নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
আসন্ন আগামীকালের ৩১ অক্টোবর শনিবার প্রকাশ পেতে যাচ্ছে চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট এবং সমমানের পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল। এর ঠিক আগমুহূর্তে গত প্রায় ছত্রিশ বছরের দীর্ঘ ফলাফল পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এই অর্জিত পাসের হারে অতীতে ব্যাপক ও লক্ষণীয় মাত্রার উচ্চাবচাচ বা তারতম্য পরিলক্ষিত হয়েছে। অতীতের বিভিন্ন রেকর্ড ঘেঁটে দেখা যায়, কোনো নির্দিষ্ট বছরে উত্তীর্দের হার পঁচিশ শতাংশের কোঠার নিচে নেমে গিয়েছিল, আবার কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে সেই হার পঁচাত্তর শতাংশের সীমাও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এর মধ্যে ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে বৈশ্বিক করোনা মহামারির সংকটকালে ২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় কোনো ধরনের লিখিত মূল্যায়ন ছাড়াই সব অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীকে পাস করিয়ে দেওয়ায় সাফল্যের হার শতভাগে গিয়ে ঠেকেছিল।
ফলাফলের এই ধারাবাহিক তারতম্য কেবল শিক্ষার্থীদের অর্জিত নম্বরের পরিবর্তনকেই নির্দেশ করে না, বরং এর পেছনে বহুবিধ প্রভাবক বিষয় নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন জাগায়। প্রশ্নপত্র প্রণয়নের ধরন, উত্তরপত্র মূল্যায়নের পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক প্রস্তুতি, নির্দিষ্ট সময়ে পাঠ্যসূচি সম্পন্ন করার ক্ষমতা এবং সামগ্রিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়া—এই সমস্ত উপাদানই চূড়ান্ত ফলাফলে প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলতে সক্ষম। তবে শুধুমাত্র বছরওয়ারি পাসের হারের সংখ্যাগত পরিসংখ্যান দেখে সুনির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব নয় যে কোন বিশেষ বিষয়টি ঠিক কী পরিমাণ প্রভাব বিস্তার করেছে।
পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী গত ২৯ অক্টোবর ফলাফল প্রকাশের কথা থাকলেও পরবর্তীতে সেই তারিখ পরিবর্তন করে ৩১ অক্টোবর চূড়ান্ত করা হয়। গত ২ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই পরীক্ষায় নিয়মিত ও অনিয়মিত পরীক্ষার্থী মিলিয়ে সর্বমোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নেওয়ার কথা ছিল। যদিও নির্ধারিত দিনে অনুষ্ঠিত কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন বলে তথ্য রয়েছে।
১৯৯০ সাল থেকে শুরু করে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়সীমার এইচএসসি পরীক্ষার তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দীর্ঘ মেয়াদের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার রেকর্ড হয়েছিল ১৯৯৬ সালে, যা ছিল মাত্র ২৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এর বিপরীত চিত্রে করোনাকালের ২০২০ সালে শতভাগ পাসের দেখা মিলেছিল, যদিও সেইবারের ফলাফলকে সরাসরি অন্য নিয়মিত পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করা সঙ্গত নয়। কেননা পরীক্ষা গ্রহণ ছাড়াই বিশেষ মূল্যায়নের মাধ্যমে সেদিন সবাইকে সফল ঘোষণা করা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধস নামে বিগত বছরগুলোতে। ২০২৪ সালে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষার গড় উত্তীর্নের হার ছিল ৭৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ, যা পরের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে নাটকীয়ভাবে কমে মাত্র ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশে এসে ঠেকে। মাত্র এক বছরের সংক্ষিপ্ত ব্যবধানে পাসের হার প্রায় আঠারো শতাংশীয় পয়েন্ট হ্রাস পায়, যা ২০০৫ সালের পর থেকে সর্বনিম্ন রেকর্ডের তকমা পায়।
আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি এবং একই সঙ্গে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমকে জানান যে, নানা ধরনের বাস্তব কারণে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পাসের হারে এই উত্থান-পতন ঘটেছে। বিশেষ করে গত দুই বছর ধরে মূল্যায়ন নীতিমালায় কিছু পরিবর্তন আনার কারণেও ফলাফলের ওপর এর প্রভাব পড়েছে। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন যে, যদি প্রকৃত মেধা যাচাইয়ের মাধ্যমে মূল্যায়ন করার এই ধারা ভবিষ্যতে অব্যাহত রাখা যায়, তবে ধীরে ধীরে পাসের হার আবারও ঊর্ধ্বমুখী হবে।
এর আগে ২০০৫ সালে পাসের হার ছিল ৫৯ দশমিক ১৬ শতাংশ, যেখান থেকে পরবর্তীতে কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবেই হার বাড়তে থাকে। যদিও এই বৃদ্ধির গতিপ্রকৃতি প্রতি বছর সমান ছিল না এবং মাঝে মাঝে তা সামান্য হ্রাসও পেয়েছিল। পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় ধরে পাসের এই সূচকটি মূলত ষাট থেকে সত্তর শতাংশের ঘরের মধ্যেই ওঠানামা করতে দেখা গেছে।
গত বছরের ফলাফলে কেন এমন বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এল, তার সঠিক কারণ বুঝতে কেবল আগের বছরের হারের সঙ্গে তুলনা করা যথেষ্ট নয়। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা মনে করেন, উত্তরপত্র সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা না করা, বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষার ফল, শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রস্তুতি এবং প্রশ্নের কাঠিন্যপূর্ণ ধরনও এর পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছিল। গত বছরের ফলাফল প্রকাশের পর গভীর পর্যালোচনায় দেখা গিয়েছিল যে, ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছিলেন, যা পুরো দেশের সার্বিক ফলাফলের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।
ঠিক এই রকম একটি অনিশ্চিত পটভূমির পর চলতি বছরের প্রকাশিত ফলাফলে পাসের হার বৃদ্ধি পাবে, নাকি গত বছরের এই নিম্নমুখী ধারাটিই অপরিবর্তিত থাকবে, তার সঠিক উত্তর পাওয়ার জন্য আমাদের সবাইকে আগামীকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
সুদূর অতীত থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৯০ সালে এইচএসসি পরীক্ষার পাসের হার ছিল ২৯ দশমিক ৭০ শতাংশ। এর পরের দুই বছর অর্থাৎ ১৯৯১ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় একান্ন শতাংশ এবং ১৯৯২ সালে পঁয়ষট্টি শতাংশের ঘর ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু এর পরপরই সাফল্যের সেই সূচক আবার নিম্নমুখী হতে শুরু করে, যার ফলে ১৯৯৩ সালে পাসের হার কমে ছিয়াচল্লিশ শতাংশের কিছু নিচে নামে, ১৯৯৪ সালে চল্লিশ শতাংশের বেশি এবং ১৯৯৫ সালে আবার ছিয়াচল্লিশ শতাংশের কোঠায় অবস্থান করে।
১৯৯৬ সালে এসে পাসের হারে এক অভাবনীয় ও বড় ধরনের পতন পরিলক্ষিত হয়। ওই বছর সাফল্যের হার একেবারে কমে ২৪ দশমিক ৭৭ শতাংশে নেমে আসে। যদিও পরবর্তীতে কয়েকটি বছর পাসের হার সামান্য বাড়লেও তার মধ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা বজায় ছিল না। যেমন ১৯৯৭ সালে হার ছিল উনচল্লিশ শতাংশের বেশি, ২০০১ সালে তা নেমে হয় আঠারো শতাংশের বেশি এবং ২০০২ সালে তা প্রায় সাতাশ শতাংশের কাছাকাছি এসে ঠেকে। এরপর ২০০৩ সালে তা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে আটত্রিশ শতাংশের বেশি এবং ২০০৪ সালে প্রায় আটচল্লিশ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল।
পরবর্তী ২০০৫ সালে পাসের হার বেশ খানিকটা বেড়ে উনষাট শতাংশের গণ্ডি পেরিয়ে যায় এবং পরের কয়েকটি বছর এই ধারা অক্ষুণ্ণ থাকে। ২০০৬ সালে পাসের হার ছিল প্রায় চৌষট্টি শতাংশ, ২০০৭ সালে চৌষট্টি শতাংশের বেশি এবং ২০০৮ সালে তা প্রায় পঁচাত্তর শতাংশে গিয়ে পৌঁছায়। কিন্তু ২০০৯ সালে তা আবার কমে সত্তর শতাংশের কিছু কোঠায় নেমে আসে। এর পর ২০১০ ও ২০১১ সালে এই হার প্রায় বাহাত্তর শতাংশের কাছাকাছি ছিল এবং ২০১২ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ছিয়াত্তর শতাংশের সীমা ছাড়িয়ে যায়।
২০১২ সালের পরেও বেশ কয়েকটি বছর জুড়ে এইচএসসি পরীক্ষার পাসের হার মোটামুটি সত্তর শতাংশের আশেপাশেই ঘোরাফেরা করেছে। ২০১৩ সালে পাসের হার ছিল ৭১ শতাংশের বেশি এবং ২০১৪ সালে তা প্রায় ছিয়াত্তর শতাংশে দাঁড়ায়। তবে ২০১৫ সালে এসে তা হঠাৎ করেই কমে প্রায় ছেষট্টি শতাংশে নেমে আসে। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালে পাসের হার পুনরায় বৃদ্ধি পেয়ে বাহাত্তর শতাংশের বেশি হলেও ২০১৭ সালে তা আবার কমে প্রায় সাতষট্টি শতাংশে নামে, ২০১৮ সালে প্রায় পঁয়ষট্টি শতাংশ এবং ২০১৯ সালে বাহাত্তর শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করে।
দীর্ঘ এই কালপরিক্রমার ফলাফল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে এটা স্পষ্ট হয় যে, পাসের হার কখনো একমুখী বা একই দিকে অগ্রসর হয়নি। বরং এক বছর যদি তা বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে ঠিক তার পরের বছরই তা আবার হ্রাস পেয়েছে অথবা কখনো কখনো ঘুরে দাঁড়িয়ে আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। এই দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণ করলে প্রমাণিত হয় যে, একটিমাত্র নির্দিষ্ট বছরের পাসের হারকে গোটা শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত মান বিচার করার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে ধরে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সুনির্দিষ্ট এই পাসের হারের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অর্জিত শেখার মান, তাদের বিষয়ভিত্তিক গভীর দক্ষতা এবং সার্বিক পরীক্ষা মূল্যায়নপদ্ধতিও গভীরভাবে বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি।
করোনা মহামারির সেই বিশেষ সময়ে পাসের হার শতভাগে পৌঁছালেও পরবর্তী বছরগুলোতে তা ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। ২০২০ সালে পরীক্ষা বাতিল করে সবাইকে পাস দেওয়ায় হার ১০০ শতাংশ হলেও, ২০২১ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৯৫ দশমিক ৫৭ শতাংশে। এরপর ২০২২ সালে সেটি আরও হ্রাস পেয়ে ৮৪ দশমিক ৩১ শতাংশে নেমে আসে এবং পরবর্তী বছরগুলোতেও এই পতনের ধারা অব্যাহত থাকে। ফলস্বরূপ ২০২৩ সালে পাসের হার নেমে আসে প্রায় ছিয়াত্তর শতাংশে এবং ২০২৪ সালে তা সত্তর শতাংশের ঘরেই সীমাবদ্ধ থাকে। আর সর্বশেষ ২০২৫ সালে এসে এই হার সরাসরি ৫৭ শতাংশের ঘরে নেমে আসে।
সার্বিক বিচারে ১৯৯০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এই ৩৬ বছরে এইচএসসি পরীক্ষার পাসের হার কখনো উর্ধ্বমুখী আবার কখনো নিম্নমুখী রূপ নিয়েছে। তবে গত বছর পাসের হার নাটকীয়ভাবে কমে ৫৭ শতাংশের ঘরে এসে ঠেকায় এবারের ফলাফল নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে তীব্র কৌতূহল ও আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। এবারের পরীক্ষায় পাসের হার শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে, তা জানার জন্য আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে হবে।
আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান গণমাধ্যমকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, নানা অনিবার্য কারণেই এইচএসসি পরীক্ষার পাসের হারে অতীতে এমন ওঠা–নামা হয়েছে। বিশেষ করে গত দুই বছর যাবত মূল্যায়ন নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার ফলে ফলাফলের ওপর এর স্পষ্ট প্রভাব পড়েছে। তবে তিনি দৃঢ় আশা প্রকাশ করে বলেছেন যে, যদি সঠিকভাবে প্রকৃত মেধার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করার এই ইতিবাচক ধারা ভবিষ্যতেও অবিচ্ছিন্ন থাকে, তবে পর্যায়ক্রমে পাসের হার নিশ্চিতভাবেই আবারও বৃদ্ধি পাবে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর