ঢাকা | বঙ্গাব্দ

প্রমাণ ছাড়াই হত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ আসাদুজ্জামান নূরের বিরুদ্ধে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 31, 2026 ইং
প্রমাণ ছাড়াই হত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ আসাদুজ্জামান নূরের বিরুদ্ধে ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

চলতি সপ্তাহের শুরুতে সংবাদমাধ্যমের সূত্রে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য জানতে পারেন সুপ্রভা তাসনিম। তিনি দেখতে পান, তাঁর বাবা প্রবীণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং সাবেক সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূরের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। অথচ এই নির্দিষ্ট মামলার ব্যাপারে তাঁর বিন্দুমাত্র কোনো ধারণাই ছিল না। দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় ধরে কারাবন্দী রয়েছেন এই বিখ্যাত অভিনেতা। বিগত ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের জেরে একের পর এক মামলায় তাঁকে হয় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, নতুবা নতুন মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এ ধরনের অসংখ্য মামলার প্রতিটির পেছনেই মূলত একজন মানুষের প্রাণহানির বেদনাদায়ক সত্য লুকিয়ে আছে। তবে আইনি প্রক্রিয়ায় প্রতিটি ঘটনায় সরাসরি অপরাধী শনাক্ত করার বদলে দলভিত্তিক আসামি করার প্রবণতা লক্ষণীয়। এসব মামলায় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা থেকে শুরু করে কখনো কখনো শত শত নেতা-কর্মীকে একসঙ্গে আসামি করা হয়েছে। অথচ অপরাধের সঙ্গে তাঁদের ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতা প্রমাণের মতো কোনো শক্ত ভিত্তি থাকে না; কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করেই তাঁদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। বাড্ডার ওই নির্দিষ্ট মামলাটির বিষয়ে সুপ্রভা কিংবা তাঁর পরিবার সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিল।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাড্ডা থানার ওই মামলার প্রাথমিক এজহারে তো বটেই, এমনকি চূড়ান্ত অভিযোগপত্রেও আসাদুজ্জামান নূরের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অথচ এই মামলায় তাঁকে কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের বিশ তারিখে বাড্ডা এলাকায় প্রাইভেটকার চালক ইমদাদুল হক নিহত হওয়ার ঘটনায় তিনি প্ররোচনা জুগিয়েছিলেন। অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে আদালতের কাছে অভিযোগপত্র হস্তান্তর করা হয়েছে এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রাপ্তদের আসামি করা হয়েছে। অন্যদিকে যাদের বিরুদ্ধে কোনো দোষ প্রমাণিত হয়নি, তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত আদালত গ্রহণ করবেন।

তবে সাতাইশ পৃষ্ঠার ওই অভিযোগপত্রটি নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করলে এমন কোনো যৌক্তিক বা আইনগত প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায় না, যার ওপর ভিত্তি করে আসাদুজ্জামান নূরকে এই মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। এই সমগ্র প্রক্রিয়ায় রাজনীতি যে বিচারিক সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করেছে, সে বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকে না। দৃশ্যমান হয়েছে যে, আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্যরা এজাহারে অন্তর্ভুক্ত থাকায় পুলিশ কোনো রকম বাছবিচার ছাড়াই তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে চলেছে। এখানে অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বাস্তব প্রমাণ বা সাক্ষ্যকে গুরুত্ব না দিয়ে কেবল দলীয় অবস্থানের বিষয়টিকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

অভিযোগপত্রে নূরের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হিসেবে বলা হয়েছে যে ঘটনার দিন তাঁর অনুসারীরা কোটা সংস্কার আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের মিছিলে হামলা চালিয়ে এই অপরাধ সংঘটিত করেছে। অথচ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে যে ঊনত্রিশ জন আওয়ামী লীগ কর্মীর তালিকা দেওয়া হয়েছে, তাঁদের কারোর সঙ্গেই নূরের সুনির্দিষ্ট কোনো সংযোগের কথা উল্লেখ করা হয়নি। আসাদুজ্জামান নূর কখনোই ঢাকার কোনো আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন না; বরং তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন উত্তরাঞ্চলের জেলা নীলফামারী থেকে। রাজধানী ঢাকা থেকে সড়কপথে সেই জেলায় পৌঁছাতে প্রায় সাত ঘণ্টার মতো দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়।

অভিযোগপত্রে নূরের ‘অনুসারী’ হিসেবে যাদের ইঙ্গিত করা হয়েছে, স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী তাঁদের ভৌগোলিক অবস্থান নীলফামারীতেই হওয়ার কথা। এর বিপরীতে, বাড্ডার সেই মামলার চার্জশিটে অভিযুক্ত করা ঊনত্রিশ জন কর্মীর প্রায় সবাই প্রত্যক্ষভাবে বাড্ডা কিংবা রাজধানীর আশেপাশের বিভিন্ন ওয়ার্ডের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। উল্লেখ্য যে, অভিনেতা নূরের নিজ নির্বাচনী এলাকা নীলফামারীতে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালীন কোনো মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। এছাড়া, রাজধানী ঢাকায় সংঘটিত কোনো হত্যাকাণ্ডে নূর কীভাবে প্ররোচনা বা উসকানি দিলেন, তার পক্ষেও চার্জশিটে ন্যূনতম কোনো আইনি ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়নি।

তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া হয় যে ঘটনাস্থলে তাঁর কোনো অনুসারী উপস্থিত ছিলেন, তবুও নূরের বিরুদ্ধে প্ররোচনার অভিযোগ আইনগতভাবে টিকিয়ে রাখতে হলে পুলিশকে শক্ত প্রমাণ দেখাতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এমন তথ্য উপস্থাপন করতে হতো যা দিয়ে প্রমাণিত হয় যে তিনি অপরাধটি সংঘটনে সরাসরি উসকানি দিয়েছেন, অন্য কোনো উপায়ে সহযোগিতা করেছেন কিংবা কোনো ষড়যন্ত্রের অংশীদার ছিলেন। অথচ তদন্ত কর্মকর্তার পেশ করা অভিযোগপত্রে এ ধরনের ন্যূনতম কোনো প্রমাণের বিন্দুমাত্র ইঙ্গিত পর্যন্ত রাখা হয়নি। সেখানে কেবল ছয়টি আলাদা ভিডিও ক্লিপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার একটিও নূরের তৈরি নয়।

উল্লিখিত ভিডিওগুলোর মধ্যে রয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন, দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং তথ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বক্তব্য। এ ছাড়াও জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের বক্তৃতার ভিডিও সেখানে স্থান পেয়েছে। এসব ভিডিওর কোনোটিতেই আসাদুজ্জামান নূরের কোনো বক্তব্য বা উপস্থিতি নেই, এমনকি তাঁর নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করা হয়নি। একইভাবে চার্জশিটে যেসব সংবাদপত্রের কাটিং বা প্রতিবেদনের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর সঙ্গেও নূরের বিন্দুমাত্র কোনো সংযোগ খুঁজে পাওয়া যায়নি।

তদন্তকারী কর্মকর্তা বা প্রমাণের কোথাও নূরকে ঘটনার স্থান, সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিরা কিংবা গুলিবর্ষণের মতো ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে তদন্ত কর্মকর্তা নিজেই উল্লেখ করেছেন যে মূল এজহারে নাম থাকা সাতষট্টি জনের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় তাঁদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং স্থানীয় দুজন কাউন্সিলরকে যেখানে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, সেখানে কোনো প্রমাণ ছাড়াই কেন নূরকে এই দলে রাখা হলো না? নীলফামারীর একজন জনপ্রতিনিধিকে কোনো প্রমাণ ছাড়াই চার্জশিটভুক্ত করা হলেও স্থানীয় নেতাদের অব্যাহতি দেওয়া এক গভীর রহস্যের জন্ম দিয়েছে।

আসাদুজ্জামান নূরের মামলার এই চিত্রটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং প্ররোচনার অভিযোগে অভিযুক্ত অন্য ১৫ জনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। আরেকটি বড় ত্রুটি হলো, ঘটনার দিন বাড্ডার কোনো সিসিটিভি ফুটেজ বা ভিডিওর উপস্থিতি চার্জশিটে নেই, যা দিয়ে অভিযুক্তদের উপস্থিতি যাচাই করা যেত। এর পাশাপাশি নিহত ব্যক্তির ময়নাতদন্ত করা হয়নি, কোনো ফরেনসিক বা ব্যালিস্টিক প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়নি এবং কোনো অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়নি। এমনকি যে হাসপাতালে তাঁকে প্রথমে নেওয়া হয়েছিল, সেখানকার কোনো চিকিৎসা সংক্রান্ত নথিপত্রও চার্জশিটে যুক্ত করা হয়নি। বিচারব্যবস্থার এই স্বেচ্ছাচারী প্রক্রিয়া জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার পাওয়ার পথকে সংকুচিত করছে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ফিনল্যান্ডে চার লাখ গাছ কেটে গুগলের ডেটা সেন্টার নির্মাণে ক্

ফিনল্যান্ডে চার লাখ গাছ কেটে গুগলের ডেটা সেন্টার নির্মাণে ক্