নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
উৎসবের মরশুম শেষ হতেই রাজধানী দিল্লিতে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে রাজনৈতিক উত্তেজনা। আগামীকাল শুক্রবার ‘জ্ঞানেশ হটাও, গণতন্ত্র বাঁচাও’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে একটি বড়ো বিক্ষোভ সমাবেশের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ‘পিপল এগেইনস্ট এসআইআর’ নামের একটি নবগঠিত সংগঠনের পক্ষ থেকে এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহ আগে আত্মপ্রকাশ করা এই মোর্চা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, শুক্রবারের এই জমায়েতের জন্য তারা প্রশাসনের কোনো রকম অনুমতি নেবে না।
পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, কনট প্লেস সংলগ্ন বাংলা সাহেব গুরুদ্বারের বাইরে বিক্ষোভকারীরা সমবেত হবেন। সেখান থেকে শান্তিপূর্ণ একটি মিছিল নিয়ে তাঁরা সরাসরি নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের দিকে অগ্রসর হবেন। আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, পুলিশ যদি তাদের পথ আটকে বাধা দেয়, তবে আন্দোলনকারীরা কোনো ধরনের সহিংসতায় জড়াবেন না। বরং পুলিশ যেখানে তাদের থামাবে, সেখানেই গড়ে তোলা হবে ‘জনতার সংসদ’ বা ‘পিপলস পার্লামেন্ট’। এরপর জাতীয় সংগীত পরিবেশন করার মাধ্যমেই সেই কর্মসূচি সমাপ্ত ঘোষণা করে তারা ফিরে আসবেন।
এই প্রতিবাদী দলটির পক্ষ থেকে বেশ কিছু নির্দিষ্ট স্লোগান ঠিক করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ‘প্রতিটি গলি যন্তর মন্তর’, ‘প্রতিটি এলাকা যন্তর মন্তর’ এবং ‘আমাদের ঘর যন্তর মন্তর’। আয়োজকরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের এই আন্দোলন শুধু দিল্লির গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বাতিল করা এবং জ্ঞানেশকে অপসারণের এই দাবি তারা দেশের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে দেবেন।
তবে আগামীকালের এই কর্মসূচি ঘিরে প্রশাসনের তরফ থেকেও কঠোর প্রস্তুতি রয়েছে। শুক্রবার দিল্লির যে নির্দিষ্ট পথ দিয়ে মিছিল যাওয়ার কথা এবং বিক্ষোভকারীরা যেখানে সমবেত হবেন, সেই পুরো অঞ্চলজুড়ে ভারতীয় ন্যায়সংহিতার ১৬৩ ধারা আগে থেকেই জারি করা হয়েছে। এই বিশেষ আইনি বিধিনিষেধের কারণে ওই এলাকায় চার বা তার অধিক মানুষের জমায়েত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে উচ্চস্বরে স্লোগান দেওয়া, প্ল্যাকার্ড কিংবা ব্যানার হাতে নিয়ে রাস্তায় হাঁটা, কোনো ধরনের জনসভা বা ভাষণ দেওয়া এবং অস্ত্র বহন করা। এমন কড়া পরিস্থিতির মধ্যে এই বিক্ষোভ সমাবেশ শেষ পর্যন্ত কতটা সফলতা অর্জন করবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
এই ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অভিযান’ কর্মসূচিকে সফল করতে দেশের একাধিক পরিচিত মুখ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির বা সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে, সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন আইসার নেত্রী নেহা বোরা, সিপিএম নেত্রী ঐশী ঘোষ এবং বিশিষ্ট আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ।
এছাড়াও এই প্রতিবাদী পদক্ষেপে সংহতি জানানোর কথা রয়েছে দক্ষিণী সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেতা ও সমাজকর্মী প্রকাশ রাজ, উত্তর প্রদেশের পরিচিত কৃষকনেতা রাকেশ টিকায়েত, মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তথা সমাজকর্মী তুষার গান্ধী এবং প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ পরকলা প্রভাকরের। এসআইআর প্রক্রিয়াকে ‘নাগরিকত্বের রক্তহীন রাজনৈতিক গণহত্যা’ বলে তীব্র আক্রমণ শোধ করেছেন প্রভাকর এবং এর বিরুদ্ধে তিনি অত্যন্ত জোরালো ভূমিকা পালন করছেন। একই সঙ্গে ‘ইন্ডিয়া’ জোটকেও এই বিক্ষোভ সমাবেশে শরিক হওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে এই বিষয়ে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করা হয়নি। বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে আগামী ১ নভেম্বর দিল্লির রামলীলা ময়দানে একটি বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশের দিন ঠিক করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশ ইতোমধ্যে সেই সমাবেশের অনুমতিও প্রদান করেছে।
ওই সমাবেশ এবং এর পরবর্তী রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোর রূপরেখা ঠিক করার জন্য জোটের শীর্ষ নেতাদের খুব শীঘ্রই একটি ভার্চুয়াল বৈঠকে বসার কথা ছিল। আজ বৃহস্পতিবারই সেই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা নির্ধারিত ছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কোনো কারণে শেষ মুহূর্তে সেই সভাটি বাতিল করা হয়েছে। জোটের অভ্যন্তরীণ সূত্র মারফত জানা গেছে যে, আগামী দুই থেকে চার দিনের মধ্যেই জোটের প্রধান নেতৃত্ব নিজেদের মধ্যে আলোচনা সেরে নেবেন।
এদিকে সিজেপি নেতারাও তাদের ভবিষ্যৎ আন্দোলন কর্মসূচি চূড়ান্ত করতে বৈঠকে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। গত বুধবার গভীর রাতে তিমুরের তিহার জেল থেকে মুক্তি পান সংগঠনের দুই শীর্ষ নেতা আশুতোষ রাঙ্কা এবং সৌরভ দাস। কারাগার থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই দিল্লি পুলিশ তাদের জানিয়ে দেয় যে, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় রাজৌরি গার্ডেনে অবস্থিত দিল্লি পুলিশের অপরাধ দমন শাখা বা ক্রাইম ব্রাঞ্চের কার্যালয়ে তাদের আবশ্যिकভাবে হাজিরা দিতে হবে।
সৌরভ ও আশুতোষের পাশাপাশি সিজেপি নেতা অজিঙ্ক শিন্ডেকেও পুলিশের সামনে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে গ্রেফতার হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে এই অজিঙ্কের হাতেই আন্দোলনের নেতৃত্ব অর্পণ করেছিলেন।
আশুতোষ, সৌরভ এবং অজিঙ্ক—এই তিনজনই গত ১৩ অক্টোবর আন্দোলনের জন্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধঘোষিত যন্তর মন্তরে জোরপূর্বক প্রবেশ করেছিলেন। সেখানে তাঁরা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে জ্ঞানেশবিরোধী স্লোগান দিয়েছিলেন এবং এসআইআর প্রক্রিয়া অবিলম্বে বাতিলের দাবি তুলেছিলেন। এই তিন নেতার বিরুদ্ধে পুলিশ দুটি আলাদা মামলা বা এফআইআর দায়ের করেছে। যার প্রথমটি হলো নিষিদ্ধ এলাকায় জবরদস্তি প্রবেশ এবং দ্বিতীয়টি সরকারি ও পুলিশি কাজে বাধা সৃষ্টি করা। এই আলোচিত মামলার সমগ্র তদন্তের দায়িত্ব এখন তুলে দেওয়া হয়েছে ক্রাইম ব্রাঞ্চের হাতে।
তবে পূর্বনির্ধারিত নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও সিজেপি নেতারা বৃহস্পতিবার রাজৌরি গার্ডেনে অপরাধ দমন শাখার দপ্তরে হাজিরা দেননি। পরিবর্তে তারা পুলিশের কাছে সময় বৃদ্ধির আবেদন জানিয়ে একটি চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছেন। পুলিশের নিজস্ব সূত্র অনুযায়ী, সিজেপি নেতাদের এই হাজিরা নিশ্চিত করতে তাদের খুব শীঘ্রই নতুন করে নোটিশ পাঠানো হবে।
অন্যদিকে, ঠিক এই পরিস্থিতির মাঝেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আজ বৃহস্পতিবার আবার তাঁর সেই অতিপরিচিত ‘ঘুসপেটিয়া’ তত্ত্বটি প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছেন। রাজধানী দিল্লিতে একটি সরকারি প্রকল্পের উদ্বোধন করতে গিয়ে তিনি মন্তব্য করেন যে, কংগ্রেস এবং অন্যান্য বিরোধীরা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে এত আপত্তি তুলছেন শুধুমাত্র একটি বিশেষ কারণে। তাঁরা কোনোভাবেই চান না যে দেশের ভোটার তালিকা থেকে ঘুসপেটিয়া বা অনুপ্রবেশকারীদের নাম চিরতরে বাদ যাক। আর সেই অসৎ উদ্দেশ্যেই বিরোধীরা ভোটচুরির সম্পূর্ণ মনগড়া অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক ময়দান গরম করতে চাইছেন।
কংগ্রেস দলকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে অমিত শাহ দাবি করেন যে, তারা যতই অপচেষ্টা করুক না কেন, আগামী ৩০ বছরের মধ্যে কোনোভাবেই আর ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারবে না।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে সরাসরি কটাক্ষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন যে, ‘আমার এই কথাগুলো এখন আপনি সরাসরি শুনতে পাচ্ছেন না, কারণ এই মুহূর্তে আপনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তবে দিল্লি ফিরে এসে নিশ্চয়ই আমার এই বক্তব্য শুনতে পাবেন যে, আমি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছি আগামী ত্রিশ বছরেও আপনারা ক্ষমতায় আসতে পারবেন না।’
রাহুলের উদ্দেশ্যে অমিত শাহ আরও বলেন, ‘আপনারা সারাদিন ধরে কেবল ভোটচুরি ভোটচুরি বলে চিৎকার করে বেড়ান। কারণ আপনার মূল উদ্দেশ্য হলো এই সমস্ত অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের দেশের ভোটাধিকার প্রদান করা।’
উল্লেখ্য, এ যাবৎ যতগুলো রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং যত ভোটারের নাম তালিকা থেকে কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ঠিক কতজন মানুষ প্রকৃত অর্থেই ঘুসপেটিয়া বা অনুপ্রবেশকারী, সেই সংক্রান্ত কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব নির্বাচন কমিশন আজ পর্যন্ত প্রকাশ করেনি। বিরোধীরা বারবার এই বিষয়ে জোরালো দাবি জানালেও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বা সিইসি জ্ঞানেশ কুমার এখনও পর্যন্ত জানাননি যে তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে ঠিক কতজন বিদেশি নাগরিক ছিলেন।
অথচ বিজেপির কাছে বিহার, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা বা লোকসভা ভোটের প্রচারের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু ছিল এই ‘বাংলাদেশি ভোটার’ প্রসঙ্গ। বিজেপির পক্ষ থেকে বরাবরই অভিযোগ করা হয়ে এসেছে যে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি নাগরিক এই রাজ্যগুলোর ভোটার তালিকায় অবৈধভাবে জায়গা করে নিয়েছেন। আর সেই সমস্ত অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের দেশ থেকে বিতাড়িত করাই হলো এই এসআইআর প্রক্রিয়ার মূল ও একমাত্র লক্ষ্য।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর