নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
প্রতিবছর বাংলাদেশে নিয়মিত আতঙ্কের নাম হয়ে ফিরে আসে ডেঙ্গু। সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে প্রায়ই উঠে আসে মৃত্যুর খবর এবং হাসপাতালগুলোতে বাড়তে থাকে রোগীর ভিড়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই করুণ বাস্তবতাই আমাদের সহ্য করতে হচ্ছে। দেশে ওষুধ তৈরির নিজস্ব সংস্কৃতি না থাকায় ডেঙ্গুর মতো বড় ধরনের জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকটেও আমাদের কার্যত কিছুই করার থাকে না। উন্নত দেশগুলোতে কোনো ওষুধ বা টিকা আবিষ্কৃত হলে সরকার তা হয়তো কিনে নেয় কিংবা সংশ্লিষ্ট ওষুধ কোম্পানিগুলো জেনেরিক ওষুধ তৈরি করতে সক্ষম হয়।
তবে মূল সমস্যা হলো, যে রোগটি বাংলাদেশের জন্য মারাত্মক আকার ধারণ করে, তা উন্নত বিশ্বের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটিই ঘটেছে। বিশ্বের অধিকাংশ নতুন ওষুধ উদ্ভাবিত হয় যুক্তরাষ্ট্রে। যেহেতু ডেঙ্গু আমেরিকার কোনো প্রধান সমস্যা নয়, তাই সেখানকার গবেষক প্রতিষ্ঠানগুলো বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে এই রোগের ওষুধ বা টিকা বানাতে আগ্রহী হয় না। এর মানে এই নয় যে কোনো প্রচেষ্টাই চলছে না, তবে তা চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য।
ভাইরাসের চারটি ভিন্ন সেরোটাইপ রয়েছে, যা হলো ডিইএনভি-১, ডিইএনভি-২, ডিইএনভি-৩ এবং ডিইএনভি-৪। ভৌগোলিক অঞ্চল ও সময়ভেদে এসব সেরোটাইপের প্রকোপ ও তীব্রতা কমবেশি হতে পারে, যা ডেঙ্গুর কার্যকর টিকা তৈরির পথে অন্যতম বড় বাধা। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)-এর গবেষণাপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে ডিইএনভি-২ সেরোটাইপে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৬ সালে ডিইএনভি-৩ সেরোটাইপের আধিক্য রয়েছে।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু যেভাবে প্রতিবছর মহামারি রূপ নিচ্ছে, তা রোধ করতে হলে বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। কেবল সচেতনতা বাড়ানো কিংবা মশা নিধন করে এর বিস্তার রোধ করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট টিকা এবং কার্যকর অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ।
বর্তমানে ডেঙ্গুর জন্য যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফডিএ কিংবা ইএমএ অনুমোদিত কোনো ওষুধ নেই। ফলে স্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোও জেনেরিক সংস্করণ তৈরি করতে পারছে না। তবে এর মধ্যেও একটি সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গেছে। 'মোসনোডেনভির' নামের একটি ক্ষুদ্র অণুর সম্ভাব্য ওষুধ বেলজিয়ামের কেইউ লুভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত ভাইরোলজিস্টের গবেষণাগারে উদ্ভাবিত হয়েছিল। পরবর্তীতে বিখ্যাত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান জনসন অ্যান্ড জনসন এই ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের দায়িত্ব নেয় এবং ফেস-১ ও ফেস-২এ পর্যায় সম্পন্ন করে।
কিন্তু মাঝপথে এসে প্রতিষ্ঠানটি এই ট্রায়ালের পরবর্তী ধাপগুলোর কাজ স্থগিত করে দেয়। সাধারণত ওষুধের মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা কার্যকারিতা না থাকলেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে এর পাশাপাশি বাণিজ্যে লাভের সম্ভাবনা কম দেখলে অনেক বড় প্রতিষ্ঠানও ব্যয়বহুল ট্রায়ালে অর্থ ঢালতে চায় না। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মোসনোডেনভিরের ক্ষেত্রে মূলত বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশই এই স্থবিরতার জন্য দায়ী।
গত বছরের শেষ দিকে জনসন অ্যান্ড জনসন নামকরা দুটি জার্নালে এ বিষয়ে দুটি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ প্রকাশ করে। সেই নিবন্ধগুলো বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দীর্ঘদিনের প্রি-ক্লিনিক্যাল ড্রাগ ডিসকভারি নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের বৈজ্ঞানিক উপাত্ত অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিশীল বলে মনে হয়েছে। এই নিবন্ধগুলোর ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন 'সায়েন্স' পত্রিকাও একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
মোসনোডেনভির হলো একটি প্যান-সেরোটাইপ অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ। প্রি-ক্লিনিক্যাল গবেষণায় দেখা গেছে এটি ডেঙ্গুর যেকোনো সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই সমানভাবে কার্যকর। স্বস্তির বিষয় হলো, ফেস-১ ও ২এ ট্রায়ালে এতে কোনো উল্লেখযোগ্য বিষাক্ততা বা টক্সিসিটি পাওয়া যায়নি। তাছাড়া প্রফিল্যাক্টিক স্টাডিতেও এর চমৎকার কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে।
বিজ্ঞানভিত্তিক এই নিবন্ধগুলো পড়ার পর এ খাতের বেশ কজন প্রবাসী বাংলাদেশি গবেষক বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করেন। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য মোসনোডেনভির কতটা কল্যাণ বয়ে আনতে পারে, তা নিয়ে তারা ভাবতে শুরু করেন। পরবর্তীতে বেলজিয়ামের কেইউ লুভেনের অধ্যাপক ইয়োহান নেইটসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়, যাঁর গবেষণাগারেই ওষুধটি তৈরি হয়েছিল।
প্রফেসর নেইটস ও তাঁর গবেষণা দল মোসনোডেনভিরের ওপর একটি বিস্তারিত উপস্থাপন তুলে ধরেন। তাদের দেখানো সেই উপাত্ত থেকেও স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ডেঙ্গু চিকিৎসায় এই ওষুধটি এক বিরাট বিপ্লব ঘটাতে পারে।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই এই ওষুধ নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়, তবে এর ফেস-২বি ট্রায়াল সম্পন্ন করতে হবে, যা থেরাপিউটিক ট্রায়াল হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের আইসিডিডিআরবি এ ধরনের ট্রায়াল পরিচালনায় অত্যন্ত অভিজ্ঞ এবং যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে তারা সফলভাবে এটি সম্পন্ন করতে পারবে। এই ট্রায়াল সফল হলে দেশের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর চাইলে এফডিএ বা ইএমএ-এর আদールে জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন (ইইউএ) দিতে পারে। ওষুধের লাইসেন্স প্রদান এবং বাণিজ্যিক বাজারজাতকরণে স্থানীয় বেসরকারি ফার্মাগুলো এগিয়ে আসতে পারে। যেহেতু এখানে বহুপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ প্রয়োজন, তাই পুরো বিষয়টি একটি জাতীয় জোটের মাধ্যমেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
বাংলাদেশ তার বর্ণাঢ্য ইতিহাসে কখনোই কোনো নতুন ওষুধ আবিষ্কার তো দূরের কথা, কোনো মৌলিক ওষুধের অনুমোদনও দেয়নি। এ দেশ মূলত ওষুধশিল্পের ডাউনস্ট্রিমের একদম শেষ ধাপে কাজ করে, অর্থাৎ জেনেরিক ওষুধ তৈরি করে বাজারজাত করে থাকে। এই ট্রায়াল ও অনুমোদনের প্রক্রিয়াটি হতে পারে জাতীয় সংকটে দেশের বৈজ্ঞানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা প্রমাণের একটি মোক্ষম সুযোগ।
বিশ্বের যেকোনো sovereign দেশই তাদের চরম জাতীয় সংকটে এ ধরনের সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র যেমন একদিকে ম্যানহাটন প্রজেক্টের মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে, ঠিক তেমনি একই সময়ে পেনিসিলিন আবিষ্কার ও উন্নয়নের কাজও চালিয়ে গেছে। বিজ্ঞানের যেকোনো বড় উদ্যোগে নানাবিধ চ্যালেঞ্জ ও অনিশ্চয়তা থাকাই স্বাভাবিক। সেই ঝুঁকি মাথায় রেখেই জাতীয় দুর্দিনে একটি জাতিকে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণে এগিয়ে আসতে হয়।
এখন পর্যন্ত মোসনোডেনভির নিয়ে যতগুলো বৈজ্ঞানিক উপাত্ত প্রকাশিত হয়েছে, তার সবই অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। সামনের দিনের এই বড় চ্যালেঞ্জটি মোকাবিলায় বাংলাদেশ হয়তো এবার নিজেদের প্রমাণ করতে পারে। আর এই মহৎ উদ্যোগে দেশের প্রবাসী বিজ্ঞানীরাও সবরকম সহযোগিতা নিয়ে পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত বলে দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর