ঢাকা | বঙ্গাব্দ

পথহারা মানুষকে সঠিক পথ দেখানো ইসলামে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 4, 2026 ইং
পথহারা মানুষকে সঠিক পথ দেখানো ইসলামে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

আধুনিক ইন্টারনেটভিত্তিক গুগল ম্যাপের সহজলভ্যতার যুগে মানুষের পথ হারিয়ে ফেলা এবং কারো কাছে পথ জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশেই কমে গেছে বলে মনে হয়। কিন্তু কখনো কখনো যখন মুঠোফোনে নেটওয়ার্ক থাকে না, ডিজিটাল ম্যাপ ভুল পথ নির্দেশ করে এবং কোনো অপরিচিত শহরে সন্ধ্যা নেমে আসে, তখন চরম বিপাকে পড়তে হয়।

এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই মানুষকে মুঠোফোন পকেটে রেখে রাস্তার পাশের অন্য কোনো মানুষের সাহায্য নিতে হয়। তবে বর্তমান সময়ে অচেনা কাউকে রাস্তা জিজ্ঞেস করলে অনেকের কাছ থেকেই বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা যায়, কখনো অবজ্ঞার শিকার হতে হয় কিংবা কখনো আবার ভুল ইশারা দিয়ে বিভ্রান্ত করা হয়। অথচ ইসলাম ধর্মের শেষ নবী মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) পথহারা মানুষকে সঠিক পথ দেখানোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

রাস্তার পাশে বসে আড্ডা দেওয়া সংক্রান্ত সাহাবিদের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর একটি সুনির্দিষ্ট কথোপকথন বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। একবার নবীজি (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে বলেন যে তারা যেন রাস্তার ধারে বসা থেকে সতর্ক থাকেন। জবাবে সাহাবিরা আরজ করেন যে পারস্পরিক আলোচনা ও প্রয়োজনীয় কথাবার্তার জন্য তাঁদের রাস্তায় বা মজলিসে বসার প্রয়োজন হয়।

তখন প্রিয়নবী (সা.) তাঁদের পরামর্শ দিয়ে বলেন যে যদি সেখানে বসতেই হয়, তবে যেন অবশ্যই রাস্তার যথাযথ হক বা পাওনা আদায় করা হয়। সাহাবিরা কৌতূহলী হয়ে রাস্তার হক সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাস্তার হকের মধ্যে রয়েছে চোখের দৃষ্টি অবনত রাখা, কাউকে কোনো প্রকার কষ্ট না দেওয়া, কারো সালামের সঠিক জবাব দেওয়া, সৎ কাজের আদেশ প্রদান করা এবং অসৎ কাজ থেকে বারণ করা। সহিহ বুখারি শরিফের ২৪৬৫ নম্বর হাদিসে এই নির্দেশনাটি পাওয়া যায়।

এই বর্ণনার সঙ্গে সম্পূর্ণ মিল রয়েছে এমন আরেকটি হাদিস থেকেও মূল্যবান তথ্য জানা যায়। সুনান আবু দাউদ শরিফের ৪৮১৬ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, রাস্তার অন্যান্য হকের সঙ্গে সালামের জবাব দেওয়া, হাঁচির উত্তর দেওয়া, দৃষ্টি নিচু রাখা এবং সুনির্দিষ্টভাবে ‘পথহারাকে পথ দেখানো’র কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসলামি আইনশাস্ত্রের বিশিষ্ট পণ্ডিত ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বিভিন্ন হাদিস ও বর্ণনা একত্র করে রাস্তার হক বা আদবের মোট চৌদ্দটি দিক চিহ্নিত করেছেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ফাতহুল বারি’-এর ১১ নম্বর খণ্ডের ১৬ পৃষ্ঠায় বর্ণিত এই আদবগুলোর মধ্যে রয়েছে কোনো বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে সহায়তা প্রদান করা, মজলুম বা অত্যাচারিতকে সহযোগিতা করা, কারো ভারী বোঝা বহনের সময় সাহায্য করা, ভালো ও সুন্দর কথা বলা এবং পথহারা মানুষকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া।

এসব আলোচনার মাধ্যমে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট হয় যে কোনো পথিককে দিকনির্দেশনা দেওয়া বা সঠিক পথ বাতলে দেওয়া ইসলামে রাস্তার একটি অত্যন্ত স্বীকৃত ও গুরুত্বপূর্ণ হক হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

সাধারণত সদকা বলতে আমরা সম্পদ বা অর্থ দান করাকেই বুঝে থাকি। কিন্তু ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় সদকার পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক ও বিস্তৃত। মহানবী (সা.) বলেছেন যে তোমার কোনো মুসলিম ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দেওয়াও তোমার জন্য সদকার সওয়াব বয়ে আনে।

এছাড়া সৎ কাজের আদেশ দেওয়া এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা সদকা হিসেবে গণ্য হয়। কোনো পথহারা মানুষকে সঠিক পথ দেখানো সদকা, দুর্বল দৃষ্টিসম্পন্ন বা অন্ধ মানুষকে সাহায্য করা রাস্তার ধারে পড়ে থাকা পাথর, কাঁটা ও ক্ষতিকর হাড় সরানো সদকা এবং নিজের পানের বালতির অবশিষ্ট পানি অন্য ভাইয়ের শূন্য বালতিতে ঢেলে দেওয়াও সদকা হিসেবে বিবেচিত হয়। সুনানে তিরমিজি শরিফের ১৯৫৬ নম্বর হাদিসে এই চমৎকার শিক্ষাগুলো বর্ণিত হয়েছে।

মূল আরবি হাদিসের শব্দমালায় ‘ইরশাদুকার রাজুলা ফি আরদিদ দালাল’ বাক্যটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার শাব্দিক ও ভাবার্থ হলো অপরিচিত বা পথ হারানো কোনো ভূমিতে মানুষকে সঠিক দিক বা গন্তব্য চিনিয়ে দেওয়া।

তবে কাউকে সহায়তা না করার পাশাপাশি ভুল পথ দেখানো বা বিভ্রান্ত করা আরও মারাত্মক অপরাধ। ভুল পথ দেখানো বা কাউকে বিভ্রান্ত করার মতো বিষয়টিকে ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে।

দুর্বল দৃষ্টিশক্তির মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল পথে চালিত করার ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে নবীজি (সা.) বলেছেন যে যে ব্যক্তি কোনো অন্ধ মানুষকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে বা বিভ্রান্ত করে, তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হয়। আল-আদাবুল মুফরাদ গ্রন্থের ৮৯২ নম্বর হাদিসে এই বাণীটি উল্লেখ করা হয়েছে।

যদিও এই হাদিসটির প্রত্যক্ষ প্রেক্ষাপট একজন দৃষ্টিহীন বা অন্ধ ব্যক্তি, তথাপি ইসলামি আলেমরা এর বৃহত্তর মর্মার্থ থেকে এটিই বোঝেন যে কেউ যদি কোনো বিষয়ে সাহায্য প্রার্থনা করে, তবে তাকে জেনেশুনে বিভ্রান্ত করা বা ভুল তথ্য দেওয়া একটি মারাত্মক অপরাধ। আর যদি উত্তর জানা না থাকে, তবে বিনয়ের সঙ্গে ‘আমি জানি না’ বলে দেওয়াটাই প্রকৃত সততা।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক আধুনিক সুবিধা এনে দিয়েছে, কিন্তু মানুষের পরস্পরের ওপর ভরসা করার মানসিকতা বা অভ্যাসকে কমিয়ে দিয়েছে। অথচ একজন পথচারীকে রাস্তা বলে দেওয়ার জন্য বিন্দুমাত্র কোনো আর্থিক খরচের প্রয়োজন হয় না, এর জন্য কেবল প্রয়োজন হয় মাত্র কয়েক মুহূর্তের সময় এবং একটুখানি সদিচ্ছা।

আজকের দিনে অনেক সাধারণ মানুষই ইসলামের মূল আদর্শকে মুসলমানদের ব্যক্তিগত আচরণ ও লেনদেন দেখে মূল্যায়ন করে। ফলে যখন কোনো মানুষ পথ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে অন্যের সাহায্য চায়, আর তাকে বিরক্তিকর মুখে তাড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন সেটি সাধারণ কোনো ব্যক্তিগত রূঢ়তার চেয়েও অনেক বড় বিষয়ে পরিণত হয়।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রিয়নবী (সা.)-কে উদ্দেশ করে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ইরশাদ করেছেন যে আল্লাহর বিশেষ রহমতের ফলেই আপনি তাদের প্রতি কোমলহৃদয় হয়েছেন। আপনি যদি রূঢ় স্বভাবের ও কঠোরচিত্ত হতেন, তবে তারা নিশ্চিতভাবেই আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত।

মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কাছাকাছি ফিরে আসার আসল পথ কেবল পারস্পরিক কোমলতা ও বিনয়ের মধ্য দিয়েই তৈরি হতে পারে।

প্রযুক্তি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে অনেক সুবিধা দিলেও মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতা কমিয়েছে। পথ নির্দেশ করতে কোনো অর্থ লাগে না, লাগে শুধু সামান্য সদিচ্ছা ও মুহূর্তের সান্নিধ্য।

এই ছোট্ট ও সাধারণ অভ্যাসটিও অচেনা মানুষের মনে গভীর নিরাপত্তার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র শিক্ষা হলো, এ ধরনের ছোট ও সাধারণ কাজগুলোও মহান আল্লাহর দরবারে মর্যাদাপূর্ণ সদকার সওয়াব লাভ করে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ হত্যা মামলা

নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ হত্যা মামলা