নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
রাজধানীর মিরপুর এলাকায় তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের চলমান বিক্ষোভের মাঝে পুলিশের একটি গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এই নাশকতার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোট ২৬ জনকে আটক করেছে। আটককৃতদের মধ্য থেকে সুনির্দিষ্ট ১১ জনকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ সম্পন্ন করেছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পুলিশ জানিয়েছে যে, ধৃত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত তিনজন নাশকতার সুনির্দিষ্ট কিছু স্থিরচিত্র এবং ভিডিও চিত্র নির্দিষ্ট একটি মুঠোফোন নম্বরে প্রেরণ করেছিলেন। ওই ছবি ও ভিডিওগুলো পাঠানোর পরপরই ওই তিন ব্যক্তির মুঠোফোনে তিন হাজার থেকে শুরু করে সাড়ে তিন হাজার টাকা করে আর্থিক লেনদেন হওয়ার সত্যতা মিলেছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, যে নির্দিষ্ট ব্যক্তির মুঠোফোন নম্বরে এই নাশকতার ছবি ও ভিডিওগুলো পাঠানো হয়েছিল এবং যার মাধ্যমে টাকা প্রেরণের ঘটনা ঘটেছে, তিনি হলেন জুলাই মাসের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া সাবেক আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার ভাগনে আলিফ মোল্লা। উল্লেখ্য, এই ইলিয়াস মোল্লা পূর্বে ঢাকা-১৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং বর্তমানে তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে আত্মগোপন অবস্থায় রয়েছেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের মিরপুর জোনের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ শ্রমিকেরা বর্তমানের সাড়ে ১২ হাজার টাকার পরিবর্তে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকায় উন্নীত করার যৌক্তিক দাবি তুলেছেন। এই দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ঢাকা, সাভার ও গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গত দুই দিন ধরে তীব্র শ্রমিক অসন্তোষ ও বিক্ষোভ চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস সোমবার সকালেও মিরপুরের বিভিন্ন অলিগলি থেকে খণ্ড খণ্ড দল হয়ে শ্রমিকেরা সড়কে নেমে আসার চেষ্টা চালান। শ্রমিকদের এই অননুমোদিত জমায়েত ও বিক্ষোভের চেষ্টা প্রতিহত করতে পুলিশ ধাওয়া দেয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বেশ কয়েকটি কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে।
সকাল থেকেই মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর ও তৎসংলগ্ন এলাকাজুড়ে পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে দায়িত্ব পালন করেন। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে গোলচত্বরের আশপাশে পুলিশের দাঙ্গা দমন বিশেষ যান এবং জলকামানসহ নানা ধরনের প্রস্তুত রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত পুলিশের দৃঢ় বাধার মুখে শ্রমিকেরা কোনো বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা বা জোরালো বিক্ষোভ প্রদর্শনে সফল হননি। ফলশ্রুতিতে সোমবার মিরপুর ১০ নম্বর ও এর আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যান চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও নির্বিঘ্ন ছিল।
এদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি সুরাহা করার উদ্দেশ্যে গত রবিবারই একটি নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। সরকারি মহল থেকে বারবার বলা হচ্ছে যে, সাধারণ শ্রমিকদের এই যৌক্তিক আন্দোলনের ভেতরে মুখোশধারী কিছু বহিরাগত অনুপ্রবেশ করেছে। যাঁরা আন্দোলনরত শ্রমিকদের ন্যায়সংগত দাবির সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নন, বরং এই অসাধু ব্যক্তিরাই রাজপথের আন্দোলনে ইচ্ছাকৃতভাবে নৈরাজ্য ও সহিংসতার সৃষ্টি করছেন।
এই প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সোমবার সকালে সচিবালয়ে দেশের পোশাকশিল্পের শীর্ষ দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতৃবৃন্দের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে আয়োজিত এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, পতিত স্বৈরাচারী ফ্যাসিবাদী শক্তির অদৃশ্য সমর্থক কিছু চক্র নিরীহ শ্রমিকদের সহজ সরল মনোবৃত্তিকে ব্যবহার করে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। যারা সড়কে অগ্নিসংযোগ ও অবরোধের মাধ্যমে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছে, তাদের পেছন থেকে যারা অর্থ ও অন্যান্য উপায়ে মদদ বা ইন্ধন জোগাচ্ছে, তাদের ইতোমধ্যে সফলভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের একটি দায়িত্বশীল সূত্র দাবি করেছে যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রায় ২৫টি সন্দেহভাজন হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপের সন্ধান লাভ করেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, মিরপুর, সাভার ও আশুলিয়া এলাকার বিভিন্ন স্থানে নাশকতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য লোকবল সংগ্রহ ও সংগঠিত করার কাজে এই অ্যাপভিত্তিক গ্রুপগুলো ব্যবহার করা হতো। পুলিশ কোথায় অবস্থান করছে কিংবা কোথায় জড়ো হয়ে মূলত ঘটনা ঘটাতে হবে, সেই সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও পরিকল্পনা এই সমস্ত গোপন গ্রুপ থেকেই সরবরাহ করা হতো।
গত রবিবার মিরপুরে শ্রমিকদের চলমান বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে দুষ্কৃতকারীরা পুলিশের একটি গাড়ি সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেয়। এই সংঘটিত নাশকতার ঘটনায় সব মিলিয়ে মোট ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে গোয়েন্দা পুলিশ বা ডিবি সুনির্দিষ্টভাবে ১১ জনকে আটক করেছে। আটক হওয়া ব্যক্তিরা হলেন মাহমুদুর রহমান জুয়েল, মো. অলিউল্লাহ অনিক, মো. কামাল গাজী, আলিফ হোসেন ইমন, রমজান সরকার, মো. মাহিম মোল্লা, মো. জুবায়ের ইসলাম ওরফে জিসান, মো. আরিফ আকন্দ, মোয়াজ্জেম শাহরিয়ার নিয়াজ, মো. আরিফ এবং মো. নাহিদ হাসান।
সোমবার পুলিশ গ্রেপ্তারকৃত এই ব্যক্তিদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতে সোপর্দ করে। আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে যে, শুনানির সময় আদালতে আসামিপক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না। পরবর্তীতে পুলিশের সুনির্দিষ্ট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক তাঁদের সকলকে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন। এদিকে এই সমস্ত গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের কোনো স্বজন বা পরিবারের কাউকে আদালত চত্বরে বা পুলিশের নাগালের মধ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে পুলিশের তরফ থেকে যে সমস্ত চাঞ্চল্যকর দাবি করা হচ্ছে, সে বিষয়ে আসামিপক্ষের বা তাঁদের পরিবারের সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হয়নি।
মিরপুরে পুলিশের সরকারি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক ভাঙচুরের এই ঘটনায় সর্বমোট পাঁচটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলাগুলো সরাসরি পুলিশের পক্ষ থেকেই বাদী হয়ে দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার গণমাধ্যমকে জানান যে, দায়েরকৃত এই পাঁচটি মামলার প্রতিটিতেই অজ্ঞাতনামা হিসেবে এক হাজারেরও বেশি ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
অন্যদিকে সোমবার মিরপুরের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মিরপুর ১০ নম্বর সেকশন গোলচত্বর এলাকায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মহিদুল ইসলাম। তিনি সংবাদকর্মীদের জানান যে, গত রবিবার সংঘটিত এই সহিংসতার ঘটনায় শুধু খেটে খাওয়া সাধারণ শ্রমিকরাই একাই জড়িত ছিলেন না, বিষয়টি এমন নয়। পুলিশের নিবিড় তদন্তে শ্রমিকদের পাশাপাশি অন্যান্য পেশার কুখ্যাত অপরাধীদের সরাসরি সম্পৃক্ততার জোরালো প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, এই ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর