নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
পরস্পরের মাঝে যৌথভাবে মিলেমিশে কাজ করার নামই হলো সমবায়। এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে ভ্রাতৃত্ববোধ, সদ্ভাব, পারস্পরিক ভরসা ও সহযোগিতার মানসিকতা। দলগতভাবে এই প্রচেষ্টার মাধ্যমে মানুষ নিজের অবস্থার উন্নতির পাশাপাশি সমাজের অন্য দশজন মানুষের কল্যাণেও কার্যকরভাবে ভূমিকা রাখতে সমর্থ হয়।
সমাজের অবহেলিত বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে এবং একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে সমবায় ব্যবস্থার গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। পবিত্র আল-কুরআনে এই ধারণার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ পবিত্র বাক্যে এরশাদ করেছেন যে, নেক কাজ ও খোদাভীতির ক্ষেত্রে যেন সবাই একে অপরকে সহায়তা করে, কিন্তু পাপ বা সীমা লঙ্ঘনের কাজে যেন কোনো ধরনের সহযোগিতা করা না হয়। এছাড়া অন্য আয়াতে দ্বীনকে যারা টুকরো টুকরো করে দলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের থেকে দূরে থাকার নির্দেশ রয়েছে।
এই যৌথ উদ্যোগের পরিধি কেবল আর্থিক প্রগতির মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে মানুষের নিজ পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা অর্জন, সঞ্চয় করার সুঅভ্যাস গড়ে তোলা, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের অহেতুক দৌরাত্ম্য খর্ব করা, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সবশেষে নৈতিক মূল্যবোধ মজবুত করা। সংঘবদ্ধ চেষ্টার মাধ্যমে যেকোনো জটিল ও বড় কাজ খুব সহজে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
এই ধরনের উদ্যোগে সমাজের নানা শ্রেণি ও পেশার মানুষ এক সুতোয় আবদ্ধ হয়। সম্মিলিত সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে তারা সামগ্রিক সমাজের উন্নয়নে অংশ নেয়। পরামর্শভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, স্বেচ্ছায় শ্রমদান, মিতব্যয়ী হওয়া এবং সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ সমবায়কে আরও বেশি শক্তিশালী করে তোলে। মানবতার বৃহত্তর কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং সুবিচারভিত্তিক সমাজ গড়াই এর মূল লক্ষ্য।
সমবায়ের ভাবধারার একটি সুপ্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখা যায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র ইতিকথায়, যখন তিনি তরুণ বয়সে ‘হিলফুল ফুজুল’ নামের একটি সেবাধর্মী সংঘ গঠন করেছিলেন। এই সংগঠনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সমাজ থেকে যাবতীয় অন্যায়, বৈষম্য ও অত্যাচার চিরতরে নির্মূল করা। এছাড়া নাগরিক এবং বাইরে থেকে আসা অতিথিদের জীবন, সম্পদ ও মানসম্মান রক্ষা করাও এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল।
বিভিন্ন গোত্রের মানুষের মাঝে সম্প্রীতির সম্পর্ক স্থাপন এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল এই সংঘের মূল কাজ। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ইসলামের আনুষ্ঠানিক আবির্ভাবের বহু আগেই বিশ্বনবী সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যৌথ উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
ইসলাম ধর্মে মানবীয় ভ্রাতৃত্ব, একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা, বিপদে সাহায্য করা এবং প্রতিবেশীর পূর্ণ অধিকার রক্ষা করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এতিম ও দুস্থদের সেবা করা, অসুস্থ মানুষের যথাযথ পরিচর্যা করা এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করাকেও উৎসাহিত করা হয়েছে।
উল্লিখিত এই বিষয়গুলো কেবল সাধারণ কোনো সামাজিক দায়িত্বের পর্যায়ে পড়ে না, বরং এগুলো সুনির্দিষ্টভাবে ইবাদতেরও একটি অংশ হিসেবে গণ্য হয়। পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে যে সমস্ত মুমিন একে অপরের ভাই। তাই দুই ভাইয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে তাদের মাঝে দ্রুত মী করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় ঐক্য ও অখণ্ডতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও ইসলাম ধর্মে অত্যন্ত স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। মহান আল্লাহ সবাইকে একত্রে আল্লাহর রজ্জুকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে বলেছেন এবং অযথা দলগতভাবে বিচ্ছিন্ন হতে নিষেধ করেছেন।
নিজস্ব পরিমণ্ডলে কোনো ধরনের বিভেদ তৈরি না করার কঠোর তাগিদ দিয়ে বলা হয়েছে যে এমনটি করলে মানুষের সাহস হারিয়ে যায় এবং তাদের সম্মিলিত শক্তি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। সব পরিস্থিতিতেই ধৈর্য ধারণ করার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে যে পরম করুণাময় ধৈর্যশীলদের সঙ্গেই সবসময় অবস্থান করেন।
বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মুমিন বান্দাদের পারস্পরিক সম্পর্কের এক অপূর্ব উপমা দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন যে তারা একটি মানবদেহের মতো। শরীরের একটি অংশ যদি কোনো কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ে, তবে সেই ব্যথার কষ্ট পুরো দেহের অন্য অঙ্গগুলোও সমানভাবে অনুভব করতে থাকে।
মুমিনদের পারস্পরিক এই যে দয়া, ভালোবাসা ও সহমর্মিতা, তা মূলত একটি শক্তিশালী ও সমবায়ী সমাজ গঠনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। সমাজে মানুষের সত্যিকারের মর্যাদার মাপকাঠি কোনো বংশমর্যাদা, বিপুল সম্পদ কিংবা সামাজিক পদবি নয়; বরং এর একমাত্র মাপকাঠি হলো ইমান, সৎ আমল, খোদাভীতি ও ইখলাস।
একটি সুদৃঢ় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় মানুষের ত্যাগের মানসিকতা থাকা জরুরি। সেই সঙ্গে প্রয়োজন অদম্য সহনশীলতা, উদার মানসিকতা এবং সবার সঙ্গে সদাচরণ বজায় রাখা। হিংসা-বিদ্বেষ, পরনিন্দা, সন্দেহ ও পারস্পরিক সম্পর্কচ্ছেদের মতো খারাপ গুণগুলো থেকে পুরোপুরি দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মহানবী (সা.) স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছেন যে কেউ যেন একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ না করে, হিংসা না করে এবং সম্পর্ক ছিন্ন না করে। এর বদলে আল্লাহর অনুগত বান্দা হিসেবে সবাই যেন ভাই ভাই হয়ে শান্তিতে বসবাস করে।
পরিশেষে এটি বলা যায় যে, সমবায় ধারণা এবং জাতীয় সংহতি হলো ইসলামের এমন দুটি পরস্পর পরিপূরক দর্শন। মানুষের ব্যক্তিগত সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা, ন্যায়বিচার ও ভ্রাতৃত্বের মজবুত বন্ধন গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল একটি প্রকৃত কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর