ঢাকা | বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে কি নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ট্রাম্পের দল

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 22, 2026 ইং
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে কি নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ট্রাম্পের দল ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান ও বিরোধী ডেমোক্র্যাট শিবিরের মধ্যকার রাজনৈতিক লড়াই দিন যত গড়াচ্ছে, ততই তীব্র আকার ধারণ করছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিনেট আসনে দুই দলের মধ্যকার ব্যবধান কিছুটা সংকুচিত হওয়ার খবর মিললেও, দেশজুড়ে ডেমোক্র্যাটদের সামগ্রিক অগ্রগামিতায় ভাটার টান ধরার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। পর্যাপ্ত আর্থিক তহবিলের সুবাদে রিপাবলিকানরা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণায় সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে। দলের সমর্থকদের মনে উদ্দীপনা জোগাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সামনের সারি থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

যদিও ট্রাম্পের সরাসরি এই অংশগ্রহণ সব ক্ষেত্রে আশানুরূপ ফল বয়ে আনছে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন ইতিহাসে আর কোনো প্রেসিডেন্টের কাজের প্রতি জনসমর্থন এত নিম্নমুখী হয়নি, যেখানে তাঁর প্রতি আস্থার হার মাত্র ৩১ শতাংশে নেমে এসেছে। অধিকাংশ নির্বাচনী পূর্বাভাসেই ডেমোক্র্যাটদের নিরঙ্কুশ এগিয়ে থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনী বিশ্লেষক নেট সিলভারের প্রস্তুত করা পরিসংখ্যানভিত্তিক মডেলে দেখা যাচ্ছে যে, ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদে নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা ৭৫ শতাংশ।

সিলভারের প্রণীত ওই পূর্বাভাস মডেলে ডেমোক্র্যাটদের ঝুলлে প্রতিনিধি পরিষদে ২৪টি এবং সিনেটে আরও ৫টি আসন যোগ হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে। তবে এগুলো কেবল সম্ভাবনাময় হিসেব-নিকেশমাত্র, কোনোভাবেই চূড়ান্ত নির্বাচনী ফলাফল নয়। সিলভার বুলেটিনের গত ২০ অক্টোবরের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, সম্ভাব্য ভোটারদের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি জাতীয় কংগ্রেসনাল ব্যালটে ডেমোক্র্যাটদের ব্যবধান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ পয়েন্টে। বর্তমান নির্বাচনী চক্রে দলটির এটাই সবচেয়ে বড় ব্যবধানের রেকর্ড।

এদিকে নির্বাচনী লড়াইয়ের ময়দানে কোথাও কোথাও রিপাবলিকানদের পিছু হটার স্পষ্ট লক্ষণ ও প্রমাণও দৃশ্যমান হচ্ছে। নর্থ ক্যারোলাইনা এবং জর্জিয়ার সিনেট প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজেদের নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পেরে রিপাবলিকান শিবির বিজ্ঞাপনের বরাদ্দ ব্যাপকহারে কমিয়ে দিয়েছে কিংবা পুরোপুরি স্থগিত করেছে। অথচ এই অঙ্গরাজ্য দুটিতেই বিগত ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ বড় ব্যবধানে জয়লাভ করেছিলেন। বিশেষ করে নর্থ ক্যারোলাইনায় সিনেট লিডারশিপ ফান্ড তাদের বিজ্ঞাপনের অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়ে সেই অর্থ কানসাসের সিনেট আসনে স্থানান্তর করেছে।

কানসাসের এই আসনে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী হিসেবে পুনর্নির্মাণের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন সিনেটর রজার মার্শাল। পেশাগত জীবনে চিকিৎসক হিসেবে ২৫ বছর কাটানো এই প্রার্থীর বিরুদ্ধে চিকিৎসা ফি পরিশোধ করতে না পারার দায়ে শত শত অসচ্ছল ও নিম্ন আয়ের রোগীকে কারাবন্দী করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, যা সম্প্রতি শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই তিনি মারাত্মক রাজনৈতিক সংকটে পড়েছেন। কট্টর ট্রাম্পপন্থী হিসেবে পরিচিত নিজ দলের এই প্রার্থীকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে মাঠে নেমে নানা ধরনের তৎপরতা চালালেও শেষ পর্যন্ত তাঁর এই প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

শুধু সিনেট নয়, প্রতিনিধি পরিষদের একাধিক আসনেও রিপাবলিকান দল এবং তাদের সমর্থক গোষ্ঠীগুলো তাদের ব্যয়ের কৌশল ও অগ্রাধিকার পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। বিশিষ্ট সংবাদমাধ্যম পলিটিকো জানিয়েছে যে, খোদ একাধিক প্রভাবশালী রিপাবলিকান নেতাও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে চলমান এই নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে ধরে রাখা তাদের পক্ষে আর সম্ভব নয়। এমনকি বর্তমান স্পিকার মাইক জনসন পর্যন্ত ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যদি আসন্ন নির্বাচনে রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতবদল ঘটে, তবে তিনি প্রচলিত রাজনীতি ছেড়ে পুরোপুরি ব্যবসায় মনঃসংযোগ করবেন।

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে রিপাবলিকানদের এখনই সম্পূর্ণভাবে লড়াইয়ের বাইরে বা খরচের খাতার বাইরে ফেলে দেওয়া যুক্তিসংগত হবে। ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় ট্রাম্পের দলের সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান শক্তি হলো তাদের বিশাল অঙ্কের নির্বাচনী তহবিল। প্রাতিষ্ঠানিক দলীয় তহবিলের পাশাপাশি প্রার্থীদের বিজয়ী করতে গঠিত সুপার পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি বা সুপার প্যাকগুলো পানির মতো অর্থ ঢালছে। বিখ্যাত সংবাদ সংস্থা এপির প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুলাই মাস থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ধনকুবের ইলন মাস্ক একাই রিপাবলিকানপন্থী বিভিন্ন কমিটিতে ২৭৬ মিলিয়ন ডলারের বেশি অনুদান দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও তাঁর ব্যক্তিগত নির্বাচনী তহবিল থেকে ৪০০ মিলিয়ন ডলার খরচ করার ঘোষণা দিয়েছেন।

প্রতিনিধি পরিষদের দখল ধরে রাখার আশা ত্যাগ করলেও রিপাবলিকান দল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া করতে মোটেও রাজি নয়। এই মুহূর্তে তাদের সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ রয়েছে মিশিগান, টেক্সাস এবং মেইন অঙ্গরাজ্যের সিনেট প্রার্থীদের ভাগ্য পরিবর্তনের দিকে। মিশিগানে প্রগতিশীল হিসেবে পরিচিত এবং কট্টর ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান নেওয়া প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদকে যেকোনো উপায়ে পরাস্ত করতে রিপাবলিকানরা ৩০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

অন্যদিকে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জেমস টালারিকোকে মোকাবিলা করতে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী কেন প্যাক্সটনকে বিজয়ী করতে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থ খরচ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে কেবল ইলন মাস্ক একাই দেড় শ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছেন। মেইন অঙ্গরাজ্যের অবস্থাও প্রায় একই রকম, যেখানে মধ্যপন্থী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত সিনেটর সুসান কলিন্সকে বিজয়ী করতে রিপাবলিকান দাতারা নিজেদের পকেট থেকে অর্থ খোলামেলাভাবে খরচ করা শুরু করে দিয়েছেন।

এই বিপুল পরিমাণ নির্বাচনী তহবিলের সিংহভাগ অর্থই ব্যয় করা হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে নেতিবাচক বিজ্ঞাপনের পেছনে। মিশিগানের প্রার্থী এল-সাইয়েদকে একজন সন্ত্রাসী সমর্থক এবং টেক্সাসের টালারিকোকে গুপ্ত সমকামী বা লিঙ্গান্তরিত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে লাগাতার প্রচার চালানো হচ্ছে। এই কুৎসা রটানোর ফলে দুই রিপাবলিকান প্রার্থীই জনমত জরিপে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে ভোটের ব্যবধান কিছুটা কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন বলে ইঙ্গিত মিলছে। উভয় ক্ষেত্রেই এই ব্যক্তিগত আক্রমণ ও চরিত্রহননের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি প্রকাশ্যে এল-সাইয়েদকে 'একজন সন্ত্রাসী যে আমেরিকাকে ঘৃণা করে' এবং টালারিকোকে 'টালাফ্রিকো' বলে অত্যন্ত অবমাননাকর উপাধিতে ভূষিত করেছেন।

মার্কিন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন সবসময়ই ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের সামগ্রিক শাসনকালের ওপর এক ধরনের কঠোর গণভোট বা রাজনৈতিক রেফারেন্ডাম হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়, স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতি এবং চলমান ইরান যুদ্ধ। ডেমোক্র্যাটরা এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে একসূত্রে গেঁথে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা বা 'অ্যাফোর্ডাবিলিটি'র ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের দুর্নীতির প্রসঙ্গটি। সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে যে, নিবন্ধিত ভোটারদের শতকরা ৮৮ ভাগ মানুষ বর্তমান সরকারি দুর্নীতি নিয়ে অত্যন্ত গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

আসন্ন এই নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি যদি কংগ্রেসের উভয় কক্ষ কিংবা অন্তত একটি কক্ষের ওপর থেকেও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তবে সেটি যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠবে, তা তিনি খুব ভালো করেই অনুধাবন করতে পারছেন। বিশেষ করে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ যদি হাতছাড়া হয়ে যায়, তবে তাঁকে নতুন করে বিভিন্ন সংসদীয় তদন্ত এবং অভিশংসনের কঠিন উদ্যোগের মুখোমুখি হতে হতে পারে। আর সে কারণেই তিনি নিজ দলের প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন, যার মূল উদ্দেশ্য হলো অনুগত সমর্থকদের পুনরায় চাঙা করে তোলা।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় সমস্যা হলো, আমেরিকার প্রায় ৭১ শতাংশ সাধারণ মানুষ এখন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে দেশ সম্পূর্ণ ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে, এবং এই পরিস্থিতির জন্য তারা সরাসরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকেই দায়ী করছে। ট্রাম্পের আয়োজিত নির্বাচনী র‍্যালিগুলোতে এখন আর অতীতে মতো জনসমাগম দেখা যায় না। এমনকি অনেক রিপাবলিকান প্রার্থী নিজ নিজ রাজ্যে প্রচারণার সময় ট্রাম্পকে অত্যন্ত সচেতনভাবে এড়িয়ে চলছেন। কেন প্যাক্সটন প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেছেন যে, তাঁর পক্ষে ট্রাম্পের প্রচারণায় অংশ নেওয়াটা উপকারের চেয়ে বরং ক্ষতির কারণই বেশি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অন্যদিকে মেইনের সিনেটর সুসান কলিন্স তো সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি কোনো অবস্থাতেই চান না ট্রাম্প তাঁর রাজ্যে এসে কোনো নির্বাচনী প্রচার চালান।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়া নাঈমকে নিয়ে শঙ্কা নেই

ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়া নাঈমকে নিয়ে শঙ্কা নেই