ঢাকা | বঙ্গাব্দ

বলিউড অঙ্গনে ত্রাস সৃষ্টিকারী লরেন্স বিষ্ণোই ও তাঁর অপরাধ সাম্রাজ্যের বিস্তার

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 20, 2026 ইং
বলিউড অঙ্গনে ত্রাস সৃষ্টিকারী লরেন্স বিষ্ণোই ও তাঁর অপরাধ সাম্রাজ্যের বিস্তার ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

মুম্বাই নগরীর জুহু এলাকায় টাইগার শ্রফের গাড়িতে হামলার পর নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের নাম। এই সন্ত্রাসী ঘটনায় অভিনেতার গায়ে আঘাত না লাগলেও তাঁর গাড়িচালকসহ দুইজন গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর বিষ্ণোই গ্যাংয়ের পক্ষ থেকে বার্তা পাঠিয়ে কেবল টাইগারের ওপর হামলার দায় স্বীকার করা হয়নি, বরং সালমান খানের সঙ্গে কাজ করা অন্যান্য ব্যক্তিদেরও সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়েছে। যার ফলে একটি নির্দিষ্ট হামলার তদন্ত শুরুর পাশাপাশি চলচ্চিত্র জগতের চারপাশের এই অপরাধ নেটওয়ার্কের কার্যক্রম ফের সামনে চলে এসেছে।

সোমবার রাজস্থানের কোটা শহর থেকে এক অপ্রাপ্তবয়স্কসহ তিনজন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কোটার পুলিশ সুপার তেজস্বিনী গৌতম সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ সম্পন্ন করার পর তাঁদের মধ্যে একজনের সঙ্গে রেহান এবং বিষ্ণোইয়ের তথাকথিত সহযোগী অনিল পণ্ডিতের যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দায় স্বীকারের পোস্টটির সত্যতা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া স্বয়ং লরেন্স এই আক্রমণের নির্দেশ দিয়েছিলেন কি না, সে বিষয়টিও এখনো প্রমাণিত নয়।

১৯৯৩ সালে পাঞ্জাবের একটি গ্রামে জন্ম নেওয়া লরেন্স আবোহার অঞ্চলে শৈশব কাটিয়ে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে চণ্ডীগড়ে পাড়ি জমান। ডিএভি কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরবর্তীতে গোল্ডি ব্রারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। ছাত্রজীবনের বিভিন্ন সংঘর্ষ থেকে ধীরে ধীরে তাঁর নাম খুন, হত্যাচেষ্টা এবং চাঁদাবাজির মতো গুরুতর সব মামলায় জড়াতে শুরু করে। কারাবাস ও আটকের মাঝেও তিনি অন্যান্য অপরাধীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে গেছেন এবং কারাগারের বাইরে থাকা অনুসারীদের মাধ্যমে নিজের নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত করেছেন। অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে আনীত বহু অভিযোগ তিনি অস্বীকার করে আসছেন।

বর্তমানে লরেন্স গুজরাটের আহমেদাবাদ শহরের সবরমতি কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কঠোর বিধিনিষেধ থাকায় তাঁকে কারাগারের বাইরে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এমনকি অন্য কোনো তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকেও তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিশেষ আইনি অনুমতির প্রয়োজন হয়।

বলিউড অভিনেতা সালমানের সঙ্গে লরেন্সের এই চরম বৈরিতার মূল কারণ ১৯৯৮ সালের কৃষ্ণসার হরিণ শিকারের একটি ঘটনা। রাজস্থানে ‘হাম সাথ সাথ হ্যায়’ চলচ্চিত্রের দৃশ্যধারণের সময় সালমানের বিরুদ্ধে দুটি কৃষ্ণসার হরিণ হত্যার অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল। বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এই প্রাণীটি অত্যন্ত পবিত্র এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রয়েছে। ২০১৮ সালে আদালত ওই মামলায় অভিনেতাকে পাঁচ বছরের সাজা প্রদান করলেও তিনি পরবর্তীতে জামিনে মুক্ত হন। একই বছরে লরেন্স প্রকাশ্যে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেন। পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন দফতরে সালমানের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি এবং হত্যার হুমকি পাঠানো হয়েছে।

২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল মুম্বাইয়ের বান্দ্রা এলাকায় সালমানের গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টস ভবনের সামনে মোটরসাইকেলে চড়ে আসা দুই ব্যক্তি গুলিবর্ষণ করেন। পরবর্তীতে পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষ্যমতে, ওই আক্রমণটি বিষ্ণোই চক্রের সরাসরি নির্দেশে পরিচালিত হয়েছিল। লরেন্সের ভাই আনমোলের নামে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া বার্তায় ওই ঘটনাকে ভবিষ্যতের বড় আক্রমণের একটি পূর্বনির্ধারিত সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

একজন খ্যাতনামা গায়ককে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর বিনোদন দুনিয়ায় বিষ্ণোই চক্রের নাম অত্যন্ত জোরালোভাবে সামনে আসে, যা ঘটেছিল ২০২২ সালের ২৯ মে পাঞ্জাবি সংগীতশিল্পী সিধু মুসেওয়ালা হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। বিদেশ থেকে এই খুনের দায় নিজের কাঁধে নেন গোল্ডি ব্রার। ভারতের বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থাও উক্ত হত্যাকাণ্ডে বিষ্ণোইয়ের সহযোগীদের সরাসরি অভিযুক্ত করেছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ১২ অক্টোবর মুম্বাই শহরে খুন হন মহারাষ্ট্রের সাবেক মন্ত্রী বাবা সিদ্দিক। সালমানসহ চলচ্চিত্রের বহু প্রখ্যাত তারকার সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। হত্যাকাণ্ডের পর বিষ্ণোই গ্যাংয়ের নামে বার্তা পাঠিয়ে সালমানের সহযোগিতাকারীদেরও ভয়ভীতি দেখানো হয়। যার ফলে সালমানের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টি তাঁর কাছের মানুষদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও তীব্র উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এনডিটিভি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কানাডার সারে শহরে কপিল শর্মার ক্যাফেতে একাধিকবার বন্দুক হামলা চালানো হয়। একটি হামলার দায় স্বীকার করার বার্তার সঙ্গে সালমানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিষয়টিও জোরালোভাবে টেনে আনা হয়েছিল। এছাড়া চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে চলচ্চিত্র নির্মাতা রোহিত শেঠির জুহুর বাসভবনের বাইরেও গুলি চালানোর ঘটনার পর বিষ্ণোইয়ের সহযোগী পরিচয় দিয়ে দায় স্বীকার করার বার্তা পাঠানো হয়েছিল।

বিশিষ্ট তারকাদের ওপর একের পর এক আক্রমণ চালানো এবং পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে তার দায় স্বীকার করার এই পুরো প্রক্রিয়ায় শুধু আক্রমণ হওয়া ব্যক্তিকেই বার্তা দেওয়া হয় না, বরং সাধারণ মানুষ ও অন্যদের মাঝেও গভীর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ‘হু কিলড মুসেওয়ালা?’ নামক গ্রন্থের লেখক ও সাংবাদিক জুপিন্দরজিৎ সিং আল–জাজিরার কাছে দেওয়া বক্তব্যে এই পরিচিতি অর্জনের প্রক্রিয়া এবং ভীতি প্রদর্শনের অর্থনৈতিক দিকটি স্পষ্ট করেছিলেন। সিএনএনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও জেলখানা থেকে যোগাযোগ রক্ষা করা, বিদেশে অবস্থানরত সহযোগীদের সক্রিয় রাখা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার চালানোর মাধ্যমে অপরাধ সাম্রাজ্য বিস্তারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থার অভিযোগপত্র উদ্ধৃত করে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গ্যাংয়ের সদস্যদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান অত্যন্ত সীমিত রাখা হয়, যার ফলে একজন অপরাধী ধরা পড়লেও চক্রের বাকিদের চিহ্নিত করা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়ে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
মালদ্বীপকে হারিয়ে হ্যান্ডবল ফাইনালে বাংলাদেশ, সামনে ভার??

মালদ্বীপকে হারিয়ে হ্যান্ডবল ফাইনালে বাংলাদেশ, সামনে ভার??