নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে দুর্গাপূজা নিছক কোনো ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি আবেগ, ঐতিহ্য এবং পারস্পরিক মিলনের এক মহান উৎসব। অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে শুভ শক্তির বিজয়ের প্রার্থনা করার পাশাপাশি স্বজনদের সান্নিধ্যে আনন্দময় সময় কাটানোর উপলক্ষ এনে দেয় এই শারদীয় উৎসব। মুন্সিগঞ্জের বালাশুরের নাগরনন্দী ঘোষবাড়িতে উদযাপিত দুর্গাপূজা কেবল দেবীর আরাধনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি হয়ে ওঠে পরিবারের সব সদস্যের একত্র হওয়ার এক অনন্য মিলনমেলা। বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের স্বাধিকারের গ্রামের বাড়ির এই দুর্গাপূজা দেখতেই ঢাকা থেকে মোটরসাইকেলে প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে মুন্সিগঞ্জের বালাশুরের নাগরনন্দী ঘোষবাড়িতে উপস্থিত হয়েছিলেন সাংবাদিক ও আলোকচিত্রীরা।
নাগরনন্দী ঘোষবাড়িতে অতীতে বিক্ষিপ্তভাবে পূজা-পার্বণের প্রচলন থাকলেও পরিবারের সবাইকে একত্রিত করে একটি সুসংগঠিত দুর্গাপূজার যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে। পরিবারের আপন চৌদ্দ জন ভাই-বোন এবং তাঁদের আত্মীয়স্বজনের যৌথ উদ্যোগে শুরু হওয়া এই পারিবারিক উৎসবটি সময়ের প্রবাহে আরও ব্যাপক রূপ লাভ করেছে।
পূজার অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা প্রমীত কুমার ঘোষের ভাষ্যমতে, পরিবারের অধিকাংশ সদস্যই বর্তমান সময়ে শহরকেন্দ্রিক যান্ত্রিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। জীবিকার তাগিদে সবার ব্যস্ততা থাকায় আগের মতো একসঙ্গে গ্রামের বাড়িতে সময় কাটানোর সুযোগ অনেকটাই কমে গিয়েছিল। সেই দূরত্বের ব্যবধান কমিয়ে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সুসম্পর্ক ও পরিচয় আরও সুদৃঢ় করার ভাবনা থেকেই মূলত এই পূজার গোড়াপত্তন হয়েছিল। প্রমীত কুমার ঘোষ আরও জানান, একদম ছোট পরিসরে হলেও গ্রামের বাড়িতে একটি পূজা শুরু করা উচিত—এমন যৌথ ইচ্ছার আলোকেই সবাই আলোচনা সাপেক্ষে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। জ্যাঠাতো ও কাকাতো ভাই-বোন, পিসি, পিসির ছেলে এবং জামাইবাবুলহ সকল আত্মীয়স্বজনকে সঙ্গে নিয়েই এই জমজমাট আয়োজনের সূচনা ঘটেছিল।
তাঁদের পারিবারিক হিসাব অনুযায়ী, ঠাকুরদার প্রজন্ম থেকে বর্তমানের তরুণেরা চতুর্থ প্রজন্মের উত্তরসূরী হিসেবে এই ধারা বজায় রাখছেন। বহু আগে থেকেই এই বাড়িতে বিচ্ছিন্নভাবে পূজা হয়ে আসলেও ২০১৫ সাল থেকেই পরিবারের সকলে মিলে একযোগে বড় পরিসরে দুর্গোৎসব উদ্যাপন করে আসছেন। তবে এই সুদীর্ঘ পথচলার যাত্রা সবসময় মসৃণ বা বাধাহীন ছিল না। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া করোনাকালের সময়ে তাঁদের এই পূজার আয়োজন অনেকটাই সীমিত রাখতে হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে দেশের সামগ্রিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে উৎসবের পরিসর এবং পরিকল্পনা নিয়েও তাঁদের নতুন করে ভাবতে হয়েছে। এত সব প্রতিকূলতার মাঝেও পারিবারিক ঐক্য, সংহতি ও শত বছরের ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার তীব্র আকাঙ্ক্ষাই তাঁদের পূজার এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে সাহায্য করেছে।
প্রতিবছরই নাগরনন্দী ঘোষবাড়ির দুর্গোৎসবে বিশেষ কোনো বিষয় বা থিমকে প্রধান্য দেওয়া হয়ে থাকে। এ বছরের পূজার মূল ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে ‘সম্প্রীতির বাংলাদেশ’ নামক প্রত্যয়টি। মসজিদ, মন্দির ও গির্জার অত্যন্ত নান্দনিক প্রতীকী উপস্থাপনার মাধ্যমে তাঁরা সমাজে ধর্মীয় সহাবস্থান এবং একে অপরের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের গুরুত্ব ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্র ও বিশ্বাস অনুযায়ী দেবী দুর্গা হলেন শক্তি, সাহস এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবীর বীরত্বপূর্ণ বিজয়ের কাহিনি যুগে যুগে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার চিরন্তন বাণী বহন করে নিয়ে চলে। সেই শাশ্বত ভাবনার সঙ্গে সম্প্রীতির এই মহান বার্তা যুক্ত হয়ে এবারের আয়োজনকে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্বের আসনেও আসীন করেছে।
এই পূজার আরেক অন্যতম উদ্যোক্তা দীপক কুমার ঘোষের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছরই তাঁদের এই বিশেষ পূজা উপভোগ করতে দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ ছুটে আসেন। মুন্সিগঞ্জ সদর ছাড়াও প্রমোদময় পদ্মার ওপার থেকেও অনেক দর্শনার্থী এই বর্ণিল আয়োজন দেখতে উপস্থিত হন। এবারের উৎসবেও বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটবে বলে তাঁরা আশাবাদী। প্রতিমার নান্দনিক সাজসজ্জার ক্ষেত্রেও রয়েছে দারুণ এক বিশেষত্ব। দীপক কুমার ঘোষ জানান, তাঁদের প্রতিমার মহামূল্যবান অলংকার এবং সাজসজ্জার নানা সামগ্রী ঐতিহ্যবাহী কলকাতার কুমারটুলি থেকে সংগ্রহ করা হয়। এই প্রাচীন শিল্পাঞ্চলের প্রতিমাশিল্প ও সাজসজ্জার চমৎকার বৈচিত্র্যই তাঁদের পারিবারিক আয়োজনকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও আকর্ষণীয় রূপ দিতে সাহায্য করে থাকে।
এটি একটি একান্ত পারিবারিক উদ্যোগ হওয়া সত্ত্বেও নাগরনন্দী ঘোষবাড়ির দুর্গোৎসবের সামগ্রিক আয়োজন বেশ বড় এবং ব্যয়বহুল। পূজার প্রতিমা তৈরি, আকর্ষণীয় মণ্ডপসজ্জা, নানান ধর্মীয় আচার পালন, আমন্ত্রিত অতিথিদের আপ্যায়ন এবং ভক্তদের মাঝে প্রসাদ বিতরণ—সব মিলিয়ে এর খরচও বেশ চড়া। উদ্যোক্তা দীপক কুমার ঘোষের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য অনুযায়ী, গত বছরের দুর্গাপূজায় তাঁদের মোট ব্যয় হয়েছিল বিশ লাখ টাকার কিছু বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, এ বছরের আয়োজনে সেই ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় পঁচিশ লাখ টাকায় গিয়ে ঠেকবে। পরিবারের বিভিন্ন শাখার সদস্যরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী আর্থিক অনুদান ও কায়িক শ্রম দিয়ে এই বিশাল আয়োজনের সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করে থাকেন। পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকেও নানা সহযোগিতা পাওয়া যায় এবং এ বছর সরকারিভাবে প্রায় ছয়শত কেজি চাল বরাদ্দ হিসেবে পেয়েছেন তাঁরা।
শুধু পরিবারের সদস্যরা নন, বরং এলাকার মুসলিম প্রতিবেশী ও বন্ধুরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনুদান দিয়ে এই আয়োজনে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে থাকেন। এই আন্তরিক সহযোগিতা ঘোষবাড়ির পূজাকে কেবল একটি নির্দিষ্ট পরিবারের গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখেনি, বরং স্থানীয় প্রতিবেশীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে তা এক বৃহত্তর সামাজিক বন্ধনের মেলবন্ধনে পরিণত হয়েছে। যেকোনো ধর্মীয় উৎসবের আয়োজনে মানুষের এই পারস্পরিক মেলবন্ধন ও সহযোগিতা যে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ, ঘোষবাড়ির পূজা তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
দুর্গাপূজার অন্যতম প্রধান আনন্দের খোরাক হলো মুখরোচক প্রসাদ। পূজার নানামুখী মন্ত্রোচ্চারণ, দেবীর পুজো এবং মহাসমারোহে অঞ্জলি দেওয়ার পর ভক্তদের মাঝে প্রসাদ বিতরণের মাধ্যমেই এই উৎসবের আনন্দ পরিপূর্ণতা লাভ করে। ঘোষবাড়ির ঐতিহ্যবাহী পূজাতেও প্রসাদ বিতরণের এই আয়োজনের রয়েছে এক বিরাট পরিসর। উদ্যোক্তাদের সুনির্দিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, মহাষ্টমী থেকে শুরু করে মহানবমী ও বিজয়া দশমী পর্যন্ত প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার মানুষ এই পূজায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। প্রসাদ বিতরণের ব্যাপকতা সম্পর্কে দীপক কুমার ঘোষের ধারণা অনুযায়ী, সব মিলিয়ে প্রায় ষোলো হাজার ভক্ত প্রাণভরে এই প্রসাদ গ্রহণ করবেন। দেবীকে অঞ্জলি দেওয়ার পর শুরু হয়ে গভীর রাত পর্যন্ত এই প্রসাদ বিতরণের কাজ একটানা চলতে থাকে। ভুনা খিচুড়ি, সুস্বাদু ছানাপোড়া, লুচি, সুজি, হালুয়া, নানা স্বাদের নাড়ু, বিভিন্ন জাতের ফলমূল ও মিষ্টি থাকে তাঁদের এই রাজকীয় আয়োজনের খাবারের তালিকায়।
এমনকি বিজয়া দশমীর দিনেও লাড্ডু, নাড়ু এবং হরেক রকমের মিষ্টির আয়োজন বলবৎ থাকে। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী প্রসাদ কেবল সাধারণ কোনো খাবার নয়; বরং এটি হলো দেবীর উদ্দেশে নিবেদন করা পবিত্র নৈবেদ্য, যা পরবর্তীতে ভক্তদের মাঝে পরম যত্নে বিতরণ করা হয়। এই প্রসাদ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়েই মূলত পূজার অনাবিল আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে শত শত মানুষের মাঝে। পরিচিত ও অপরিচিত মানুষ, দূর সম্পর্কের আত্মীয় এবং কাছের প্রতিবেশী—সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই উৎসবের পরিধি দিন দিন আরও বিস্তৃত হয়ে উঠছে।
পূজার আয়োজনের সামনের সারিতে কেবল দৃষ্টিনন্দন প্রতিমা আর চাকচিক্যময় মণ্ডপই দৃশ্যমান থাকে, কিন্তু এর নেপথ্যে কাজ করে পরিবারের সদস্যদের অসামান্য ও নিরলস পরিশ্রম। বিশেষ করে নারী সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ ঘোষবাড়ির এই পূজার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ও ভিত্তি। পরিবারের অন্যতম সদস্য ত্রয়ী ঘোষ জানান, পূজার যাবতীয় কার্যক্রমে পরিবারের প্রতিটি নারী ও পুরুষ হাতে হাত রেখে সমানভাবে কাজ করেন। তাঁর প্রয়াত বড়মা অতীতে মণ্ডপের নানা গুরুদায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করতেন। করোনাকালের সময়ে তাঁর আকস্মিক প্রয়াণ ঘটলেও তিনি যে সমস্ত নিয়ম ও রীতিনীতি শিখিয়ে গেছেন, তা অনুসরণ করেই বর্তমানে পূজার সমস্ত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পরিবারের কন্যারা মণ্ডপ চমৎকারভাবে সাজানো, সুস্বাদু নাড়ু-মোয়া তৈরি এবং পূজার প্রয়োজনীয় সমস্ত সামগ্রী নিখুঁতভাবে প্রস্তুত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিজেদের নিয়োজিত রাখেন। তাঁদের এই নিঃস্বার্থ শ্রম ও মেধার মধ্য দিয়েই এক প্রজন্মের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত সফলভাবে স্থানান্তরিত হয় পরবর্তী প্রজন্মের কাছে।
যেকোনো দেশের অমূল্য ঐতিহ্য তখনই দীর্ঘস্থায়ী হয়, যখন দেশের নতুন প্রজন্ম সেই ঐতিহ্যকে নিজেদের হৃদয়ে ধারণ করে আপন করে নেয়। নাগরনন্দী ঘোষবাড়ির এই জমজমাট পূজায় শিশু ও কিশোরদের উপচে পড়া আগ্রহ ও উৎসাহ ভবিষ্যতের সেই উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথাই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর