ঢাকা | বঙ্গাব্দ

৬৯ বছর পর রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ হচ্ছে না আল-আকসায়

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Mar 13, 2026 ইং
৬৯ বছর পর রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ হচ্ছে না আল-আকসায় ছবির ক্যাপশন: ৬৯ বছর পর রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ হচ্ছে না আল-আকসায়
ad728

রমজানের শেষ দশ দিন এলেই জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা মসজিদ সাধারণত লাখো মুসল্লির পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। ফিলিস্তিনের বিভিন্ন শহর, গ্রাম এবং দখলকৃত ভূখণ্ডের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ ইতিকাফ, তারাবিহ, কোরআন তিলাওয়াত ও রাতভর ইবাদতের জন্য এখানে ছুটে আসেন।কিন্তু এ বছর সেই পরিচিত দৃশ্য যেন পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর এই প্রথম রমজানের শেষ দশ দিনে আল-আকসা মসজিদ ও জেরুজালেমের পুরনো শহর প্রায় পুরোপুরি মুসল্লিশূন্য হয়ে পড়েছে।

 
সাধারণত ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত যে প্রাঙ্গণ মানুষের ভিড়ে সরগরম থাকে, সেখানে এখন নেমে এসেছে অস্বাভাবিক নীরবতা। মসজিদের করিডোরগুলোতে নেই কোনো ইবাদতকারীর আনাগোনা, নেই কোরআন তিলাওয়াতের ধ্বনি কিংবা হকারদের হাঁকডাক। 
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আল-আকসা মসজিদে প্রবেশ প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বহু দশকের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রমজানের শেষ দশকে মসজিদটি প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে।
 
বিগত ৪৬ বছর ধরে আল-আকসায় ইমামতি করা এক প্রবীণ ইমাম নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আজ আল-আকসা ভীষণ একা। গত কয়েক দশকের মধ্যে এমন দৃশ্য তিনি কখনো দেখেননি। যেখানে একসময় হাজার হাজার মানুষ ইতিকাফ করতেন, সেখানে এখন চার-পাঁচজন মানুষ নিয়ে নামাজ পড়াতে হচ্ছে। তিনি জানান, মসজিদের ভেতরের স্পিকারে আজান ও নামাজ অনুষ্ঠিত হলেও বাইরের মানুষ অনেক সময় তা শুনতেই পান না। ফলে অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে ভেতরে নামাজ হচ্ছে। 
এই ইমাম আরও বলেন, কখনো কখনো তাকে নিজের বাসার পাশের ছোট একটি মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়াতে হয়। সেখানে যখন মুসল্লিরা তাকে দেখে বলেন, আজ আল-আকসার কণ্ঠ আমাদের মাঝে এসেছে, তখন তার বুক ভেঙে কান্না আসে। কারণ সবাই একটাই প্রশ্ন করেন, হে শায়খ, আল-আকসা কবে খুলবে? অথচ এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছেও নেই।
 
আল-আকসার আরেক স্বেচ্ছাসেবক মাজদ আল-হাদমি বলেন, তিনি পেশায় একজন দন্তচিকিৎসক হলেও গত প্রায় পনেরো বছর ধরে শখের বসে এখানে আজান দেওয়া এবং কোরআন তিলাওয়াত করে আসছেন। 
 
তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মুসলিমদের জন্য এক গভীর বঞ্চনার প্রতীক। নিরাপত্তার অজুহাতে এই অবরোধকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে এটি একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ। তিনি মনে করেন, গত প্রায় এক বছর ধরে জেরুজালেমের মুসলিম পরিচয় দুর্বল করার যে প্রচেষ্টা চলছে, আল-আকসাকে প্রায় বন্ধ করে দেওয়া সেই বৃহত্তর পরিকল্পনারই অংশ।
 
জেরুজালেম গভর্নরেটের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর থেকে মাত্র কয়েকবার আল-আকসায় জুমার নামাজ পুরোপুরি বন্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের ৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া অবরোধকে সবচেয়ে কঠোর ও দীর্ঘস্থায়ী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, এবারের বিধিনিষেধ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
 
তাদের মতে, কয়েকটি কৌশলগত পদক্ষেপের মাধ্যমে মসজিদটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। জরুরি অবস্থার অজুহাতে আল-আকসাকে কার্যত অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। 
 
মুসল্লিদের ইবাদত, বিশেষ করে রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পুরো রমজানজুড়ে ধীরে ধীরে বিধিনিষেধ বাড়িয়ে এখন মসজিদটিকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি মসজিদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য ও সরঞ্জাম ভেতরে প্রবেশ করতেও নানা বাধা দেওয়া হচ্ছে।
 
এদিকে মসজিদের আঙিনায় সশস্ত্র সেনাদের টহল বাড়ানো হয়েছে। ধর্মীয় শিক্ষা ও আলোচনা সভা, কোরআন শিক্ষার আসর এবং বিভিন্ন ইলমি মজলিসও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে মসজিদ পরিচালনা করে আসা ইসলামি ওয়াকফ কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক ক্ষমতাও সীমিত করার চেষ্টা চলছে।
 
সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো, মুসলিমদের প্রবেশ কঠোরভাবে সীমিত করা হলেও একই সময়ে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের জন্য প্রবেশের সময় বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে বছরের শুরু থেকে শত শত ফিলিস্তিনিকে আল-আকসায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ওয়াকফ কমিটির কর্মকর্তা, ইমাম ও খতিবও রয়েছেন।
 
ফিলিস্তিনি পর্যবেক্ষকদের মতে, আল-আকসাকে ঘিরে এই নীরবতা কেবল নিরাপত্তার কারণে নয়। বরং এটি জেরুজালেমের জনতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় চরিত্র পরিবর্তনের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। তাদের আশঙ্কা, যদি এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে থাকে, তবে পবিত্র এই শহরের ইসলামী পরিচয়কে দুর্বল করার একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হতে পারে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
শাপলা চত্বরের শহীদদের নাম স্বর্ণাক্ষরের লিখে যেতে চাই: আসিফ

শাপলা চত্বরের শহীদদের নাম স্বর্ণাক্ষরের লিখে যেতে চাই: আসিফ