নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সঙ্গী খোঁজার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বাজারে তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সম্পূর্ণ অভিনব এক পন্থা অবলম্বন করেছে চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চালিত একটি ডেটিং অ্যাপ্লিকেশন। এই প্ল্যাটফর্মের ঘোষণা অনুযায়ী, কোনো গ্রাহক নির্ধারিত তিন বছরের মধ্যে বৈবাহিক বন্ধনে জড়াতে ব্যর্থ হলে তার বার্ষিক সাবস্ক্রিপশন বাবদ প্রদান করা ২ হাজার ইউয়ান তথা প্রায় ৩০০ মার্কিন ডলারের পুরোটাই ফেরত দেওয়া হবে।
চলতি বছরের জুলাই মাসে আত্মপ্রকাশ করা ‘লিয়াংপেই এআই’ বা ‘Liangpei AI’ নামক এই ডেটিং মাধ্যমটি প্রচলিত বাণিজ্যিক ধারা থেকে সম্পূর্ণ বের হয়ে এসে এই চাঞ্চল্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ শর্তটি জুড়ে দিয়েছে।
সাধারণত চীনের ডেটিং অ্যাপ্লিকেশনগুলোর পুরো ব্যবসাটিই নির্ভর করে ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখার ওপর। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, চীনের এই ডেটিং বাজারের আকার পৌঁছেছে প্রায় ২ হাজার ২৬০ কোটি ইউয়ান বা ৩.৪ বিলিয়ন ডলারে এবং এর মোট গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ২৮ কোটির কাছাকাছি। এই বিশাল শিল্প খাতের প্রচলিত নিয়ম ভেঙে লিয়াংপেই এআই সম্পূর্ণ নতুন একটি ব্যবসায়িক পথ বেছে নিয়েছে।
ঐতিহ্যগত ডেটিং অ্যাপগুলোতে গ্রাহকরা একই সঙ্গে একাধিক মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ বা সোয়াইপ করার সুবিধা পেয়ে থাকেন। তবে লিয়াংপেই এআই এই প্রচলিত ধারণা থেকে সম্পূর্ণ সরে এসে যুগপৎভাবে কেবল একজনের সঙ্গেই যোগাযোগের কঠোর শর্ত আরোপ করেছে। এর ফলে কোনো ব্যবহারকারী তাঁর বর্তমান সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি চুকিয়ে না ফেলা পর্যন্ত অন্য কোনো নতুন ব্যক্তির প্রোফাইল দেখতে বা তাঁর সঙ্গে কোনো প্রকার কথোপকথন চালাতে পারবেন না।
এই প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট খুলতে হলে জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে নিজের আসল নাম নিশ্চিত করতে হয়, পাশাপাশি অবিবাহিত থাকার প্রমাণপত্র ও ছবি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কার্যক্রম শুরুর কেবল প্রথম মাসেই এই কড়া জালিয়াতি প্রতিরোধী ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে প্রায় দেড়শতাধিক বিবাহিত ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে এই অ্যাপ থেকে স্থায়ীভাবে বর্জন করা হয়েছে।
নতুন কোনো ব্যক্তি নিবন্ধন সম্পন্ন করার পর তাঁকে কুড়ি মিনিটের একটি দীর্ঘ ও বিস্তারিত এআই চ্যাটিং প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এই পদ্ধতির মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ওই ব্যবহারকারীর পারিবারিক পটভূমি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত জীবন, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ এবং জীবনসঙ্গীর কাছে তাঁর নির্দিষ্ট প্রত্যাশার অত্যন্ত নিখুঁত একটি প্রোফাইল তৈরি করে ফেলে।
এই অ্যাপ্লিকেশনটির প্রতিষ্ঠাতা জেং জিনসুন অতীতে স্বনামধন্য চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মুনশট এআই-এর চ্যাটবট কিমির সার্চ প্রযুক্তি বিভাগের প্রধান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
চাকরির একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করার সময় এক চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে মূলত এই ডেটিং প্রোডাক্টের আইডিয়াটি পান জেং। তিনি স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে, তথ্য অনুসন্ধান এবং যুক্তিনির্ভর চুলচেরা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যে অপার সম্ভাবনা রয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে মানুষের সঠিক জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়ার পথটি আরও সুগম করা সম্ভব।
গত বছর কিমি কে২ উন্মোচন করার সেই বিশেষ সময়েই তিনি বিশাল অঙ্কের বেতনের সুযোগ অবলীলায় ত্যাগ করে নিজের উদ্যোগে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন এবং তাঁর পূর্বের চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফা দেন।
প্রতিষ্ঠাতা জেংয়ের ব্যক্তিগত অভিমত হলো, প্রথাগত ডেটিং অ্যাপগুলো আসলে নির্দিষ্ট কিছু প্রোফাইলের এক একটি প্রদর্শনী বা ইয়েলো পেজের বেশি কিছু নয়। এই মাধ্যমগুলো মেলামেশার মতো কঠিন কাজটি পুরোপুরি ব্যবহারকারীদের নিজেদের ওপরই ছেড়ে দেয়। অন্যদিকে, বর্তমান যুগের তরুণ প্রজন্মের সঙ্গী নির্বাচনের মানদণ্ড অত্যন্ত জটিল হলেও অ্যাপগুলোর বর্তমান অ্যালগরিদমগুলো বেশ সাধারণ। এই দুয়ের মধ্যকার বিশাল ব্যবধানটিই সফলভাবে দূর করে দিচ্ছে এআই।
নিজের জীবনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে জেং জানান যে, তিনি নিজেও অতীতে একটি ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমেই তাঁর বর্তমান স্ত্রীকে খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে আগে থেকেই গভীর পরিচয় থাকায় তাঁরা মাত্র একদিনের কথোপকথনের পরই সশরীরে দেখা করার তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ঠিক সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই ব্যবহারকারীকে গভীরভাবে অনুধাবনের এই পদ্ধতিটি তিনি লিয়াংপেই এআই-এর কাঠamoয় যুক্ত করেছেন।
টাকা ফেরত বা রিফান্ডের নীতি প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জেং ব্যাখ্যা করেন যে, বিয়ে হলো একটি সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া যা খুব সহজেই সরকারি বৈধ সনদের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব। সুতরাং, কোনো ব্যবহারকারী যদি এই অ্যাপের সাহায্য নিয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁর কাঙ্ক্ষিত সঙ্গী খুঁজে না পান, তবে সেই সেবার বিপরীতে কোনো মূল্য গ্রহণ করা উচিত নয় বলেই তিনি বিশ্বাস করেন।
এই অ্যাপটির ভেতর ‘এআই স্ট্র্যাটেজিস্ট’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৌশলবিদ নামে একটি অত্যন্ত উপযোগী বিশেষ ফিচার রাখা হয়েছে, যা গ্রাহকদের সম্পর্কের নানা টানাপোড়েন বা যোগাযোগের জটিল সমস্যাগুলোর তাৎক্ষণিক পরামর্শ দিয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, এক নারী ব্যবহারকারী তাঁর সঙ্গীকে বার্তা পাঠানোর পরও কোনো উত্তর না পেয়ে এই এআই-এর সাহায্য নিয়েছিলেন। তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাঁকে পরামর্শ দিয়ে জানায় যে, সঙ্গী যতই ব্যস্ত থাকুক না কেন, তিন দিনের মধ্যে কোনো বার্তা বা প্রতিউত্তর না দেওয়া একটি স্বাস্থ্যকর সম্পর্কের জন্য কোনোভাবেই ইতিবাচক হতে পারে না। পরবর্তী সময়ে ওই নারী সেই পরামর্শ মেনে সংযোগটি ছিন্ন করে সম্পূর্ণ নতুন এক সঙ্গীর সন্ধান পান।
বর্তমানে এই অ্যাপটির প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত মোট ব্যবহারকারীর সংখ্যা এরই মধ্যে ৩৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং এর রূপান্তর হার বা কনভারশন রেট দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি। এছাড়া এই প্রতিষ্ঠানটি তাদের কার্যপরিধি বাড়াতে ইতিমধ্যেই ১৫ মিলিয়ন ইউয়ান বা ২.২ মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ বিনিয়োগ সফলভাবে সংগ্রহ করেছে।
বিভিন্ন প্রযুক্তি ও সমাজ বিশ্লেষকদের সুচিন্তিত মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক এই অত্যন্ত নির্ভুল ম্যাচমেকিং পদ্ধতি সমাজে সফল ও দীর্ঘস্থায়ী বিয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে যথেষ্ট সাহায্য করতে পারে। এর ফলে সম্পর্কের প্রতি বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মাঝে যে ক্রমবর্ধমান অনীহা তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে এটি অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর