নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
লিখিত কাগজপত্রে আরও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে, ওই পর্ষদের কাজের গণ্ডির ভেতরে মাটির ব্যবহারের রূপ বদলানোর ক্ষেত্রে প্রকৃতিগত অভিঘাত এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের যাবতীয় তথ্যসহ রূপান্তরের যৌক্তিক কারণ খোঁজার কথা থাকলেও, তা আদৌ যাচাই করা হয়েছে কি না সে বিষয়ে কোনো ধারণা নেই নগর পরিকল্পনাবিদদের। কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে পর্ষদটি কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করছে কি না, সেই গুরুতর সংশয়ও প্রকাশ করেছে পেশাজীবী এই সংস্থাটি।
ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের পক্ষ থেকে জোরালো দাবি জানানো হয়েছে যে, বুড়িগঙ্গা নদীর পারের ভূখণ্ডটি কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের অধীন এবং বহু দিন ধরেই সেটি কোনো কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল না। ওই নির্দিষ্ট জায়গায় কোনো বিনোদনকেন্দ্র বা ফাঁকা জায়গা গড়ে তোলার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এবং নাগরিক সুবিধার বাইরে থাকা জুরাইন ও শ্যামপুর অঞ্চলের সাধারণ মানুষের উপকারের জন্য জায়গাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। এলাকাটি মূলত আগে থেকেই পরিবেশ দূষণ, জলাবদ্ধতা এবং মশাবাহিত রোগের মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তাছাড়া, বিগত ২০০৯ সালে বুড়িগঙ্গা নদীকে প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, ফাঁকা জায়গার বদলে কলকারখানা এলাকা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পরিবেশের ওপর কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে তা যাচাই করা এবং যে ফাঁকা জায়গাগুলো হারিয়ে গেছে তা কীভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব, সে বিষয়ে নীতমালাটির সংশোধনীতে কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই।
পূর্বাচল ও ঝিলমিল এলাকায় অতিরিক্ত ফ্লোর এরিয়া রেশিও বা এফএআর প্রদানের সুযোগের বিষয়টি নিয়ে পরিকল্পনা বিদদের সংগঠনটি জানিয়েছে যে, এর ফলে মূল মহাপরিকল্পনার অনুমানের চেয়েও বহুলাংশে জনসংখ্যা বেড়ে যেতে পারে। সেই বর্ধিত জনসংখ্যার বিপরীতে পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ, যাতায়াত ব্যবস্থা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার যথাযথ সামর্থ্য রয়েছে কি না, তা কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগেই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা একান্ত প্রয়োজন। অন্যদিকে, জলস্রোত ওভারলে জোনের নতুন বিধান অনুযায়ী, যেসব জমি বাস্তবে বন্যার অতিরিক্ত পানি আটকে রাখে কিন্তু সরকারি কাগজপত্রে জলাশয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত নেই, সেগুলোর সুরক্ষার পরিধির বাইরে চলে যাওয়ার সমূহ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
রাজধানী ঢাকার সামগ্রিক জটিলতাগুলো তুলে ধরে লিখিত বক্তব্যে আরও উল্লেখ করা হয় যে, অপরিকল্পিতভাবে নগরে বিস্তার ঘটানো, প্রাকৃতিক জলাধার ও শাখা খালগুলো হারিয়ে যাওয়া, বিষাক্ত বাতাসে দূষণ, বর্ষার পানি জমে যাওয়া, অতিরিক্ত জনবসতি, যানবাহনের জট এবং পর্যাপ্ত ফাঁকা জায়গার অভাব শহুরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলছে। বর্তমানের এই পরিস্থিতিতে মাটির ব্যবহারের রূপরেখায় অপরিকল্পিত যেকোনো রদবদল রাজধানী শহরের সামগ্রিক পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর সুদূরপ্রসারী ও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ইনস্টিটিউটের প্রধান উপদেষ্টা আদিল মোহাম্মদ খান অভিমত প্রকাশ করেন যে, দূষিত বায়ু এবং পরিবেশের সামগ্রিক অবনতির মাপকাঠিতে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে অনুন্নত নগরগুলোর অন্যতম। ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর নগর পরিকল্পনা এবং প্রকৃতির ওপর বিগত দিনের দমনমূলক ও ফ্যাসিবাদী আচরণের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে বলে তাঁরা গভীর প্রত্যাশা পোষণ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তাঁরা প্রত্যক্ষ করছেন যে, পূর্বের সেই ক্ষতিকর প্রবণতা তো কমেইনি, বরং বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গঠিত নয় সদস্যবিশিষ্ট বিশেষ কারিগরি কমিটির প্রত্যেকেই প্রজাতন্ত্রের বেতনভুক্ত কর্মচারী। সেখানে সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের পক্ষে কথা বলার মতো ন্যূনতম কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি। ওই অঞ্চলের ব্যবসায়িক বিভিন্ন সিন্ডিকেট যেভাবে বুঝিয়েছে, কমিটির সদস্যরা ঠিক সেইভাবেই একটি পক্ষপাতদুষ্ট সংশোধনী দলিল প্রণয়ন করেছেন।
আদিল মোহাম্মদ খান সংবাদ সম্মেলনে স্মরণ করিয়ে দেন যে, বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপ নিয়ম অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর অন্তর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করার বিধান রয়েছে। কিন্তু আলোচ্য ক্ষেত্রে সেই নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। যে সরকার নদী রক্ষা করতে জলাশয় খনন করার উদ্যোগ নেয়, সেই একই সরকার কীভাবে পরিবেশের বারোটা বাজাতে ড্যাপের এমন বিতর্কিত সংশোধনী আনে। এর চেয়ে বড় পরিহাস বা প্রহসন আর কী হতে পারে বলে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর