নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
শারদীয় দুর্গোৎসব ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাশ মিলে চলমান দীর্ঘ ছুটির সুবাদে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের শহরে দর্শনার্থীদের ঢল নেমেছে। গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে উখিয়া উপজেলার পাটুয়ারটেক এলাকার একটি কাঠের আবাসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০ জন ভ্রমণপিপাসুর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। এই দুর্ঘটনার পর মেরিন ড্রাইভ সড়কের তীরবর্তী কাঠ ও বাঁশনির্মিত ইকো কটেজগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে পর্যটকদের মনে ভীতি ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে ওই অঞ্চলের অবকাশ যাপন কেন্দ্রগুলোতে বুকিং বাতিল হওয়ার পাশাপাশি ফাঁকা পড়ে রয়েছে অধিকাংশ কামরা।
বিপরীতে, সৈকত শহরের মূল এলাকার বহুতল আবাসন ও অতিথি নিবাসগুলোতে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা আশা প্রকাশ করেছেন যে, ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলমান টানা দশ দিনের এই অবকাশ যাপনে অন্তত দশ লক্ষ মানুষ উপকূলীয় এই জেলায় পদার্পণ করবেন। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যটন শিল্প ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বাণিজ্যিক খাতে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার লেনদেন হতে পারে বলে তারা ধারণা করছেন।
গত ১৭ অক্টোবর প্রত্যুষে টুপটুপ নামের ওই প্রমোদ আবাসে আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের পর সেখান থেকে দশটি দগ্ধ দেহ উদ্ধার করেছিল দমকল বাহিনী ও সুরক্ষা কর্মীরা। এই মারাত্মক অবহেলার দায়ে ওই দিন গভীর রাতে স্থানীয় থানার এক উপপরিদর্শক বাদী হয়ে বাইশ জনের বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন। উক্ত মামলায় চারজনকে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযুক্ত করার পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও কয়েজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তদন্তের ধারাবাহিকতায় মামলার চার নম্বর আসামি জাহিদ হোসেনকে আটক করার পর গত রবিবার দিবসের দ্বিতীয় ভাগে তাকে বিচারিক হাকিমের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাকে পুলিশি হেফাজতে নিয়ে বিস্তারিত জ্যান্ত করার জন্য সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন জানানো হলেও সোমবার পর্যন্ত সেটির ওপর কোনো শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি।
মেরিন ড্রাইভের ইনানী সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন সালমান ইকো কটেজের নয়টি কামরার মধ্যে গত সপ্তাহের শেষ দিক থেকেও কটি খরিদ্দারে পূর্ণ ছিল। তবে পরবর্তী দিন থেকে সেখানে কোনো অতিথি অবস্থান করছেন না বলে জানা গেছে। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই প্রতিষ্ঠানের এক কর্মী জানান, দুর্ঘটনার পর ভ্রমণবিলাসীরা এখানে রাত্রিযাপন নিরাপদ মনে করছেন না এবং সামনের দিনগুলোর পূর্বনির্ধারিত বুকিংও বাতিল করে দিচ্ছেন।
একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে পার্শ্ববর্তী পালকি কটেজ, বিচ ভিউ এবং ফাইন ডাইন নামের অবকাশ কেন্দ্রগুলোতেও। তিনটি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত ধারণক্ষমতা ষাট জনের হলেও সপ্তাহের শুরুর কর্মদিবসে মাত্র সাতজন অতিথি উপস্থিত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপকদের মতে, মর্মান্তিক সেই অগ্নিকাণ্ডের জেরে মেরিন ড্রাইভের অর্ধশতাধিক পরিবেশবান্ধব ইকো কটেজের ব্যবসা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে এবং এই স্থবিরতা কাটতে কত সময় লাগবে তা অনিশ্চিত।
অবশ্য প্যাঁচারদ্বীপের মারমেইড বিচ রিসোর্টের ব্যবস্থাপক মো. রিসাদ দাবি করেছেন যে তাদের ৩৩টি কটেজে নব্বই জন থাকার সুযোগ থাকলেও সামগ্রিক পরিস্থিতিতে তাদের ওপর বিশেষ কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।
কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান সংবাদমাধ্যমকে জানান, ওই দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পর আশপাশের আংশিক অঞ্চলের প্রায় আশির শতাংশ কামরা খালি রয়েছে। বিপরীতে শহুরে আবাসনগুলোতে পর্যটকদের চাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সপ্তাহের প্রথম দিনেই সেখানে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ অবস্থান করছিলেন।
গত ১৫ অক্টোবর থেকে সৈকত দর্শনে মানুষের আগমন শুরু হওয়ার পর প্রথম তিন দিনের দীর্ঘ ছুটিতে অন্তত তিন লক্ষ পর্যটক সমুদ্র তীর পরিদর্শন করেছেন। রবিবার থেকে শুরু হওয়া পাঁচ দিনের শারদীয় ছুটি, সাপ্তাহিক ছুটি এবং লক্ষ্মীপূজার অবকাশ মিলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় এই সংখ্যা আরও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
হোটেল ও অতিথি নিবাস সমিতির প্রধান আবুল কাশেম সিকদার জানান, ২১ অক্টোবর বিকেলে লাবণী পয়েন্টে প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এর আগে ও পরে লাখ লাখ মানুষের সমাগম ঘটবে। শহরের পাঁচ শতাধিক আবাসন প্রতিষ্ঠানে প্রায় পৌনে দুই লক্ষ মানুষের রাত্রিবাসের সক্ষমতা রয়েছে এবং এবার ভাড়ায় কোনো বিশেষ ছাড় না দেওয়া হলেও অতিরিক্ত আদায় রোধে প্রশাসন তৎপর রয়েছে।
সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে যে সুদীর্ঘ ساحل জুড়ে হাজারো মানুষ জলকেলি, বালুচরে বিশ্রাম এবং নানা বাহনে চড়ে আনন্দ উপভোগ করছেন। ঢাকা থেকে আগত ব্যবসায়ী মাহবুবুল হক ও সোহরাব মিয়া জানান, নিরাপত্তা আশঙ্কার কারণে তারা মেরিন ড্রাইভে না থেকে শহরের প্রচলিত আবাসন বেছে নিয়েছেন।
তারকা মানের আবাসন কক্স টুডের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আবু তালেব জানান যে তাদের পঁচাশি শতাংশ কামরা সংরক্ষিত হয়েছে এবং ছুটির শেষ অব্দি এই চাপ অব্যাহত থাকবে। বণিক সমিতির প্রধান আবদুল শুক্কুর ও জেলা প্রশাসনের শীর্ষকর্তারা জানিয়েছেন যে বিপুলসংখ্যক মানুষের নিরাপত্তা ও সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
অন্যদিকে, পুরো জেলাজুড়ে এবার ৩২৪টি মণ্ডপে দুর্গোৎসব উদযাপিত হচ্ছে, যার মধ্যে ১৫৫টি প্রতিমা এবং ১৬৯টি ঘট পূজা অন্তর্ভুক্ত। চকরিয়া উপজেলায় সর্বোচ্চ একাত্তরটি মণ্ডপসহ বিভিন্ন উপজেলা ও পৌরসভায় চারশ প্রতিমা বিসর্জনের যাবতীয় প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর