নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
আমাদের দেশের প্রায় সব এলাকাতেই ধর্মভীরু মুসলিমদের পাশাপাশি অন্য ধর্মের মানুষ প্রতিবেশী হিসেবে বসবাস করেন। অনেকেই বিভিন্ন উৎসবে তাদের কাছাকাছি গেলেও সংশয়ে ভোগেন যে ভিন্ন ধর্মের মানুষের সঙ্গে মিশলে ধর্মের কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না। অথচ ইসলামি সমাজে মানুষের সবচেয়ে নিকটজন হলেন প্রতিবেশী এবং তাদের অধিকারের ক্ষেত্রে মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে কোনো মৌলিক ভেদাভেদ করা হয়নি।
কোরআন ও হাদিসের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী অমুসলিম প্রতিবেশীর সঙ্গে একজন মুসলমানের আচরণ অত্যন্ত সুমধুর হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রতিবেশীর অধিকার এতটাই ব্যাপক যে ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) এ বিষয়ে বারবার মহানবীকে তাগিদ দিয়েছিলেন। এমনকি নবীজি মন্তব্য করেছিলেন যে জিবরাইলের তাগিদ দেখে তাঁর মনে হয়েছিল তিনি বুঝি প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারীই বানিয়ে দেবেন।
ইসলামি আইনশাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী প্রতিবেশীকে মূলত তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে আত্মীয় মুসলিম প্রতিবেশী যার তিনটি অধিকার রয়েছে, অনাত্মীয় মুসলিম প্রতিবেশীর রয়েছে দুটি অধিকার এবং অমুসলিম প্রতিবেশীর অন্তত একটি মৌলিক অধিকার অবশ্যপালনীয়, আর তা হলো প্রতিবেশীর হক। পবিত্র কোরআনের সুরা নিসার ৩৬ নম্বর আয়াতে নিকট ও দূর প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো ব্যবহারের সরাসরি নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
মুফাসসিরদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এই আয়াতে বর্ণিত 'দূর প্রতিবেশী' বলতে মূলত অমুসলিম প্রতিবেশীদেরই বুঝানো হয়েছে। সুতরাং ধর্ম ও বর্ণের কোনো ভেদাভেদ না রেখে যেকোনো প্রতিবেশীর সঙ্গেই উত্তম আচরণ প্রদর্শন করা প্রতিটি মুমিনের একটি আবশ্যিক ধর্মীয় দায়িত্ব। পারস্পরিক হৃদ্যতা ও ভালোবাসার বন্ধন সুদৃঢ় করার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হলো নিজেদের মাঝে উপহার ও খাবার বিনিময় করা।
প্রসিদ্ধ সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমরের গৃহে একবার একটি ছাগল জবাই করার পর তিনি তাঁর দাসকে একাধিকবার জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে তাদের ইহুদি প্রতিবেশীকে সেই পশুর গোশত পাঠানো হয়েছে কি না। এরপর তিনি প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কিত মহানবী (সা.)-এর সেই বিখ্যাত বাণীটি স্মরণ করিয়ে দেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে বাড়িতে ভালো কিছু রান্না হলে অমুসলিম প্রতিবেশীর ঘরে তা পাঠানো সাহাবিগণের সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।
অমুসলিম কোনো প্রতিবেশী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে দেখতে যাওয়া এবং বিপদে-আপদে সাধ্যানুযায়ী সাহায্য করা ইসলাম ধর্মের অন্যতম এক সুন্দর শিষ্টাচার। মদিনা শহরে এক ইহুদি বালক মহানবীকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করত এবং সে অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি নিজে তার গৃহে উপস্থিত হয়ে তার মাথার কাছে বসে শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিয়েছিলেন। একইভাবে কোনো অমুসলিম প্রতিবেশী যদি আর্থিক কিংবা সামাজিক কোনো সংকটে পতিত হন, তবে একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো সবার আগে তাঁর সহযোগিতায় এগিয়ে আসা।
ইসলাম ধর্মে যেকোনো মানুষকে কষ্ট দেওয়া অত্যন্ত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং প্রতিবেশী হওয়ার কারণে এর ভয়াবহতা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। মহানবী (সা.) পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে ব্যক্তির অনিষ্ট বা ক্ষতিকর আচরণ থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না, সেই ব্যক্তি কখনো জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। সংশ্লিষ্ট হাদিসটিতে 'প্রতিবেশী' শব্দটিকে কোনো রকম শর্ত বা বাধন ছাড়াই ব্যবহার করা হয়েছে।
এর অর্থ হলো প্রতিবেশী ব্যক্তি মুসলিম হোন কিংবা অমুসলিম—তাঁকে কোনো অবস্থাতেই শারীরিক, মানসিক বা সামাজিক উপায়ে কষ্ট দেওয়া যাবে না। অমুসলিম প্রতিবেশীদের জীবন, ধনসম্পদ এবং সামাজিক সম্মানের পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান করা প্রতিটি মুসলমানের অবশ্য পালনীয় ইমানি দায়িত্ব। পরিশেষে বলা যায়, অমুসলিম প্রতিবেশীদের সঙ্গে এই মানবিক ও সুন্দর আচরণ কেবল সামাজিক শিষ্টাচারের বিষয় নয়, বরং এটি ইসলামের অনুপম মহানুভবতা প্রচারের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর