ফ্রান্সের আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থি নেতা মেরিন লে পেন জয়ী হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজেট, ইউক্রেনকে আর্থিক সহায়তা এবং রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। ইইউর সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্কেও তৈরি হতে পারে নতুন টানাপোড়েন।
ইউরো নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থি দল ন্যাশনাল র্যালির নেতা লে পেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি ফ্রান্সের আর্থিক অবদান কমানো এবং ইউক্রেনকে অর্থায়ন বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি রাশিয়ার ওপর ইইউর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারেরও আহ্বান জানিয়েছেন।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) ব্রাসেলসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় লে পেন বলেন, ফ্রান্সের সরকারি অর্থব্যবস্থার ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ অবস্থার কারণে ইউক্রেনকে বর্তমান আর্থিক সহায়তা আর মাত্র ছয় মাস চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। ইউরোনিউজকে তিনি বলেন, ‘এই অর্থায়ন বন্ধ হবে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে সত্যিটা জানানো সততার বিষয়।’
তবে লে পেনের বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। বৃহস্পতিবার ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এর জন্য যে মূল্য দিতে হবে, তা মানুষের জীবনের মূল্যের চেয়ে বেশি নয়।’
লে পেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ইউরোপের কার্যকর ও শক্তিশালী ব্যবস্থার সঙ্গে তার পরিচিত হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন জেলেনস্কি। তার মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের অর্জিত অভিজ্ঞতা ইউরোপের অন্যান্য দেশের নিরাপত্তা জোরদারে কাজে লাগতে পারে।
ইউক্রেন ইস্যুতে ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে মতপার্থক্য।
লে পেনের অবস্থান ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির নীতির সঙ্গে স্পষ্টভাবে ভিন্ন। মেলোনিকে প্রায়ই লে পেনের সঙ্গে তুলনা করা হলেও তিনি ইউক্রেনকে সহায়তা অব্যাহত রাখার পক্ষে।
বুধবার ব্রাসেলসে ইইউ সম্মেলনের আগে ইতালির সিনেটে দেওয়া বক্তব্যে মেলোনি ইউক্রেনের আত্মরক্ষার অধিকারের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন।
তিনি বলেন, ‘ইউক্রেনকে সমর্থন করা শান্তির বিকল্প নয়; বরং এই সমর্থনই শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে।’
মেলোনি আরও বলেন, তার সরকার ইউক্রেনকে সমর্থন, রাশিয়ার ওপর চাপ বজায় রাখা এবং ইউরোপ-আটলান্টিক অঞ্চলের ঐক্য রক্ষার নীতি থেকে সরে আসবে না।
ফ্রান্সের সহায়তা বন্ধ হলে কী প্রভাব পড়বে?
ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক ইনস্টিটিউটের নিরাপত্তা অধ্যয়ন কেন্দ্রের পরিচালক এলি তেনেনবাম ইউরোনিউজকে বলেন, ইউক্রেনের প্রতি ফ্রান্সের সমর্থন শুধু আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যৌথভাবে গঠিত ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’সহ ইউক্রেনকে সহায়তা অব্যাহত রাখার বিভিন্ন উদ্যোগে ফ্রান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
এ ছাড়া ইউক্রেনের জন্য ৯ হাজার কোটি ইউরোর সহায়তা ঋণ কার্যকর ও বিতরণের ক্ষেত্রেও ফ্রান্সের মতো বড় দেশগুলোর রাজনৈতিক সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ।
তেনেনবামের মতে, ফ্রান্স যদি শুধু দ্বিপক্ষীয় সহায়তা বন্ধ করে, তার চেয়ে ইইউর বাজেটে অবদান কমানো এবং ইউরোপীয় সহায়তা ব্যবস্থাগুলোর বিরোধিতা করা ইউক্রেনের জন্য বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। এতে ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার পুরো ইউরোপীয় কাঠামো ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
জার্মানির গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিল ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর থেকে ইউক্রেনের জন্য প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি ইউরো সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ফ্রান্স। এর মধ্যে ৭৯০ কোটি ইউরো দ্বিপক্ষীয় সহায়তা এবং ১ হাজার ৯০০ কোটি ইউরো ইউরোপীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে দেওয়া সহায়তা।
তবে মোট সহায়তার পরিমাণের হিসাবে ইউরোপে ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় সহায়তাকারী জার্মানি। দেশটি ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির পর থেকে ৫ হাজার কোটি ইউরোর বেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ইইউর বাজেটে অবদান কমাতে চান লে পেন।
ইউক্রেন ইস্যুর পাশাপাশি ইইউর বাজেটে ফ্রান্সের অবদান কমানোর পরিকল্পনাও সামনে এনেছেন লে পেন। তাঁর দল ফ্রান্সের নিট বার্ষিক অবদান ৮০০ কোটি ইউরো থেকে কমিয়ে ৫০০ কোটি ইউরোতে নামিয়ে আনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ফরাসি সিনেটের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে এই হিসাব তুলে ধরা হয়েছে।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সরকার ইইউর জন্য তুলনামূলক বড় বাজেটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে জার্মানিসহ কয়েকটি দেশ ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়।
ফ্রান্স ইইউর বাজেটে নিট অবদানকারী দেশ হলেও দেশটির কৃষকেরা ইইউর অভিন্ন কৃষিনীতি (সিএপি) থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ পান।
জ্যাক দেলর ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক ইউলালিয়া রুবিওর মতে, বড় অর্থদাতা দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্স এখন পর্যন্ত উচ্চাভিলাষী ইইউ বাজেটের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ব্যতিক্রমী দেশ।
২০২৮-২০৩৪ সালের বাজেট নিয়ে বিরোধের আশঙ্কা।
ইইউর ২০২৮ থেকে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত বাজেট নিয়েও মতবিরোধের ইঙ্গিত দিয়েছেন লে পেন। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বুধবার তিনি বলেন, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এই বাজেট নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর উদ্যোগ ‘অগণতান্ত্রিক’।
ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি ও পোল্যান্ডে নির্বাচনের আগে ইউরোপীয় কমিশন বাজেট প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট মাখোঁ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজের ঘনিষ্ঠদের নিয়োগ দিয়ে প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। বৃহস্পতিবার এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ইইউ নেতাদের তিনি জানান, চলতি বছরের মধ্যেই বাজেট নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর পক্ষে প্যারিস।
লে পেনের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হলে ইউক্রেনের অর্থায়ন, ইইউর দীর্ঘমেয়াদি বাজেট এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপের নীতিতে বড় ধরনের মতবিরোধ তৈরি হতে পারে। তবে এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নির্ভর করবে নির্বাচনের ফলাফল এবং ফ্রান্স ও ইইউর প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ওপর।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর