ঢাকা | বঙ্গাব্দ

টিন্ডারের ডেটে তরুণী খুন, নেপথ্যে ভ্যাম্পায়ার চক্র ও জাদুবিদ্যা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 26, 2026 ইং
টিন্ডারের ডেটে তরুণী খুন, নেপথ্যে ভ্যাম্পায়ার চক্র ও জাদুবিদ্যা ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

অনলাইন ডেটিং অ্যাপ টিন্ডারের সূত্রে পরিচিত হয়ে ডেটে যাওয়ার পর ২৪ বছর বয়সী সিডনি লুফের নিখোঁজ হওয়া এবং পরবর্তীতে লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে নির্মিত হয়েছে তিন পর্বের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হুলুর ট্রু ক্রাইম সিরিজ ‘সোয়াইপ রাইট অন দ্য ডেভিল’। ২০১৭ সালে ঘটে যাওয়া এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বেরিয়ে আসে কথিত জাদুবিদ্যা, ভ্যাম্পায়ার পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তির প্রতারণা, যৌন নির্যাতন এবং ভয়ংকর সব নিয়ন্ত্রণের কৌশল। সিরিজটিতে বক্তব্য দিয়েছেন ওই গোপন গোষ্ঠী থেকে পালিয়ে বাঁচতে সক্ষম হওয়া তিনজন নারী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং নিহত সিডনির পরিবারের সদস্যরা।

যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কা অঙ্গরাজ্যের লিংকন শহরের বাসিন্দা সিডনি লুফে স্থানীয় একটি হার্ডওয়্যারের দোকানে চাকরি করতেন। ২০১৭ সালের দিকে টিন্ডারে ‘অড্রে’ নামের এক নারীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং পরপর দুই দফা সাক্ষাতের পর ১৫ নভেম্বর তাঁরা দ্বিতীয় ডেটে বের হন, যেখান থেকে তিনি আর নিজগৃহে ফেরেননি। পরদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় সহকর্মীদের মনে সন্দেহের উদ্রেক ঘটে এবং তাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করেন। পুলিশ সিডনির বাসভবনে তল্লাশি চালিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত পার্স ও গাড়ি অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করলেও তাঁর কোনো সন্ধান পায়নি, ফলে দ্রুতই তাঁর নিখোঁজ হওয়ার সংবাদটি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

সিডনির এক পরিচিত বন্ধু অড্রেকে খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে টিন্ডারে একটি ভুয়া প্রোফাইল তৈরি করেন, যার মাধ্যমে তদন্তকারীরা নিশ্চিত হন যে ওই ‘অড্রে’ আসলে বেইলি বসওয়েল নামের ২৩ বছর বয়সী এক নারী। এরই ধারাবাহিকতায়, ৪ ডিসেম্বর গ্রামীণ এলাকার ক্লে কাউন্টির একটি মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী স্থান থেকে ময়লার ব্যাগের ভেতর থেকে সিডনির খণ্ডিত দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়; তাঁর মৃতদেহটি চৌদ্দ টুকরো করা হয়েছিল এবং একটি বাহুর উপরিভাগসহ বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ অঙ্গ অনুপস্থিত ছিল। এই পৈশাচিক ঘটনা উদঘাটন করতে গিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা আরও একাধিক নারীর ওপর চালানো ভয়ংকর নির্যাতনের চাঞ্চল্যকর তথ্য জানতে পারেন।

তদন্তে বেরিয়ে আসে এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম হোতা ৫১ বছর বয়সী অউব্রে ট্রেইলের নাম, যিনি নিজেকে ভ্যাম্পায়ার হিসেবে জাহির করতেন এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে তাঁর বিরুদ্ধে চুরি ও আর্থিক প্রতারণার বহুমুখী ইতিহাস রয়েছে। ট্রেইল ও বসওয়েল মিলে টিন্ডারের মাধ্যমে বিভিন্ন নারীকে টার্গেট করে তাঁদের নিজেদের গোপন গোষ্ঠীতে ভিড়াতেন, যে গোষ্ঠীকে তাঁরা জাদুবিদ্যার চর্চাকারীদের পরিভাষায় ‘কোভেন’ বলে উল্লেখ করতেন। বিশের কোঠায় বয়স এমন তিনজন নারী আদালতে নিজেদের সাক্ষ্য দেওয়ার পাশাপাশি তথ্যচিত্রটিতেও তাঁদের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন।

ওই নারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বসওয়েলের সঙ্গে প্রাথমিক পরিচয়ের পর ট্রেইলের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হতো এবং বিলাসবহুল পোশাক, স্পা সেবা, মাদক ও নিয়মিতভাবে সপ্তাহে ১৫০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত আর্থিক প্রলোভন দেখানো হতো। এর বিনিময়ে তাঁদের প্রধান কাজ ছিল ট্রেইল ও বসওয়েলের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া এবং বিভিন্ন স্থান থেকে চুরি করা মালামাল বিক্রির কাজে সাহায্য করা। ট্রেইল দাবি করতেন যে তাঁর অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা রয়েছে, তিনি শূন্যে উড়তে পারেন এবং মানুষের মনের কথা পড়তে সক্ষম। গোষ্ঠীর নারী সদস্যদের ‘ডাইনি’ হিসেবে অভিহিত করে সমস্ত কঠোর নিয়ম মানতে বাধ্য করা হতো।

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় ছিল এই গোষ্ঠীর সুদূরপ্রসারী হত্যার পরিকল্পনা, যেখানে ট্রেইল বলেছিলেন যে নিজের অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তোলার উদ্দেশ্যে কোনো মানুষকে নির্যাতন করে খুন করতে হবে। শুধু তাই নয়, সেই হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য ভিডিও ধারণ করে তা থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জনের পরিকল্পনাও করা হয়েছিল, তবে সিডনি খুন হওয়ার আগেই ওই তিন নারী সাহসিকতার সঙ্গে গোষ্ঠীটি ত্যাগ করে পালিয়ে আসেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা ট্রেইল ও বসওয়েলের আবাসিক ঠিকানায় অভিযান চালিয়ে ডাক্ট টেপ, জিপ টাই, কুঠার, রক্তমাখা প্লাস্টিকের শিট, বিশেষ ধরনের পোশাক এবং একটি রহস্যজনক বই উদ্ধার করেন। তথ্যচিত্রে অংশ নেওয়া বেঁচে ফেরা এক নারী জানান, ট্রেইল তাঁদের জানিয়েছিলেন যে তাঁদের এই বিশেষ গোষ্ঠীতে মোট বারোজন নারী সদস্য রয়েছেন এবং নির্দিষ্ট আচার সম্পন্ন করার জন্য ত্রয়োদশ নারীর প্রয়োজন ছিল। আরেক নারী জানান, গোষ্ঠীর নিয়মানুযায়ী ট্রেইলের সামনে সম্পূর্ণ নগ্ন থাকতে হতো এবং অন্যান্য নারীদের সঙ্গে তাঁর যৌন ক্রিয়াকলাপও দাঁড়িয়ে দেখতে হতো।

তথ্যচিত্রের পরিচালক ও নির্বাহী প্রযোজক ব্রায়ান বিগেলের মতে, এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল একজন সিডনির খুনের গল্প নয়, বরং এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে এমন কিছু তরুণীর ভাগ্য, যাঁরা মূলত ভালোবাসা ও সম্পর্কের সন্ধানে গিয়ে চরম প্রতারণার জালে আটকা পড়েছিলেন। বিগেল উল্লেখ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল মধ্য–পশ্চিমাঞ্চলীয় সমাজের সমকামী সম্পর্কের ক্ষেত্রে একাকী জীবনযাপন এবং সামাজিক নানা বাধার মুখে পড়া নারীদের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়েছিলেন বসওয়েল ও ট্রেইল, যাঁরা টিন্ডারের মাধ্যমে তাঁদের ধীরে ধীরে ফাঁদে ফেলতেন।

আদালত প্রাঙ্গণে বিচার চলাকালে সিডনিকে হত্যার দায় স্বীকার করলেও ট্রেইল দাবি করেছিলেন যে হত্যাকাণ্ডটি কোনো পূর্বপরিকল্পিত ঘটনা ছিল না। তাঁর দাবি অনুযায়ী, পারস্পরিক সম্মতিতে সংঘটিত এক যৌন আচারের সময় এক্সটেনশন কর্ডের প্যাঁচ লেগে সিডনির গলার শ্বাসনালীতে চাপ পড়েছিল এবং পরবর্তীতে পুলিশের ভয়ে ধরা পড়ার আশঙ্কায় তিনি মরদেহটি টুকরো টুকরো করেছিলেন। একই সঙ্গে ট্রেইল দাবি করেন যে এই খুনের ঘটনায় বসওয়েলের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।

যদিও তদন্তে উদ্ধারকৃত বিভিন্ন খুদে বার্তায় দেখা যায়, ট্রেইল বসওয়েলকে নিজের ওপর দোষ চাপাতে এবং নিজেকে অসহায় ভুক্তভোগী হিসেবে প্রমাণ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। বিচার চলাকালীন আদালতের ভেতরে বসওয়েলকে বেকসুর খালাস ঘোষণা করার পর ট্রেইল হঠাৎ ধারালো অস্ত্র দিয়ে নিজের গলায় আঘাত করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান এবং তাঁকে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। বিচার প্রক্রিয়া চলাকালে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া ছাড়াও স্ট্রোকেও ভুগেছিলেন বলে নথিপত্রে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তীতে তিনি নিজের আগের বক্তব্য সম্পূর্ণ বদলে ফেলে জানান যে, তাঁর লাইফস্টাইল ফাঁস করে দেওয়ার আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিতেই সিডনিকে হত্যা করা হয়েছিল।

হত্যা, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং মানবদেহের অবশিষ্টাংশ বেআইনি পন্থায় লুকানোর গুরুতর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় ট্রেইলকে ২০২১ সালের ৯ জুন মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়, যার বিরুদ্ধে করা আপিল ২০২৫ সালে খারিজ হয়ে যায়। অন্যদিকে, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বসওয়েলের বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয় এবং সিডনির খণ্ডিত দেহাবশেষের ব্যাগে পাওয়া একটি ল্যাটেক্স গ্লাভস থেকে তাঁর ডিএনএ শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি আদালতে জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হয়। ওই বছরের অক্টোবরে বসওয়েলও সমস্ত অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন এবং ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে তাঁকে আমৃত্যু যাবর্গজীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।

পরিচালক ব্রায়ান বিগেল দীর্ঘ তিন বছর সময় ব্যয় করে সিডনি হত্যাকাণ্ডের এই ঘটনার ওপর নিবিড় গবেষণা পরিচালনা করেন। দণ্ডিত অপরাধী ট্রেইলের সঙ্গে একটানা এক বছর ধরে যোগাযোগ রেখে তাঁর আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি সেসব বেঁচে ফেরা নারীদের সঙ্গেও দীর্ঘ আলাপ করেন, যাঁরা এর আগে আদালতে সাক্ষ্য দিলেও নিজেদের জীবনের এই মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা কখনো এত বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করেননি।

তথ্যচিত্রটির নির্বাহী প্রযোজক ক্রিস্টোফার সেন্ট জন ব্যাখ্যা করেন যে, মামলার নথিপত্রে এত বিশাল পরিমাণ তথ্য ও উপাদান বিদ্যমান ছিল যে তা একটিমাত্র পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে ধারণ করা মোটেও সম্ভব ছিল না। আর তাই সামগ্রিক ঘটনাটিকে দর্শকদের সামনে নির্ভুলভাবে তুলে ধরার জন্য তিন পর্বের একটি তথ্যচিত্র হিসেবে সাজানোর কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

পরিচালকের সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই ডকুমেন্টারিটি মূলত কে খুনি—সেই রহস্য উদঘাটনের গল্প নয়, বরং এমন একটি পৈশাচিক ঘটনা কেন সংঘটিত হলো, তারই গভীর অনুসন্ধান। অনলাইন ডেটিং প্ল্যাটফর্মের প্রসার, মানুষের ব্যক্তিগত একাকীত্ব, লাগাতার প্রতারণা এবং অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার মিথ্যে আড়ালে অন্যকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করার অন্ধ প্রবণতা—সব মিলিয়ে এই হত্যাকাণ্ড মানবসমাজকে এক বিশাল ও জটিল প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটিতে বিশ্বজুড়ে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ

পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটিতে বিশ্বজুড়ে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ