নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ডিজিটাল মাধ্যমের পাতা উলটাতে গিয়ে হঠাৎ করেই নজর কাড়ে বাংলাদেশ বনাম আফগানিস্তানের একটি টেস্ট ম্যাচের ছোট ভিডিও ক্লিপ, যেটিতে হাসির প্রতিক্রিয়ার বন্যা বয়ে গেছে। পুরো বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে মনে হবে এই লড়াই কোনো সাধারণ খেলা নয়, বরং অস্কারজয়ী শিল্পীদের সম্মিলিত কোনো অভিনয় প্রদর্শনী।
পূর্ণাঙ্গ রূপে বিড়াল এবং খণ্ডকালীন সময়ে বাঘের চরিত্র রূপায়ণে বেশ সুখ্যাতি রয়েছে জাতীয় এই দলটির। এই অবস্থা অনেকটা আমার বিদ্যাপীঠের পড়াশোনার সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে পরবর্তী সেমিস্টারে ঘুরে দাঁড়ানো আর জাতীয় দলের জয়লাভ করা একই সূত্রে বাঁধা, কারণ এগুলোর কোনোটিই আর সফলভাবে পুনরুত্থান ঘটে না।
এই যন্ত্রণায় পড়ালেখা বন্ধ করতে না পারলেও জাতীয় দলের খেলা দেখা পুরোপুরি বর্জন করেছি, যেন হৃদপিণ্ডের বাঁ পাশে অনুভূত হওয়া তীব্র যন্ত্রণা কিছুটা হলেও লাঘব হয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চতুর কৌশলগুলো তো আর সহজে নিস্তার দেয় না, ঠিকই নিউজফিড ঘাঁটলে বাঘের চামড়ার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই দলের সর্বশেষ তথ্য সামনে চলে আসে।
গতকালের ঘটনার কথা যদি বলি, পাতা ওলটাতে গিয়ে চোখে পড়ে বাংলাদেশ বনাম আফগানিস্তানের টেস্ট ম্যাচের সেই ভিডিও ক্লিপটি, যেখানে প্রতিক্রিয়ার ঘরে উপচে পড়েছে হাসির জোয়ার। সম্পূর্ণ বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করার পর প্রতীয়মান হয় যে এই খেলাটি যেন অস্কারজয়ী কুশীলবদের এক যৌথ মহড়া চলছে।
এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে বন্ধু মহলের অনলাইন আড্ডায় শুরু হয় নানা বিনোদনমূলক আলাপচারিতা। তাদের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম, এই খেলাটিকে যদি একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে এর শিরোনাম কী রাখা যেতে পারে? বন্ধু মাসুম তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল, ‘মিশন ড্র: একটি হার এড়ানোর গল্প’।
এই কাল্পনিক চলচ্চিত্রে দেখা যায় এক দলের একমাত্র লক্ষ্য যেকোনো মূল্যে জয় ছিনিয়ে আনা, আর অপর দলের একমাত্র উদ্দেশ্য যেকোনো উপায়ে পরাজয় এড়িয়ে খেলা ড্র করা। বন্ধু রায়হান মন্তব্য করল, এই সিনেমাটিকে যেভাবেই হোক পুরস্কারের মঞ্চে বিজয়ী করতে চায় সংশ্লিষ্ট পক্ষ, প্রয়োজনে তারা নতুন একটি একাডেমি প্রতিষ্ঠা করবে।
প্রতিষ্ঠিত সেই নতুন সংস্থার নাম হতে পারে ‘একাডেমি অব মোশন পিকচার্স অ্যান্ড ক্রিকেটিং কাউন্সিল’, যেখান থেকে প্রতিবছর অভিনয়ে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘ক্রিকেটীয় অস্কার’ প্রদান করা হবে। কৌতূহল প্রকাশ করে জানতে চেয়েছিলাম, তবে এবারের আসরে এই বিশেষ পুরস্কার কারা অর্জন করছে।
রায়হান তখন জানাল যে বর্তমান আসরে এই পুরস্কারের জন্য নির্বাচিতদের নাম। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বিগত ২০২৪ সালেও এই সম্মানজনক পুরস্কারের সেরা অভিনেতার স্বীকৃতি অর্জন করেছিলেন আফগানিস্তানের তারকা খেলোয়াড় গুলবাদিন নাইব। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, সেবারের প্রতিযোগিতাও অনুষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশের বিপক্ষেই।
চলচ্চিত্রের বিভিন্ন বিভাগের পুরস্কারের মধ্যে প্রথমত, সেরা চলচ্চিত্রের সম্মান জিতেছে ‘মিশন ড্র: একটি হার এড়ানোর গল্প’ শীর্ষক সিনেমাটি। এই চলচ্চিত্রের প্রথম চার দিন গতানুগতিক অন্যান্য টেস্ট ম্যাচের মতোই স্বাভাবিকভাবে অতিবাহিত হলেও আসল রোমাঞ্চকর মোড় বা ক্লাইম্যাক্স শুরু হয় পঞ্চম দিনের শেষ দুই ঘণ্টায়।
খেলার এই অংশটি এমনকি একাধিকবার সেরা চলচ্চিত্রের খেতাব অর্জনকারী ঐতিহ্যবাহী ‘অ্যাশেজ’ সিরিজেও সচরাচর দেখা মেলে না। মূলত ম্যাচের একদম শেষ দুই ঘণ্টার এই টানটান উত্তেজনাপূর্ণ স্থায়িত্বই সিনেমাটিকে সেরা চলচ্চিত্রের মুকুট এনে দিয়েছে। আরও কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো আসন্ন আসরের বেশ কয়েকটি শাখায় এই সিনেমার একক আধিপত্য পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান।
দ্বিতীয়ত, সেরা অভিনেতার পুরস্কারটি ঝুলিতে ভরেছে এই সিনেমারই আফগান প্রতিনিধি কাইস আহমেদ। নির্ধারিত সমাপ্তির সময় ছিল বিকেল পাঁচটা বেজে দশ মিনিট, আর ঘড়ির কাঁটায় তখন স্থানীয় সময় বিকেল চারটা বেজে সাতান্ন মিনিট চলছে।
ম্যাচ জিততে বাংলাদেশের প্রয়োজন মাত্র দুটি উইকেট এবং আফগানিস্তানের ড্র করতে দরকার যেকোনো প্রকারে আরও তেরো মিনিট ক্রিজে টিকে থাকা। সমস্ত নাটকীয়তার ঠিক ওই মুহূর্ত থেকেই সূচনা ঘটে। নির্ধারিত শেষ ওভারের ঠিক আগের ওভারের প্রথম বলটি ব্যাটার কাইস ঠেকানোর অতি ক্ষুদ্র পলকের মধ্যেই হঠাৎ আঘাতের ভান করে মাটিতে শুয়ে পড়েন।
শরীরে পেশির টান বা ক্র্যাম্পের আক্রমণ হয়েছে তা প্রমাণ করতে তিনি এমন এক অতিপ্রাকৃতিক শারীরিক ভঙ্গিমায় লুটিয়ে পড়লেন যে স্বয়ং লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও এসে তার কাছ থেকে অভিনয় প্রশিক্ষণ নিতে চাইলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকত না।
পুনরায় স্মরণ করা ভালো যে, ২০২৪ সালের আসরেও সেরা অভিনেতার এই পুরস্কারটি পেয়েছিলেন আফগান ক্রিকেটার গুলবাদিন নাইব। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেই লড়াইয়ে বৃষ্টি আইনে চলমান ম্যাচে বাংলাদেশের ইনিংস চলাকালে হঠাৎ করেই ফিল্ডিংরত অবস্থায় একই ধরনের পেশির টানের অভিনব নাটক করে সময় নষ্ট করে সেরা অভিনেতার পুরস্কার জিতে নিয়েছিলেন তিনি।
তৃতীয়ত, সেরা আবহ সংগীতের বিভাগটিতে যৌথভাবে বিজয়ী হয়েছে জাতীয় ক্রিকেট দল এবং ধারাভাষ্যকারগণ। কাইস মাটিতে লুটিয়ে পড়ার বিন্দুমাত্র দেরি না করেই প্রথম ধারাভাষ্যকার উচ্চস্বরে হেসে বলে উঠলেন, কাইস আবারও হুবহু একই কাণ্ড ঘটিয়ে বসল।
এই ঘটনাটি তাকে বিগত বিশ সালের কুড়ি ওভারের বিশ্ব আসরে গুলবাদিনের প্রদর্শিত অভিনয়ের স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে। তখন দ্বিতীয় ধারাভাষ্যকার মন্তব্য করলেন যে আমাদের সম্ভবত ঘটনাটির পুনর্দৃশ্য বা রিপ্লে অবলোকন করা প্রয়োজন।
প্রথম ধারাভাষ্যকার তখন উচ্চস্বরে হেসে উত্তর দিলেন যে পুনর্দৃশ্য দেখার কোনো আবশ্যকতা নেই, কারণ তারা ইতিমধ্যে বুঝতে পেরেছেন ঠিক কী ঘটে চলেছে। অন্যদিকে এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের মুখ থেকেও হাসাহাসির শব্দ স্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছিল।
উপস্থিত দর্শকেরা তো এই ধরনের আবহ সংগীতের আকস্মিকতায় সম্পূর্ণ বিমোহিত ও বিস্মিত। মাঠে একজন ব্যাটার চোটগ্রস্ত হয়ে মাটিতে পড়ে আছেন, নিয়ম অনুযায়ী ব্যাকগ্রাউন্ডে কোনো হৃদয়বিদারক বিষাদের সুর বাজার কথা! তা না করে উল্টো হাসির গান বাজানো শুরু হলো, যা এই করুণ দৃশ্যটিকে সম্পূর্ণ একটি হাস্যরসাত্মক দৃশ্যে রূপান্তরিত করে দিল।
এই কারণে সেরা আবহ সংগীতের পুরস্কারটি যৌথভাবে অর্জন করে নিয়েছে প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড় ও ধারাভাষ্যকাররা। চতুর্থ এবং সর্বশেষ পর্যায়ে, লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট বা আজীবন সম্মাননার পুরস্কার অর্জন করেছেন সাকিব আল হাসান।
পুরো চলচ্চিত্রজুড়ে কোথাও এই তারকা ক্রিকেটারের ন্যূনতম উপস্থিতি না থাকলেও শেষ দুই ঘণ্টার ক্লাইম্যাক্সের অন্তিম তেরো মিনিট তিনি প্রতিটি দর্শকের মানসিক রাজ্যে ঠিকই কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিলেন। কারণ তিনি মাঠে সশরীরে উপস্থিত থাকলে যেকোনো মুহূর্তে কোনো না কোনো অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে যাওয়া অবধারিত।
তার সেই বিখ্যাত ‘টাইম আউট’, ‘ওয়াইড বিতর্ক’ কিংবা ‘স্টাম্প ভাঙার প্রলয়’ নামক অধ্যায়গুলো লক্ষ্য করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। সম্ভবত এই চলচ্চিত্রেও তার কোনো অভাবনীয় ঘটনাকে কেন্দ্র করে সম্পূর্ণ পৃথক একটি সিনেমা নির্মিত হতে পারত, যাকে চলচ্চিত্রের ভাষায় স্বতন্ত্র বা একক চলচ্চিত্র বলা হয়ে থাকে। তার এই অনুপস্থিতির বিষয়টিই তাকে এনে দিয়েছে এই বিশেষ সম্মাননা।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর