নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বিভিন্ন বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব, পারিবারিক বাধা এবং সম্পর্কের জটিলতা পেরিয়ে রোমান্টিক কমেডি সিরিজ ‘নোবডি ওয়ান্টস দিস’ বিশ্বজুড়ে দর্শকের মনে গভীর দাগ কেটেছে। ক্রিস্টেন বেল এবং অ্যাডাম ব্রডি অভিনীত এই আলোচিত নেটফ্লিক্স সিরিজটির তৃতীয় কিস্তি সম্প্রতি মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই নতুন করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ২০২৪ সালে আত্মপ্রকাশ করা এই ধারাবাহিকটি শুরু থেকেই চিরায়ত প্রণয়ের গল্পের গণ্ডি পেরিয়ে ভিন্নধর্মী প্লট উপহার দিয়েছে। এর মূল দুই চরিত্র হলো খোলামেলা স্বভাবের পডকাস্টার জোয়ান, যিনি ধর্মীয় বিষয়ে উদাসীন, এবং রক্ষণশীল ইহুদি ধর্মযাজক নোয়াহ। তাঁদের মধ্যকার রোমাঞ্চকর পথচলায় হাস্যরসের পাশাপাশি ধর্ম, সামাজিক পরিচয় এবং জীবনযাপনের মৌলিক বৈপরীত্যগুলো দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। তৃতীয় কিস্তিতে এসে এই জুটি জীবনের আরও একটি পরিণত ও জটিল অধ্যায়ে পা রেখেছে।
গত প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তিতে জোয়ান এবং নোয়াহর সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সংশয় ছিল ভিন্ন সংস্কৃতির ও পরিবারের বাস্তবতায় তাঁরা আদৌ টিকতে পারবেন কি না। সেই দ্বন্দ্বের ইতি টানতে দ্বিতীয় কিস্তির অন্তিম পর্বে জোয়ান স্বয়ং ইহুদি ধর্ম গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। অন্যদিকে নোয়াহও অনুধাবন করতে সক্ষম হন যে কোনো শর্ত বা রূপান্তরের জন্য নয়, বরং মানুষ হিসেবেই তিনি জোয়ানকে গভীর ভালোবাসেন।
বর্তমান তৃতীয় ভাগে এসে কাহিনীর মূল প্রেক্ষাপট ও মনোযোগ সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়েছে। যুগলবন্দী হিসেবে তাঁরা শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে থাকতে পারবেন কি না, সেই পুরোনো প্রশ্নের চেয়ে এবার যৌথভাবে বাস্তব জীবন পরিচালনার বিষয়টি বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। একটি ছাদের নিচে একসঙ্গে বসবাস শুরু করার আনন্দ, নিত্যদিনের অভ্যাসের অমিল, নিজেদের ব্যক্তিগত জায়গার অধিকার এবং আত্মীয়স্বজনের নানা ধরনের অনধিকার প্রবেশ—সব মিলিয়ে এই দুই চরিত্র এক নতুন অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে।
এদিকে মুক্তির পরপরই বিশ্বজুড়ে পেশাদার সমালোচকদের কাছ থেকে বেশ ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া কুড়িয়েছে এই নতুন কিস্তি। বিখ্যাত রিভিউ প্ল্যাটফর্ম রটেন টম্যাটোজে জমা পড়া বিভিন্ন নিবন্ধে সিরিজটির নান্দনিক দিকের যেমন ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে, তেমনি এর কিছু জন্মগত ত্রুটির কথাও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রখ্যাত সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের জনপ্রিয় সমালোচক জ্যাক সিল এই তৃতীয় ভাগকে পাঁচের ভেতর চার নম্বর দিয়েছেন। তাঁর সুচিন্তিত মতানুসারে, কাহিনীটি এবার একটি থিতু বা স্থিতিশীল পর্যায়ে এসে পৌঁছালেও দর্শকদের মনে নতুন করে ভালোলাগা জাগানোর ক্ষমতা এর এখনও রয়েছে। অর্থাৎ জোয়ান এবং নোয়াহর সম্পর্কের পুরোনো জাদুকরী আকর্ষণ একবিন্দুও ম্লান হয়নি, বরং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দর্শক তা নতুন আঙ্গিকে উপভোগ করার সুযোগ পাচ্ছে।
অন্যদিকে টাইম সাময়িকীর অভিজ্ঞ লেখক জুডি বারম্যানের পর্যালোচনায়ও এই দুই প্রেমিক-প্রেমিকার সুখে শান্তিতে একসঙ্গে থাকার সম্ভাবনার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। তাঁর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই মৌসুমটি দর্শকদের মনে এই জুটির উজ্জ্বল ও আনন্দময় ভবিষ্যৎ নিয়ে দারুণ আশাবাদ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
অবশ্য সব সমালোচকের মূল্যায়ন একমুখী বা সম্পূর্ণ ইতিবাচক নয়। প্রভাবশালী প্রকাশনা দ্য হলিউড রিপোর্টারের বিশ্লেষক অ্যাঞ্জি হান বলেছেন যে সিরিজটি আগের তুলনায় অনেক বেশি মিষ্টি ও ভারসাম্যপূর্ণ রূপ পেলেও এর সুপ্রাচীন দুর্বলতাগুলো পুরোপুরি দূর হয়নি। পাশাপাশি, রজারএবার্ট ডটকমের নামী সমালোচক ক্রিস্টিনা এসকোবার মনে করেন যে দ্বিতীয় ধাপে কাহিনীর পুনরাবৃত্তি দেখা দিলেও বর্তমান তৃতীয় ধাপে জোয়ান ও নোয়াহর পারস্পরিক সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। বিশেষ করে ভালোবাসার পাশাপাশি নিজেদের আত্মিক পরিবর্তন এবং বয়সের সঙ্গে সঙ্গে পরিণত হয়ে ওঠার বিষয়টি এখানে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
বিশিষ্ট পর্যালোচনা সাইট রটেন টম্যাটোজে জমা পড়া মোট কুড়িটি রিভিউয়ের ওপর ভিত্তি করে এই মৌসুমের অফিশিয়াল টম্যাটোমিটার স্কোর দাঁড়িয়েছে চমৎকার নব্বই শতাংশ। তবে এর বিপরীতে সাধারণ দর্শকদের দেওয়া রেটিং তুলনামূলক কিছুটা কম, যা মাত্র উনসত্তর শতাংশের ঘরে রয়েছে।
সিরিজটির সাফল্যের পেছনে এর মূল অভিনয়শিল্পীদের অনবদ্য রসায়ন সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। জোয়ান চরিত্রে রূপদানকারী ক্রিস্টেন বেল চরিত্রের ভেতরের আত্মবিশ্বাস, স্পষ্টভাষী মনোভঙ্গি, আবেগের আকস্মিক উত্থান-পতন এবং মাঝে মাঝে প্রকাশ পাওয়া আত্মকেন্দ্রিক প্রবৃত্তিগুলো দারুণ সাবলীল ভঙ্গিতে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রেমের টানে নিজের সুপ্রতিষ্ঠিত জীবনবোধ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখার যে রূপান্তর জোয়ানের মধ্যে এসেছে, তা অভিনেত্রীর সাবলীল অভিনয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
অপরদিকে নোয়াহ চরিত্রের রূপকার অ্যাডাম ব্রডির প্রাণবন্ত অভিনয় এই ধারাবাহিকের আরেকটি বিশাল প্রাপ্তি। পর্দার ভেতরে তাঁকে একই সঙ্গে অত্যন্ত দায়িত্বশীল ধর্মযাজক, পরিবারের অনুগত সদস্য এবং নিবেদিতপ্রাণ প্রেমিক হিসেবে দেখতে পাওয়া যায়। চরিত্রটির সুনিয়ন্ত্রিত আচরণ ও মৃদু হাস্যরস জোয়ানের তুলনামূলক চঞ্চল স্বভাবের সঙ্গে একটি দারুণ শৈল্পিক বৈপরীত্য তৈরি করেছে।
এই দুই শক্তিমান শিল্পীর পারস্পরিক নিখুঁত রসায়নই মূলত পুরো প্রজেক্টের রোমান্টিক আবেদন বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তাঁদের সাধারণ কথোপকথন, খুনসুটি, মান-অভিমানের পালা কিংবা গভীর আবেগঘন মুহূর্তগুলো সাধারণ দর্শকদের কাছে ভীষণ রকম বিশ্বাসযোগ্য ও জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
বর্তমান তৃতীয় খণ্ডের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় দিক হলো পার্শ্বচরিত্রগুলোর ভাগ্যে নির্মাতাদের বিশেষ মনোযোগ দেওয়া। জোয়ানের বোন মর্গান এবং নোয়াহর ভাই সাশার সম্পর্কের পারস্পরিক সমীকরণও এই দফায় দারুণ গুরুত্ব লাভ করেছে। দুজনের মধ্যকার বহুদিনের দীর্ঘ বন্ধুত্ব এবং সুপ্ত টানাপোড়েনের সমান্তরালে এবার কিছু নতুন অনুভূতির আভাসও লক্ষ্য করা গেছে।
মর্গান চরিত্রের রূপায়ণকারী জাস্টিন লুপের অভিনয় বিশেষভাবে সবার প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হয়েছে। তাঁর অভিনীত চরিত্রটির মধ্যে রয়েছে একধরনের নিজস্ব আত্মবিশ্বাস, সূক্ষ্ম ঈর্ষা, চমৎকার রসবোধ এবং নিজের ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে এক অজানা অনিশ্চয়তা। পেশাগত কর্মক্ষেত্রেও তাঁকে বিভিন্ন নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। অন্যদিকে সাশা এবং এস্থারের দাম্পত্য সম্পর্কের ভেতরের রূপান্তরও মূল কাহিনীর গতিপ্রকৃতিতে সম্পূর্ণ নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে।
জনপ্রিয়তার আকাশচুম্বী প্রমাণের সবচেয়ে বড় নিদর্শনটি পাওয়া যাচ্ছে সরাসরি নেটফ্লিক্সের নিজস্ব অফিশিয়াল দর্শকসংখ্যার পরিসংখ্যানে। গত ২২ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি পাওয়ার পর মাত্র প্রথম চার দিনের মাথায় এই তৃতীয় মৌসুমটি লুফে নিয়েছে মোট বাষট্টি লাখ ভিউ। এর সুবাদে নেটফ্লিক্সের ইংরেজি ভাষার বৈশ্বিক জনপ্রিয় সিরিজের তালিকায় এটি গর্বের সঙ্গে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে নিয়েছে।
তবে মজার বিষয় হলো, ঠিক আগের মৌসুমের প্রথম দিকের তুলনায় এই কিস্তিতে সামগ্রিক দর্শকসংখ্যা সামান্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। কারণ এর আগের অর্থাৎ দ্বিতীয় মৌসুমটি নেটফ্লিক্সে উন্মুক্ত হওয়ার পর প্রথম চার দিনে মোট ছিয়াশি লাখ ভিউ সংগ্রহ করতে পেরেছিল। সেই তুলনামূলক হিসাব অনুযায়ী বিচার করলে চলতি তৃতীয় খণ্ডের উদ্বোধনী দর্শকসংখ্যা প্রায় আঠারো শতাংশ কমে গেছে।
তা সত্ত্বেও নেটফ্লিক্সের এই নতুন সংযোজনের ঝুলিতে রয়েছে বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল ও উল্লেখযোগ্য অর্জন। বিশেষ করে ২০২৬ সালে নেটফ্লিক্সের প্ল্যাটফর্মে কামব্যাক করা যেকোনো চিত্রনাট্যনির্ভর কমেডি সিরিজের ক্ষেত্রে এটিই হলো সবচেয়ে বড় উদ্বোধনী সপ্তাহান্তের দর্শকসংখ্যা পাওয়ার রেকর্ড। বর্তমান সময়ে বিশ্বের মোট ছাপ্পান্নটি দেশের সেরা দশটি জনপ্রিয় সিরিজের তালিকায় এটি দৃঢ়ভাবে নিজের জায়গা করে নিয়েছে এবং তার মধ্যে একুশটি রাষ্ট্রে এটি এককভাবে শীর্ষস্থান দখল করেছে।
আর যদি পুরো সিরিজটির সার্বিক সাফল্যের দিকে তাকানো যায়, তবে সেই পরিসংখ্যান আরও অনেক বেশি চমকপ্রদ ঠেকবে। গত ২০২৪ সালে বিশ্বমঞ্চে যাত্রা শুরু করার পর থেকে এ পর্যন্ত ‘নোবডি ওয়ান্টস দিস’ ধারাবাহিকটি বিশ্বজুড়ে নেটফ্লিক্সের অত্যন্ত লোভনীয় সেরা দশের তালিকায় মোট এগারো সপ্তাহ ধরে নিজেদের অবস্থান অক্ষুণ্ণ রেখেছে। এই দীর্ঘ সময়ে বিশ্বজুড়ে এই জনপ্রিয় সিরিজটির সর্বমোট ভিউয়ের পরিমাণ ইতোমধ্যে ছাড়িয়ে গেছে অবিশ্বাস্য বারো কোটি।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর