ঢাকা | বঙ্গাব্দ

কাজের অনীহা ও ক্লান্তি দূর করে কর্মোদ্দীপনা ফেরার ৭ উপায়

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 24, 2026 ইং
কাজের অনীহা ও ক্লান্তি দূর করে কর্মোদ্দীপনা ফেরার ৭ উপায় ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় নির্দিষ্ট সময়ে পড়ালেখা সহ প্রয়োজনীয় কাজগুলো সম্পন্ন করা অত্যন্ত আবশ্যকীয়। কিন্তু বহুক্ষণ ধরে কাজ করার তীব্র ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় কাজগুলো শুরু করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এভাবেই ভাবতে ভাবতে মূল্যবান সময় নষ্ট হতে থাকে এবং অসমাপ্ত কাজের পাহাড় জমতে শুরু করে। কখনো একঘেয়েমি পরিবেশ, কখনো শারীরিক ক্লান্তি, আবার কখনো মনোযোগের চরম ঘাটতির কারণে এমন অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কিছু ভালো অভ্যাস দৈনন্দিন জীবনে চর্চা করলে যেকোনো কাজ দ্রুত শুরু করা এবং তাতে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ টিকিয়ে রাখা সহজ হয়। তাই আজকের এই আলোচনায় অলসতা ও একঘেয়েমির আসল কারণগুলো এবং সেগুলো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার সাতটি চমৎকার উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

কাজের পর্যাপ্ত সামর্থ্য ও সুবর্ণ সুযোগ থাকার পরেও নির্দিষ্ট কোনো কারণে কাজ শুরু করতে কিংবা তা সঠিকভাবে চালিয়ে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করাকেই মূলত অলসতা হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে কোনো বিশেষ মুহূর্তে কাজ করতে ইচ্ছা না করলেই যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অলস, এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। মূলত শারীরিক ক্লান্তি, মানসিক একঘেয়েমি, মনোযোগের ঘাটতি কিংবা অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণেও মানুষের মাঝে কাজের প্রতি চরম অনিহা দেখা দিতে পারে। তাই অলসতা দূর করার যেকোনো প্রচেষ্টা চালানোর আগে নিজের ভেতরের এমন অদ্ভুত অনুভূতির পেছনের মূল কারণগুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করা খুবই জরুরি।

অনেক সময় নিজের ঘর কিংবা পড়ার টেবিলে অলসভাবে বসে নিজেকে চরম অলস বলে মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবিকভাবে আপনি হয়তো প্রচণ্ড ক্লান্ত। মানবদেহ ও মস্তিষ্ক যদি পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশ্রাম না পায়, তবে কোনো কাজেই ঠিকমতো মন বসানো সম্ভব হয় না। তাই কোনো মুহূর্তে কাজ করতে ইচ্ছা না করলে নিজের ওপর অযথা কোনো দোষ চাপাবেন না। বরং একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন যে গত রাতে আপনার সঠিক পরিমাণে ঘুম হয়েছে কি না কিংবা একটানা অনেক দীর্ঘসময় ধরে কাজ করেছেন কি না। অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের রাতের বেলায় নিয়মিত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা গভীর ঘুমের প্রয়োজন হয়। এছাড়া কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে সাধারণত তুলনামূলকভাবে আরও বেশি ঘুমের আবশ্যকতা রয়েছে। পর্যাপ্ত ঘুম ও যথাযথ বিশ্রাম না হলে মানুষের মনোযোগ এবং নতুন কাজ করার প্রবল আগ্রহ দ্রুত হ্রাস পেতে পারে।

একই ধরনের কাজ বারবার করতে করতে একসময় মানুষের মনে মারাত্মক একঘেয়েমি চলে আসে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একই বিষয় নিয়ে যদি দীর্ঘক্ষণ ধরে পড়াশোনা করতে ভালো না লাগে, তবে পড়ার টেবিলে মন বসতে চাইবে না। তখন স্বাভাবিকভাবেই কাজটি সামনে থেকে সরিয়ে অন্য কিছু করতে ইচ্ছা করে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়ার নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু কিংবা পদ্ধতিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা, মাঝেমধ্যে ছোট ছোট বিরতি নেওয়া কিংবা পুরো পড়াকে কয়েকটি ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করে নেওয়া অত্যন্ত ফলপ্রদায়ক হতে পারে। কাজের ভেতরে নতুন করে আগ্রহ খুঁজে পেলে দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি কাটিয়ে ওঠা অনেকটাই সহজ হয়।

অলসতা এবং বিষণ্নতা কখনোই এক ও অভিন্ন বিষয় নয়। জীবনের কোনো না কোনো সময়ে কাজ করতে ইচ্ছা না করা কিংবা মন মেজাজ খারাপ থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ঘটনা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মন খারাপ থাকা, অতীতে যেসব কাজ করতে ভালো লাগত সেগুলোতেও সব আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, দৈনন্দিন ঘুম ও খাওয়ার অভ্যাসে হঠাৎ বড় ধরনের পরিবর্তন আসা কিংবা সবসময় প্রচণ্ড ক্লান্ত লাগার মতো গুরুতর সমস্যাগুলো দেখা দিলে বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত। এমন লক্ষণগুলো দেখা দিলেই যে সুনির্দিষ্টভাবে বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন হয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে এই ধরনের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে আপনার বিশ্বস্ত কোনো বড় মানুষের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলা উচিত এবং প্রয়োজনে অভিজ্ঞ চিকিৎসক কিংবা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া একান্ত বাঞ্ছনীয়।

দিনের শুরুতেই একটি সুন্দর পরিকল্পনা করে নিলে আপনার দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজগুলো খুব সহজে গুছিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর ঠিক কী কী করবেন, কখন পড়ার টেবিলে বসবেন, কখন সকালের নাশতা খাবেন, এসব বিষয় আগে থেকেই সুনির্দিষ্ট করে রাখতে পারেন। তবে খুব ভোরেই ঘুম থেকে উঠতেই হবে, এমন কোনো কঠোর বা বাঁধাধরা নিয়ম নেই। আপনার নিজস্ব ঘুমের ধরন এবং দৈনন্দিন কাজের ব্যস্ততার সঙ্গে পুরোপুরি মানানসই এমন একটি আরামদায়ক রুটিন তৈরি করুন। সেই রুটিনের ভেতরে যেন পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত পড়াশোনা, শরীরচর্চা এবং সঠিক বিশ্রামের সুনির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ থাকে। নিয়মিতভাবে এই ধরনের বাস্তবসম্মত রুটিন মেনে চললে আপনার যেকোনো দিনের কাজ শুরু করা অনেক সহজ হয়ে উঠবে।

পড়ার টেবিলে যদি বইখাতা, বিক্ষিপ্ত কাগজপত্র কিংবা নানা ধরনের অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে থাকে, তবে আপনার প্রয়োজনীয় কোনো নির্দিষ্ট জিনিস খুঁজে পেতে অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট হতে পারে। তাই পড়ার টেবিলে মনোযোগ দেওয়ার আগে সবার আগে টেবিলটি সুন্দর করে গুছিয়ে নিন। আপনার প্রয়োজনীয় সব বই, খাতা, কলম এবং অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রী সবসময় হাতের কাছে গুছিয়ে রাখুন। ঘর একেবারে ঝকঝকে ও নিখুঁত করে ফেলতে হবে, এমন কোনো কথা নেই; বরং কেবল আপনার কাজ শুরু করার মতো একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করাই যথেষ্ট। পরিপাটি পরিবেশে পড়াশোনা করলে খুব সহজেই মনোযোগ ধরে রাখা সম্ভব হয়।

পড়তে বসে বারবার মুঠোফোন দেখা কিংবা উদ্দেশ্যহীনভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পাতায় স্ক্রল করতে থাকলে অজান্তেই আপনার জীবনের প্রচুর মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই পড়ার সময় আপনার মোবাইল ফোনটি কিছুটা দূরে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখতে পারেন। একান্ত প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট কিছু সময়ের জন্য ফোনের সব ধরনের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখতে পারেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একেবারে চিরতরে ব্যবহার বন্ধ করতেই হবে; বরং এটি ঠিক করুন যে আপনি ঠিক কখন এবং কতক্ষণ তা ব্যবহার করবেন। অবসর সময়ে নতুন বই পড়া, বাইরে হাঁটতে বের হওয়া কিংবা নিজের পছন্দের অন্য কোনো সৃজনশীল কাজে সময় দেওয়ার চমৎকার অভ্যাসও গড়ে তুলতে পারেন।

একটানা অনেক দীর্ঘ সময় ধরে পড়াশোনা করার কথা চিন্তা করলেই কাজটি আপনার কাছে অত্যন্ত কঠিন ও পাহাড়সম মনে হতে পারে। এই ধরনের সমস্যা সমাধানের জন্য আপনি অত্যন্ত জনপ্রিয় পোমোডোরো পদ্ধতিটি খুব সহজেই কাজে লাগাতে পারেন। প্রথমে আপনার পছন্দের যেকোনো একটি কাজ বেছে নিয়ে সেখানে ঠিক ২৫ মিনিটের একটি টাইমার চালু করুন। এই নির্ধারিত সময়টিতে আপনার সম্পূর্ণ মনোযোগ শুধু সেই নির্দিষ্ট কাজের ওপরই রাখুন। ২৫ মিনিট মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মাত্র তিন থেকে পাঁচ মিনিটের একটি ছোট্ট বিরতি নিন। এভাবে একটানা চারবার কাজ সম্পন্ন করার পর ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের একটু তুলনামূলক বড় বিরতি নিতে পারেন। তবে মনে রাখবেন যে সবার শারীরিক সক্ষমতার জন্য একই সময় বা পদ্ধতি সমানভাবে কার্যকর হবে না; তাই আপনার নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী এই সময় কমবেশি করে নিতে পারেন। কাজকে ছোট ছোট সময়ের ভাগে ভাগ করলে তা শুরু করা এবং মনোযোগ টিকিয়ে রাখা অনেক সহজ হয়।

কোনো একটি নির্দিষ্ট কাজ শুরু করতেই যখন আপনার একদম মন চাইছে না, তখন নিজের মনকে বুঝিয়ে বলুন যে, আপনি কেবল মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য এই কাজটি করবেন। যেমন, পুরো একটি কঠিন অধ্যায় পড়ার কথা চিন্তা না করে কেবল প্রথম দুটি পৃষ্ঠা পড়ার ছোট্ট সিদ্ধান্ত নিন। কিংবা একটি বিশাল অ্যাসাইনমেন্টের কথা চিন্তা না করে কেবল প্রথম কয়েকটি বাক্য লেখা শুরু করুন। এই পাঁচ মিনিট শেষ হওয়ার পর আপনার যদি ইচ্ছে হয়, তবে কাজটি আগের মতো চালিয়ে যেতে পারেন, আবার চাইলে নিজের সুবিধামতো বিরতিও নিতে পারেন। অনেক সময় কাজ শুরু করার পরেই মনের মধ্যে কাজের নতুন আগ্রহ ফিরে আসে। আর যদি শেষ পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যেতে না-ও পারেন, তবুও অন্তত কিছুটা অংশ তো এগিয়ে রাখা সম্ভব হলো।

একদিনেই নিজের জীবনের সমস্ত পুরোনো অভ্যাস একসঙ্গে বদলে ফেলার চেষ্টা করলে আপনার ওপর মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। তাই শুরুতেই মাত্র একটি কিংবা দুটি সহজ ও সাবলীল অভ্যাস বেছে নিন। যেমন, প্রতিদিন নিয়মিত পড়তে বসার আগে টেবিলটি সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা কিংবা নির্দিষ্ট সময়ে মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য পড়াশোনা শুরু করা। এভাবে একটানা অন্তত এক সপ্তাহ চেষ্টা করে দেখুন যে অভ্যাসগুলো আপনার দৈনন্দিন কাজে কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে কি না। যদি প্রয়োজন হয়, তবে আপনার পদ্ধতি বদলে নিন। এভাবে ছোট ছোট পদক্ষেপগুলো নিয়মিত অনুসরণ করতে পারলে খুব ধীরে ধীরে নতুন ও ভালো অভ্যাস গড়ে তোলা বেশ সহজ হয়।

অলসতা কাটিয়ে ওঠার ঐকান্তিক চেষ্টা করতে গিয়ে জীবনের কোনো একটি দিনে নির্ধারিত রুটিন ঠিকমতো মেনে চলতে না-ও পারেন। এই ছোটখাটো কারণে কোনোভাবেই হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কোনো একদিন কাজের গতি পিছিয়ে গেলে নিজেকে অযথা অলস বা পুরোপুরি ব্যর্থ ভাবার কোনো অবকাশ নেই; বরং গভীর মনোযোগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করুন যে ঠিক কোন কারণে আপনি কাজটি সময়মতো সম্পন্ন করতে পারেননি। হয়তো সেদিন আপনার পর্যাপ্ত ঘুম হয়নি, অতিরিক্ত কাজের চাপ ছিল কিংবা আপনার তৈরি করা পরিকল্পনাটি বাস্তবসম্মত ছিল না। মূল কারণটি সঠিকভাবে অনুধাবন করে ঠিক পরের দিন থেকে আবার নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করুন। নিজের ভুলত্রুটিগুলো থেকে শিক্ষা লাভ করে অত্যন্ত ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই হলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সবশেষে মনে রাখা দরকার যে জীবনের সব সময় অতিরিক্ত কর্মব্যস্ত থাকাই যে সফলতার একমাত্র মাপকাঠি, এমন কোনো কথা নেই। নিয়মিত প্রয়োজনীয় বিশ্রাম নেওয়া, বিনোদন উপভোগ করা এবং নিজের পছন্দের বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে নির্দিষ্ট সময় ব্যয় করাও সুস্থ ও সুন্দর জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে যদি আপনার জীবনে প্রয়োজনীয় কাজগুলো বারবার পিছিয়ে দেওয়ার একটি দীর্ঘস্থায়ী বদঅভ্যাস তৈরি হয়, তবে ছোট ছোট ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে তা অবশ্যই কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করুন। আর যদি দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত শারীরিক ক্লান্তি, তীব্র অনীহা কিংবা মনোযোগের মারাত্মক সমস্যা চলতে থাকে, তবে এটিকে নিছক অলসতা ভেবে অবহেলা করে এড়িয়ে না গিয়ে চিকিৎসকের নিকট থেকে কিংবা বিশেষজ্ঞদের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় সাহায্য গ্রহণ করুন।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
যুদ্ধ ছড়ালে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত ধ্বংসের

যুদ্ধ ছড়ালে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত ধ্বংসের