নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
প্রযুক্তির জটিলতার চেয়ে জরুরি পরিস্থিতির বিশ্বাসযোগ্য বয়ান তৈরির ওপরই মূলত এসব জালিয়াতি চক্রের কৌশল নির্ভর করে। এ সময় ভুক্তভোগীকে বোঝানো হয় যে তাঁর পরিচয় চুরি হয়ে গেছে, ব্যক্তিগত কম্পিউটার হ্যাক করা হয়েছে কিংবা তাঁর সব সঞ্চয় মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণের কঠিন শর্ত দিয়ে প্রতারকেরা তখন বিপদ থেকে উদ্ধারের কৃত্রিম উপায় বাতলে দেন। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বাণিজ্য কমিশন জানিয়েছে, অপরাধীরা টার্গেট করা মানুষকে দীর্ঘ সময় ফোনে আটকে রেখে ভয় বাড়িয়ে দেন এবং বন্ধু কিংবা স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ খুব সীমিত রাখেন।
নিজের সারা জীবনের সঞ্চয় সুরক্ষিত থাকবে—এমন মিথ্যা বিশ্বাসের বশে অনেকে নিজের হাতেই এমন অর্থ স্থানান্তরের অনুমতি দিয়ে বসেন, যার ফলে মুহূর্তেই তাঁদের সব সঞ্চয় অন্যের হাতে চলে যায়। মানুষের স্বাভাবিক নিরাপত্তাবোধ ও উদ্বেগকে পুঁজি করে প্রতারকেরা তাদের সতর্কতা বিসর্জন দিতে বাধ্য করেন। একবার সেই অর্থ একাধিক ব্যাংক হিসাব বা ভিন্ন ভিন্ন বিচারব্যবস্থার ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে গেলে তা উদ্ধার করা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়ে। এমন ঘটনাও ঘটে যেখানে ভুক্তভোগী হয়তো বসবাস করছেন মেরিল্যান্ডে, তাঁর সঙ্গে কথা বলা কলকারী অবস্থান করছেন ভারতে এবং নগদ বা অন্য কিছু তুলতে ব্যবহার করা কুরিয়ার রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রেরই অন্য কোনো একটি স্থানে.
পুরো অবৈধ অভিযানের মূল নিয়ন্ত্রক বা মাস্টারমাইন্ড কারা, তা নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করার আগে তদন্তকারী সংস্থাকে এসব বিচ্ছিন্ন অংশের মধ্যে নিখুঁত সংযোগ স্থাপন করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় কোনো একজন কুরিয়ার গ্রেপ্তার হলে হয়তো অর্থ সংগ্রহের একটি নির্দিষ্ট ধাপ সাময়িকভাবে ব্যাহত হতে পারে, কিন্তু নেপথ্যে থাকা মূল কল পরিচালনাকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যান।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের বাল্টিমোর কার্যালয় থেকে ঘোষিত একটি যৌথ তদন্তের মাধ্যমে এই বৃহত্তর অনুসন্ধানের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য প্রকাশ পায়। ওই তদন্তে প্রায় ৬৬০ জন মার্কিন নাগরিকের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সত্যতা মেলে, যেখানে সরকারি কর্মকর্তা সেজে প্রতারণা ও প্রযুক্তি সহায়তার নামে জালিয়াতির সরাসরি সূত্র ভারতের গোপন কলসেন্টার কার্যক্রম পর্যন্ত গড়ায়। এই বিশাল জালিয়াতিতে মোট ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ কোটি ৮৮ লাখ মার্কিন ডলার। পরবর্তীতে ভারতীয় আইনপ্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে অবৈধ এই কার্যক্রমগুলো গুঁড়িয়ে দেয় এবং এই চক্রের কথিত ছয়জন শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
মেরিল্যান্ডের একজন কৌঁসুলি তদন্তে চিহ্নিত একটি নির্দিষ্ট ভারতীয় কলসেন্টারকে শত শত অভিনব প্রতারণার মূল কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের জন্য এসব ঘটনা কেবল যুক্তরাষ্ট্রর নাগরিকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া বিশাল অঙ্কের অর্থের পরিমাণের কারণেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং এসব ঘটনা স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে কীভাবে সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যবস্থা, যেমন—ভাড়া করা অফিস, আধুনিক টেলিযোগাযোগ সেবা ও নানা অর্থ পরিশোধের মাধ্যমকে অপব্যবহার করে অপরাধী চক্রগুলো সুদূর সীমান্ত পেরিয়ে দিব্যি আন্তঃদেশীয় অপরাধ চালিয়ে যেতে পারে।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর