নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মানবজীবন মূলত একটি সুদীর্ঘ পথচলা। এই সুদীর্ঘ যাত্রাপথে মানুষ নানা আয়োজনে মেতে ওঠে, বুক বাঁধে অজস্র স্বপ্নে এবং লক্ষ্য অর্জনে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যায়। কেউ জীবনভর ঘাম ঝরিয়ে প্রকাণ্ড অট্টালিকা নির্মাণ করেন, কেউবা পাহাড়সম অর্থ-সম্পদ সঞ্চয় করেন, আবার কেউ সম্মান ও খ্যাতির পেছনে আমৃত্যু ছোটাছুটি করেন।
প্রিয়জন, পরিবার ও আত্মীয়স্বজন পরিবেষ্টিত হয়েই মানুষের জীবনের দিনগুলো অতিবাহিত হয়। এতসব কর্মযজ্ঞের ভিড়ে মানুষ প্রায়ই এই চরম বাস্তবতাকে ভুলে যায় যে পার্থিব এই পথচলা কোনোভাবেই চিরস্থায়ী নয়।
একটি নির্দিষ্ট সময় পর জীবনের সমস্ত কোলাহল স্তব্ধ হয়ে আসে এবং অস্তিত্বের হিসাব মেলাতে হয়। পার্থিব সবকিছু পেছনে ফেলে রেখে সম্পূর্ণ একা একাকী মানবসন্তানকে সেই অন্তহীন যাত্রার পথে পা বাড়াতে হয়।
মৃত্যুর দুঃসংবাদ পেয়ে চারপাশের আপনজনেরা ছুটে আসেন। কেউ শোকে পাথর হয়ে যান, কেউ মৃত ব্যক্তির মুখপানে চেয়ে নীরবে অশ্রুপাত করেন, আবার কেউ অতীতে কাটানো মধুর স্মৃতিগুলো রোমন্থন করেন। দীর্ঘকাল যিনি হাসিমুখে সবার সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন, সংসারের সব গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন এবং আগামী দিনের কত না পরিকল্পনা করেছেন, আজ তাকে শেষ পর্যন্ত মাটির সান্নিধ্যে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। পড়ে থাকে তার প্রিয় আবাসস্থল, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, অসম্পূর্ণ কাজ এবং অজস্র স্মৃতিচিহ্ন।
এরপরই মানুষের জীবনপ্রবাহে উন্মোচিত হয় সম্পূর্ণ নতুন এক অধ্যায়। মৃত্যু যে অবধারিত ও অটল সত্য, সে বিষয়ে পবিত্র কোরআনের সুরা আলে ইমরানের ১৮৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে, প্রত্যেক প্রাণীকে সুনিশ্চিতভাবে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে।
এই ধ্রুব সত্য জেনেশুনেও মানুষ অনেক সময় এমন উদাসীন জীবন যাপন করে, যেন এই ধরিত্রীই তার স্থায়ী আবাসস্থল। অথচ একদিন সবকিছু চিরতরে ত্যাগ করে চলে যেতে হবে। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, ইহকালের মায়া কাটিয়ে ওপারের যাত্রায় মানুষের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত কী অবতীর্ণ হবে?
হাদিস শরিফে জীবনের এই গভীর ও নির্মম বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মানুষ যাদের জন্য এত ভালোবাসে এবং সারাজীবন কঠোর পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করে, সেই আপনজনেরাই একসময় তাকে কবরে একা ফেলে রেখে নিজগৃহে ফিরে আসে। যে ধনসম্পদ জমানোর পেছনে মানুষ তার জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করে, তা পুরোটাই পৃথিবীতে পড়ে থাকে।
পরকালের অনন্ত যাত্রায় একমাত্র মানুষের আমলই তার সত্যিকারের সঙ্গী হিসেবে অবতীর্ণ হয়।
এই প্রসঙ্গে প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন যে, মৃত ব্যক্তির পেছন পেছন তিনটি জিনিস যায়। যার মধ্যে দুটি জিনিস পুনরায় ফিরে আসে এবং কেবল একটি জিনিস তার সঙ্গে স্থায়ীভাবে থেকে যায়। সেই তিনটি বিষয় হলো তার পরিবার, তার সম্পদ এবং তার আমল। অতঃপর তার পরিবার ও সম্পদ দুনিয়ায় ফেরত আসে, আর তার সৎকর্ম বা আমল তার সঙ্গে চিরতরে থেকে যায়। সহিহ বুখারি শরিফের ৬৫১৪ নম্বর হাদিসে এই অমূল্য বাণী বর্ণিত হয়েছে।
পার্থিব জীবনে পদমর্যাদা, খ্যাতি, সামাজিক পরিচয় এবং সম্পদের বিপুল প্রভাব ও গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর পরবর্তী অন্তহীন জীবনে এসবে কারোরই বিন্দুমাত্র মুক্তির ক্ষমতা নেই। মহান আল্লাহর দরবারে বান্দার ইমান ও নেক আমলই একমাত্র বিচার্য বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে। মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে ঘটে যাওয়া অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সৎকর্মটিও আল্লাহর সুক্ষ্ম রেকর্ডে সংরক্ষিত থাকে।
পবিত্র কোরআনের সুরা জিলজালের ৭ ও ৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন যে, কোনো ব্যক্তি অণু পরিমাণ সৎকর্ম সম্পন্ন করলেও সে তা দেখতে পাবে, ঠিক তেমনি কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলেও তাও তার চোখের সামনে উন্মোচিত হবে।
স্রষ্টার প্রতি পূর্ণ ভীতি ও সচেতনতা বজায় রেখে তাঁর যাবতীয় নির্দেশাবলি মেনে চলা এবং সমস্ত নিষিদ্ধ কাজ থেকে দূরে থাকা প্রত্যেক মুমিনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। নির্ধারিত নামাজ আদায়, রোজা পালনসহ অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি সততা, আমানত রক্ষা করা, সুন্দর চরিত্র গঠন এবং সাধারণ মানুষের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করাও মুমিন জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ। এসব সৎ কাজের মাধ্যমেই মূলত আখিরাতের আসল পাথেয় অর্জিত হয়।
মৃত্যুর পরের জীবন সুদীর্ঘ ও অনন্ত, আর সেই চিরস্থায়ী জীবনের পাথেয় গুছিয়ে নেওয়ার একমাত্র সুবর্ণ সুযোগ কেবল এই পার্থিব জীবনকেই ঘিরে আবর্তিত হয়। যে কারণে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ মানবজাতিকে পরকালের সম্বল বা পাথেয় সংগ্রহের জন্য কঠোর নির্দেশ প্রদান করেছেন।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের সুরা বাকরার ১৯৭ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেছেন যে, তোমরা প্রত্যেকেই পাথেয় সংগ্রহ করো, আর নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ পাথেয় হলো তাকওয়া বা খোদাভীরুতা।
মানুষের প্রাণবায়ু বের হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার আমল করার দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। তথাপি কিছু বিশেষ সৎকর্মের পুণ্য ও সুফল মৃত্যুর পরেও অবিরাম ধারায় অব্যাহত থাকে।
এই প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) আরও ইরশাদ করেছেন যে, মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তার সমস্ত আমলের খাতা বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি বিশেষ কাজের ধারা কখনোই বন্ধ হয় না। প্রথমটি হলো সদকায়ে জারিয়া বা এমন কল্যাণকর দান, দ্বিতীয়টি হলো এমন ইলম বা জ্ঞান, যা থেকে মানুষ উপকৃত হতে থাকে এবং তৃতীয়টি হলো এমন নেক সন্তান, যে তার মৃত মা-বাবার জন্য সর্বদা দোয়া করতে থাকে। সহিহ মুসলিম শরিফের ১৬৩১ নম্বর হাদিসে এই অসাধারণ শিক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মানুষের এই পার্থিব সফর একদিন আকস্মিকভাবেই সমাপ্ত হবে। আপনজনেরা কান্নাকাটি করে শেষ পর্যন্ত নিজেদের ঠিকানায় ফিরে যাবে, বিশাল সম্পদ পুরোটা পড়ে থাকবে এবং জীবনের সমস্ত হট্টগোল চিরতরে থেমে যাবে। তখন এই দীর্ঘ যাত্রায় একমাত্র সঙ্গী হবে জীবনের সৎকর্মগুলো। তাই নির্দিষ্ট সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই ইমান ও নেক আমলে নিজের জীবন সাজিয়ে তোলা এবং পরম করুণাময়ের সন্তুষ্টি অর্জনের সাধনা করা প্রতিটি মুমিন বান্দার অবশ্যকর্তব্য।
কেননা, অন্তহীন এই মহাসফরে মানুষের প্রকৃত সম্বল হবে কেবল তাকওয়া, আর সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও উত্তম সঙ্গী হিসেবে পাশে থাকবে কেবল নেক আমল। লেখক ও আলেম মাহমুদ হাসান ফাহিম অত্যন্ত সুন্দরভাবে এই চিরন্তন সত্যটি ফুটিয়ে তুলেছেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর