড়িটির প্রকৃত মালিক ছিলেন তাঁরই সন্তান জুলফিকার আলী ভুট্টো। তবে সেই সময় তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক থাকায় ওই সম্পত্তি বিক্রির মাধ্যমে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ আদালতের তত্ত্বাবধানে একটি ফান্ডে জমা রাখা হয়েছিল।
ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করার পরপরই তরুণ ভুট্টো উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। এরপর ১৯৪৯ সালের ৬ জুলাই ভারতীয় আদালতের একটি বিশেষ আদেশের মাধ্যমে তাঁকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি আইনের আওতায় একজন পরিত্যক্ত সম্পত্তির মালিক হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
এই ঘোষণার অর্থ দাঁড়ায় যে তিনি চাইলে পাকিস্তানি আদালতের শরণাপন্ন হয়ে নিজের সেই আটকে থাকা অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য আইনানুগ আবেদন করতে পারতেন। তাসিরের গবেষণায় উঠে এসেছে যে সে সময়কার সাধারণ মানুষের মতো ভুট্টোও দেশত্যাগের সময় একটি ব্রিটিশ ভারতীয় পাসপোর্ট সঙ্গে নিয়েছিলেন। তাই তাঁর নিজস্ব আইনি যুক্তি ছিল যে ভারতীয় আদালতের তাঁকে পরিত্যক্ত সম্পত্তির মালিক হিসেবে চিহ্নিত করার কোনো সাংবিধানিক বা আইনি এখতিয়ার ছিল না।
তবে নিজের সেই অর্থ পুনরুদ্ধার করার জন্য তিনি যে সমস্ত অপরিণামদর্শী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, তার ফল হয়েছিল অত্যন্ত মারাত্মক। তাঁর কিছু অসতর্ক বক্তব্য পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের জন্য তীব্র অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
লেখক সালমান তাসির বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ভুট্টো একপর্যায়ে যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে আবেদনকারীর বাবা-মা করাচি শহরে বসবাস করতেন এবং আবেদনকারীর নিজের বিয়েও সেখানে সম্পন্ন হয়েছিল—কেবলমাত্র এই দুটি সাধারণ কারণের ওপর ভিত্তি করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে সংশ্লিষ্ট সময়ে তাঁর নিজস্ব কোনো স্থায়ী আবাসন করাচিতে ছিল।
ঠিক একই সময়ে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ আদালতের আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েও নিজের আটকে থাকা অর্থ ফিরিয়ে আনার সমান প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন ভুট্টো। সেই দেশের আদালতে অবশ্য তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে একজন পাকিস্তানি নাগরিক হিসেবেই উপস্থাপন করছিলেন এবং সেই অনুযায়ী আইনি নথিপত্র প্রস্তুত করেছিলেন।
তবে সালমান তাসির জুলফিকার আলী ভুট্টোর এই সমগ্র আচরণকে কোনো সুপরিকল্পিত বা অপরাধমূলক অসততা হিসেবে দেখতে রাজি নন। তাঁর সুচিন্তিত মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভুট্টোর এই কর্মকাণ্ডের ভেতরে রহস্যজনক বা অসদুপায় অবলম্বনের কিছুমাত্র ছিল না।
যে সময়ে তিনি ওই অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য আইনি আবেদন করেছিলেন, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র বিশ বছর। তৎকালীন সময়ে ভারতবর্ষের দেশভাগের পর সীমান্তের এপার ও ওপারে ফেলে আসা সম্পত্তি পুনরুদ্ধার নিয়ে সাধারণ পাকিস্তানি ও ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে এ ধরনের আইনি জটিলতা ও লড়াই অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি দৃশ্য ছিল।
অবশ্য এই বিশাল সম্পত্তির মামলায় তাঁকে নিজের অবস্থানের পক্ষে জোরালো সাফাই গাইতে হয়েছিল। নিজের আত্মপক্ষ সমর্থনের সপক্ষে তিনি আদালতকে জানিয়েছিলেন যে তিনি এবং তাঁর পরিবার দীর্ঘ একটি সময় ধরে সিন্ধু প্রদেশের মাটিতেই বসবাস করে আসছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর সময় তাঁর কাছে ভারতীয় পাসপোর্ট থাকলেও ১৯৪৯ সালের জুলাই মাসেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানি পাসপোর্টের অধিকারী হয়েছিলেন। এই আইনি ব্যাখ্যাটি শেষ পর্যন্ত ভুট্টোর নিজস্ব অবস্থানের সপক্ষে একটি শক্তিশালী আইনি যুক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
তাঁর অনুসারী ও আইনজীবীদের মূল দাবি ছিল যে সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার এই দীর্ঘ আইনি লড়াইকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে বরং দেশভাগ-পরবর্তী সম্পত্তি বণ্টন ও নাগরিকত্বের জটিল ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের আলোকেই বিচার করা উচিত।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর