নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার বয়স থেকেই দাম্পত্য জীবনে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন সুইটি আক্তার। প্রথম পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর একমাত্র সন্তানকে কোলে নিয়ে তিনি ফিরে আসেন নিজের জন্মদাতা পিতার ঠিকানায়। পরবর্তীতে পরিবারের জোরাজুরিতে আরেকটি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেও সেই স্বামী মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমিয়ে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। দিশাহীন অবস্থায় পড়ে যান তিনি।
নিজের একমাত্র সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার তাগিদ এবং দরিদ্র পিতার পরিবারের আর্থিক অনটন ঘোচানোর কঠিন সিদ্ধান্ত নেন সুইটি। এই উদ্দেশ্যে তিন বছর আগে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেন এবং সেখানে পরিচ্ছন্নতার কর্মীর পেশায় নিয়োজিত হন। তবে দেশটিতে পৌঁছানোর মোটে অর্ধবছর পার হতে না হতেই তিনি আইনপ্রণেতাদের হাতে আটক হন।
আটকের পর পরিবারের সদস্যদের তিনি জানিয়েছিলেন যে তাঁর সঙ্গে কর্মরত অপর নারীরা অননুমোদিত পন্থায় একটি মোটরযান ক্রয় করেছিলেন। সেই অপরাধের জেরে তাঁকেও ওই চক্রের সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়। বন্দিদশায় থেকেও মা ও বাবার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখতেন তিনি। কোনো কারণে যোগাযোগ না হলে উদ্বিগ্ন হতে নিষেধ করতেন। গত ১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পিতার সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয় এবং এর দুদিন পর তাঁর প্রাণদণ্ড কার্যকরের সংবাদ পান অভিভাবকরা।
পবিত্র মক্কা শহরের একটি প্রার্থনালয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর দুইজন বাংলাদেশি নাগরিকের প্রাণদণ্ড সম্প্রতি কার্যকর করা হয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে গত ১৪ অক্টোবর এই তথ্য নিশ্চিত করে সংবাদ সংস্থা এসপিএ। দণ্ডপ্রাপ্ত এই দুই ব্যক্তি হলেন নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার।
টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা জহুরুল আলম সংবাদমাধ্যমকে জানান যে মধ্যপ্রাচ্যে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের জীবনাবসানের এই সংবাদটি তারা জানতে পেরেছেন। নিহত সুইটি আক্তার এই উপজেলারই মো. ফজল মিয়া ও জহুরা বেগম দম্পতির কনিষ্ঠ সন্তান। পাঁচ বোনেন এই পরিবারে কোনো পুত্রসন্তান ছিল না।
ঘটনার দিন সকালের দিকে নিহতের নিজ বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় সেখানে এলাকাবাসী ও আত্মীয়স্বজনের ভিড় জমেছে। ঘরের বারান্দায় বসে থাকা মা জহুরা বেগমের কাছে কন্যার সম্পর্কে জানতে চাইলেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। নিজেকে কোনোমতে সামলে তিনি কন্যার মৃতদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানান এবং বলতে থাকেন যে তার মেয়ে জীবনে অনেক কষ্ট সহ্য করেছে।
এরপর কথা হয় মৃত সুইটির পিতা ফজল মিয়ার সঙ্গে। তিনি জানান যে ২০২৩ সালের মার্চ মাসে একটি এজেন্সির মাধ্যমে তাঁর মেয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমায় এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ শুরু করে। শুরুর দিকে নিয়মিত কথা হলেও পরবর্তীতে মেয়ের কারাবাসের খবর আসে। সহকর্মীদের অবৈধ গাড়ি কেনার মামলায় তাকে জড়ানো হয়েছিল। দীর্ঘদিন যোগাযোগ বন্ধ থাকার পর মাঝখানে কিছুদিন কথা হলেও শেষ পর্যন্ত গত ১৩ অক্টোবর মাগরিবের পর তাঁর সঙ্গে শেষ কথোপকথন হয়।
পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের দৃঢ় ধারণা যে সুইটি আক্তার সুদূর প্রবাসে গভীর কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিন্দুমাত্র সত্যতা আছে বলে বিশ্বাস করেন না নিকটজনেরা।
নিহতের চাচাতো বোন সালমা আক্তার জানান যে প্রথম স্বামীর ঘর ছেড়ে আসার পর দ্বিতীয় স্বামীকে সহায়তার জন্য পাঠানো হলেও তিনি যোগাযোগ রাখতেন না। বাধ্য হয়ে নিজের শিশু কন্যাকে রেখে প্রবাসে পাড়ি জমান সুইটি। দরিদ্র কৃষিজীবী পিতার ঘরে জন্ম নেওয়া এই নারী কোনোভাবেই এমন অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন না বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর