নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ওয়েবসাইট তৈরি ও পরিচালনার ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত অন্যতম প্রধান প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ পিএইচপিতে সম্প্রতি দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হয়েছে। এই ত্রুটিগুলো সামনে চলে আসার পর থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ত্রুটির খবর প্রকাশিত হওয়ার পর গত বুধবার রাত থেকেই বিশ্বব্যাপী বহু দেশ ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তাদের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। আর এই কার্যক্রমের মধ্যেও লাখ লাখ সাইবার হামলার বা হ্যাকিংয়ের চেষ্টা চালানো হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
এইচটিএমএল কিংবা পাইথনের মতো পিএইচপি বর্তমান ডিজিটাল বিশ্বে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। পিএইচপির ডেভেলপাররা গত বুধবার এই দুটি নিরাপত্তা ত্রুটি নিরাময় করার উদ্দেশ্যে একটি নতুন হালনাগাদ সংস্করণ অবমুক্ত করেন। বিশেষ উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে পিএইচপির ভেতরে লুকিয়ে থাকা এই ত্রুটিগুলো সফলভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। একই সঙ্গে সাধারণ ব্যবহারকারী ও সংশ্লিষ্টদের এই ল্যাঙ্গুয়েজটি দ্রুত হালনাগাদ করে নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়।
বেলজিয়ামের পরিচিত সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান আইকিডো সিকিউরিটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ম্যাডেলিন লরেন্স এই বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, ত্রুটিগুলো সফলভাবে সংশোধন করে পিএইচপির আনুষ্ঠানিক হালনাগাদ সংস্করণ আসার আগেই এই দুর্বলতা সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্যগুলো সবার সামনে চলে আসে। এরপর থেকেই হ্যাকাররা ত্রুটিগুলোকে হাতিয়ার বানিয়ে ওয়েবসাইটের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার জন্য সাইবার হামলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আক্রমণকারীরা যাতে এই সফটওয়্যার ত্রুটির সুযোগ নিতে না পারে, সেজন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তাদের ওয়েবসাইটগুলো হালনাগাদ করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
ওয়েবসাইটগুলো সুরক্ষার জন্য যখন দ্রুত হালনাগাদ করার প্রচেষ্টা চলছে, ঠিক সেই সময়ই লাখ লাখ হ্যাকিংয়ের চেষ্টা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বখ্যাত ক্লাউড সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ক্লাউডফ্লেয়ার। বুধবার প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ম্যাথিউ প্রিন্স গণমাধ্যমকে জানান, নিরাপত্তা ত্রুটির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরবর্তী মাত্র ৪৫ মিনিটের মধ্যেই সাইবার হামলার চেষ্টা বেড়ে কয়েক হাজারে গিয়ে ঠেকে। এরপর মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে এই আক্রমণের সংখ্যা কয়েক লাখে পৌঁছায় এবং বর্তমানে তা আরও অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
জাপানের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছে যে, তারা জরুরি নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবে সাময়িকভাবে তাদের কিছু অনলাইন সেবা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। জাপানের যেসব প্রতিষ্ঠান এই ব্যবস্থার আওতায় এসেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বনামধন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান মিতসুবিশি ইউএফজে ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপ, শীর্ষস্থানীয় উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থা এএনএ এবং ইস্ট জাপান রেলওয়ে। এছাড়া জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয় এবং দেশের আবহাওয়া সংস্থাও তাদের অনলাইন সেবাগুলোর কার্যক্রম সীমিত করে দিয়েছে।
অন্যদিকে ইউরোপের দেশ ফ্রান্সের অন্যতম প্রধান টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান অরেঞ্জ জানিয়েছে যে, তারা সতর্কতা মূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অংশ হিসেবে তাদের কিছু সহযোগী প্রতিষ্ঠানের পিএইচপিভিত্তিক ওয়েবসাইট ও সফটওয়্যারে প্রবেশাধিকার সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। এ ছাড়াও এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের অন্যতম বড় ক্লাউড কম্পিউটিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান টেনসেন্ট ক্লাউডও তাদের গ্রাহকদের অবিলম্বে পিএইচপির নতুন হালনাগাদ সংস্করণ ব্যবহার করার জোরালো পরামর্শ প্রদান করেছে।
পিএইচপির কোডে এমন মারাত্মক নিরাপত্তাত্রুটি ধরা পড়ার কারণে ডিজিটাল বিশ্বে যে বড় ধরনের দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে, তাকে ইন্টারনেট সচল রাখার কাজে ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং প্রযুক্তির ইতিহাসে একটি অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষা বলে অভিহিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এই সমগ্র পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্ট মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও সত্য নাদেলা গত বুধবার মন্তব্য করেছেন যে, দীর্ঘ একটি সময়ের ব্যবধানে এমন ধরনের ঘটনা তিনি আগে কখনো দেখেননি। তিনি আরও যোগ করেন যে, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বজায় রেখে নিরাপদে রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব—এমন একটি উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামো বা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা এই ঘটনা আমাদের সামনে আরও একবার স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
জার্মানির স্বনামধন্য সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ফ্রাউনহোফের ইনোভেশন প্ল্যাটফর্মের সায়েন্টিফিক পরিচালক হায়া শ্কুলম্যান বর্তমান পরিস্থিতিকে গত দুই বছরের মধ্যে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে গুরুতর সাইবার ঘটনাগুলোর অন্যতম বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বর্তমান ডিজিটাল জগতের এই ঝুঁকিগুলোকে সম্পূর্ণ বাস্তব বলে অভিহিত করেছেন এবং যেকোনো ধরনের বড় বিপর্যয় এড়াতে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ত্রুটি সংশোধনের জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর